ইতিমধ্যে আশাবাদ বেড়ে যাবার বিভিন্ন লক্ষণ দেখা যেতে লাগলো। উদাহরণস্বরূপ, জিনিষপত্রের দামের খাঁড়া পতন হলো। কিন্তু অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ এই পতনের কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া গেল না। তবে আমাদের বড় বড় সমস্যাগুলো আগের মতোই রয়ে গেল। শহরের প্রবেশদ্বারগুলোকে আগের মতোই কঠিনভাবে বন্ধ করে রাখা হলো। খাবারের সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনোরূপ উন্নতি দেখা গেল না। ফলে প্লেগ কমে যাওয়ার বিষয়টি কেবলমাত্র মানসিকভাবেই শহরের মানুষদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল।
তবে আশাবাদের বিষয়টি অন্যদের মধ্যেও প্রভাব সৃষ্টি করল। যে সকল নাগরিকেরা আগে দলবদ্ধভাবে বাস করত, কিন্তু প্লেগের কারণে বাধ্য হয়ে আলাদা হয়ে বাস করতে হচ্ছিল, তারা সবাই নিজেদের বাড়িতে ফিরে এলো ও আগের সামাজিক জীবন শুরু করল। যে সমস্ত ব্যারাকগুলো তখনও অধিযাচন করা হয়নি, সৈনিকদেরকে সেগুলোতে আবার সঙ্ঘবদ্ধ করা হলো। তারা তাদের গ্যারিসন জীবনে ফিরে গেল। ছোটখাটো ও খুঁটিনাটি হলেও এই বিষয়গুলো ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
.png)
নিয়ন্ত্রিত অথচ কার্যকরী এই অবস্থা জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখ পর্যন্ত চলল। এইদিন সাপ্তাহিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান এতটাই কমে গেল যে, মেডিক্যাল পর্ষদের সাথে আলোচনার পর নগর কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করল যে, প্লেগ বর্তমানে স্থিতাবস্থায় এসে পৌঁছেছে। ঘোষণাটিতে বলা হলো যে, নগর প্রধান সিদ্ধান্ত দিয়েছেন যে, শহরের প্রবেশদ্বারগুলো আরও দুই সপ্তাহের জন্যে বন্ধ থাকবে এবং প্লেগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও একমাস পর্যন্ত চালু থাকবে। তবে এই সময়ের মধ্যে সবাইকে স্থায়ী আদেশগুলো শক্তভাবে প্রতিপালন করতে হবে। এবং, প্রয়োজনবোধে কর্তৃপক্ষ এই আদেশের সময়সীমা তাদের ইচ্ছানুযায়ী বাড়াতে পারবেন।
সবাই অবশ্য কর্তৃপক্ষের ঘোষণার এই বাক্যগুলোকে কেবল অফিসিয়াল বাগাড়ম্বর হিসেবে মনে করল। ফলে জানুয়ারি মাসের ২৫ তারিখের রাত একটি উৎসবের রাতে পরিনত হলো। নিজেকে জনপ্রিয় এই উৎসবের সাথে সংশ্লিষ্ট করার জন্যে নগরপিতা স্বয়ং অতীতের মতো রাস্তায় রাস্তায় আলোকসজ্জা করার নির্দেশ দিলেন। শহরের লোকজন উজ্জ্বল আলোর নীচে প্রবল ফুর্তিবাজ দলে বিভক্ত হয়ে হাসাহাসি ও নাচানাচিতে মেতে উঠল।
সত্য যে, সেদিনও কিছু কিছু বাসস্থানের ফটকগুলো বন্ধ ছিল এবং সেগুলোতে অবস্থানকারীরা নিঃশব্দে বাইরের আনন্দময় চিৎকার শুনল। তবে এই শোকের বাসস্থানগুলোতেও একটা মুক্তির অনুভূতির আমেজ চলে এলো। প্লেগ কমে যাবার ফলে এই বাসাগুলো হতেও অন্য সদস্যদের নিয়ে চলে যাওয়ার ভয় কমে গেল, অথবা তাদের মন হতে ব্যক্তিগত উদ্বিগ্নতার ছায়া সরে গেল।
কেবলমাত্র কিছু সংখ্যক পরিবার জোর করে বাধ্যতামূলকভাবে নিজেদেরকে এই আনন্দযজ্ঞে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখল। এই পরিবারগুলোর অন্তত একজন করে সদস্য প্লেগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে, কোয়ারেনটাইন ক্যাম্পে অথবা বাসায় অবস্থান করছিল। সন্দেহ নেই যে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই পরিবারগুলোর মধ্যেও আশার সঞ্চার হয়েছিল। তবে তারা নিজেদেরকে আবদ্ধ করে রাখল পরিস্থিতি আরও বা সম্পূর্ণ ভালো হবার অপেক্ষায়। তবে নির্জনে ও নির্বাসনে আনন্দ-বেদনার মধ্যবর্তী স্থানের কারাগারে তাদের এই অপেক্ষা চারপাশের মানূষদের আনন্দের বিপরীতে অনেক বেশি নিষ্ঠুর বলে মনে হলো।
কিন্তু এই ব্যতিক্রমগুলো সংখ্যাগরিষ্ট মানুষদের সন্তুষ্টিকে কমালো না। ফলে প্লেগ তখনও শেষ হয়ে না গেলেও কল্পনায় তারা শুনতে পেল রেলগাড়ি বাঁশি বাজিয়ে বাইরের সীমানাহীন পৃথিবীতে চলে যাচ্ছে এবং জাহাজগুলো পোতাশ্রয় হতে নোঙর তুলে উজ্জ্বল সাগরে ভাসছে। অবশ্য কয়েকদিনের মধ্যেই তাদের মন থেকে এই ফ্যান্টাসিগুলো উবে গেল এবং সন্দেহ ফিরে এলো। তবুও এরপর থেকে যখনই কোনো কারণে শহরের মানুষদের মধ্যে কর্মচঞ্চলতা ফিরে আসত, তখনই তারা আবার স্বপ্নে বিভোর হতো। নিজেদেরকে ভাবত জাহাজভর্তি বেঁচে যাওয়া একদল মানুষ হিসেবে, যারা যাত্রা শুরু করেছে প্রতিশ্রুতির দেশের দিকে।
সেই রাতে ত্যারু, রিও, র্যাম্বার্ট, এবং তাদের সহকর্মীরা সেই জনতার মিছিলে কিছুক্ষণের জন্যে যোগ দিলো এবং অনুভব করল যে, তারাও বাতাসের ওপরে নাচছে। তবে মূল সড়কের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার অনেক পরে, তারা গলিপথ দিয়ে সেই বদ্ধ বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে হাঁটার সময়ে নিজেদেরকে বন্ধ ফটকের পেছনের মানুষদের দুঃখ থেকে বিযুক্ত করতে পারল না। ফলে ভবিষ্যৎ মুক্তি তাদের জন্যে সুখ ও অশ্রু দুই অর্থই হয়ে রইল।
জনগণের বিজয়োল্লাসের শব্দ যখন উচ্চকিত হয়ে গর্জনে রূপ নিচ্ছিল, সেই মুহূর্তে ত্যারু হঠাৎ করে থেমে গেল। অন্ধকারের ভেতরে সে দেখতে পেল একটি ছোট্ট, শীর্ণকায় প্রাণীর অবয়ব। রাস্তার ওপরে লাফালাফি করছে। সেটি অন্যকিছু নয়, একটি বিড়াল। গত বসন্তের পর এই প্রথমবার সে বিড়াল দেখল। তার সামনেই বিড়ালটি রাস্তার ওপরে থামল, একটু ইতস্তত করল, নিজের থাবাকে চাটল এবং পরক্ষণেই সেটিকে তার ডান কানের পেছনে লুকালো। তারপর আবার সামনের দিকে এগুলো এবং অন্ধকারের ভেতরে মিলিয়ে গেল। ত্যারু নিজমনে হাসলো। ভাবল যে, ঝুলবারান্দার সেই ছোট্ট বুড়ো মানুষটিও তার মতো খুশি হবে।
চলবে....