ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

খালেক জ্যাঠা ও নববর্ষের এক সকাল

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ০৯:৪৮, ১৪ এপ্রিল ২০২৩
খালেক জ্যাঠা ও নববর্ষের এক সকাল
ছবি কৃতজ্ঞতাঃ সাইফুল আলম

খালেক জ্যাঠা। আমাদের সঙ্গে তার সম্পর্ক বন্ধু বা প্রতিযোগীর মতো। আমরা মানে শিশুরা। অভিভাবক সুলভ কোন আচরণই নেই তার মধ্যে। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের কখনই বয়স বাড়ে না। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি। খালেক জ্যাঠা এই গোত্রের।  

আমাদের বংশের বাড়ি। উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত। সবচেয়ে দক্ষিণের ঘরটি খালেক জ্যাঠার। কুঁড়ে ঘর। অধিবাসী শুধুমাত্র তিনি। জেঠী মারা গেছে কয়েক বছর আগে। চার সন্তান তার। তাদের নিজেদের সংসার হয়েছে। থাকে আলাদা বাড়িতে। একমাত্র মেয়েও  বিয়ের পর শশুর বাড়িতে। 

খালেক চাচার ঘরের সামনে এক চিলতে উঠোন। এরই  এক অংশে চাষ করা হয়েছে ডাঁটা, বেগুন, মরিচ, পেঁপে, সীম এবং হরেক রকমের মৌসুমি শাক-সব্জি। অন্য অংশে নিকানো উঠোন। উঠোনের শেষ প্রান্তে ঢালু। নামতে নামতে মিশে গেছে দক্ষিণের পগারের ভেতর। এর ঢালুতে লাউ, মিষ্টি কুমড়া আর শসার আবাদ করেছেন। সারা বছরের শাকসব্জির চাহিদা তিনি পূরণ করে থাকেন তার এই অনন্য বাগান থেকে। ঢালু বরাবর পূর্বপশ্চিমে কলাগাছের সারি। ঘন সবুজ প্রাচীর সৃষ্টি করেছে। সারা দিনমান ধরে ঝিরঝির শব্দ করে কলার পাতা নড়ে। দক্ষিণ দিক থেকে আসা বাতাসে। উঠোনের এককোণে মাটির তৈরি চুলা। খালেক চাচা নিজের রান্নাবান্না নিজেই করেন। খালেক জ্যাঠার কোনো  অভাব নেই। বর্গা চাষ ও  দিন মজুরী করে নির্বিঘ্নে তার অন্নের অভাব পূরণ করে থাকেন। তবে সারাবছর নয়। নিজের পছন্দ অনুযায়ী সময়ে। 

গ্রাম বা সংসারের কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। এ নিয়ে তিনি মোটেই চিন্তিত নন। আমাদের মতো বালক বালিকা বা শিশুদের সঙ্গেই তার প্রবল সখ্য। ফাল্গুন বা চৈত্রের সময়ে বাড়ির  দক্ষিণ পাশের পগারটা শুকিয়ে যায়। সেখানটায় উপত্যকার মতো নিচু স্থানের সৃষ্টি হয়। এখানেই আমরা বাড়ীর সকল শিশু-কিশোরেরা প্রতিদিন গোধূলির সময়ে কুমীর-কুমীর খেলি। খালেক জ্যাঠা এই খেলার প্রধানতম খেলোয়াড়। তিনি সাজেন  কুমীর। আমরা খালেক জ্যাঠাকে পাশ কাটিয়ে শুকনো পগারের এক পাড় থেকে অন্য পাড়ে যাবার চেষ্টা করি। খালেক চাচা চেষ্টা করেন আমাদেরকে ছুঁয়ে দিতে। কাউকে স্পর্শ করলেই সেও কুমির হয়ে যায়। কুমীরের বাচ্চা। খেলতে খেলতে এক সময়ে আমরা সবাই কুমীর। সূর্য ডুবে যায়। সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। অন্ধকারে জোনাকিরা আলো জ্বালায়। অদ্ভুত এই আলো–অন্ধকারে আমরা সবাই প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপ পরিবারের সদস্য হয়ে উঠি। 

Advertisement

চৈত্র বা বৈশাখ মাসে খালেক জ্যাঠার ব্যস্ততা বাড়ে। সারা দিনমান কলাগাছের মৃদুমন্দ বাতাসে চরকা দিয়ে সুতো কাটেন। কখনও কখনও চাঁদের আলোতেও। চরকার সুতা দিয়ে ঠ্যালাজাল, ছিপজাল, ঝাঁকিজাল ইত্যাদি তৈরি করেন। বাড়ির উত্তরের গাবগাছ থেকে গাব পেড়ে আনেন। তৈরি জালগুলোকে এক এক করে রঙিন করেন। কখনো তিনি বাঁশ ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে এনে ধুমার (মাছ ধরার বিশেষ ধরনের টোপ) তৈরি করেন। অথবা পুরনো ছাতার লোহার চিকন চিকন শিক ব্যবহার করে বাঁশের আগায় লাগিয়ে কোঁচ তৈরি করেন। আমরা শিশু-কিশোরেরা অবাক বিস্ময়ে  তার ফাঁদ ও অস্ত্র তৈরী করা দেখি। সারাদিন তার পাশে বসে থাকি। 

বর্ষাকালটা খালেক জ্যাঠার জন্যে মহা আনন্দের। সারা দিন জাল নিয়ে এক পগার থেকে অন্য পগারে বিচরণ করতে থাকেন। মাছগুলোও যেন কেমন। তারা ইচ্ছে করেই শুধু তার জাল বা কোঁচেই  ধরা দেয়। এভাবে সারা বর্ষাকাল ধরে খালেক জ্যাঠা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কালে বার্মার ইমফাল- কোহিমায় জাপানী সেনাদলের মতন ‘লিভ অফ দ্য ল্যান্ড’ করতে থাকেন। 

শীতের ভোরে পৃথিবী ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যায়।  কয়েক গজ দূরের মানুষকেও চেনা দায় হয়ে যায়। আমরা শিশুরা প্রতিনিয়ত লেপের উষ্ণতাকে অবজ্ঞা করে সুবহে সাদেকেরও অনেক আগে চান চাচাদের বরই গাছের তলায় পৌঁছে যাই। গিয়ে দেখি খালেক জ্যাঠা ছেঁড়াকাঁথা গায়ে জড়িয়ে আমাদের অনেক আগে থেকেই বরই কুড়চ্ছেন। 
 
গ্রীষ্মকাল। কাল বৈশাখীর ঝড়। প্রবল বাতাসে আমাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাবার জোগাড়। আমরা ঝড় বৃষ্টিকে অবজ্ঞা করে আম কুড়াই। আমাদেরকে নেতৃত্ব দেন খালেক জ্যাঠা।

১৯৭০'র দশক।  আমার পিতা ঝাড় কাটা হাইস্কুলের হেডমাস্টার। স্কুলের সামনের ফুটবল খেলার মাঠের চারপাশ ঘিরে  ৫০টি আম গাছ লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি খালেক জ্যাঠাকে ডেকে বললেন, “স্কুলের মাঠের চারাগাছগুলোকে যত্ন নিতে হবে। বিনিময়ে মাসে ১০ টাকা মাইনে”। খালেক জ্যাঠার হাতে অমাবস্যার চাঁদ! তিনি বাঁশ ঝাড় থেকে বাঁশ কেটে গোল গোল খাঁচা তৈরি করছেন। সকাল বিকাল চারাগাছের গোঁড়ায় পানি ঢালছেন। সারাদিনমান ধরে মাঠের ভেতরে ছুটোছুটি করছেন। আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে বড় হচ্ছে খালেক জ্যাঠার  আমগাছগুলো।

১৯৮০'র দশক।  ক্যাডেট কলেজ থেকে গ্রীষ্মকালীন টার্ম এন্ড ছুটিতে গিয়ে দেখি আমার চেয়ে দ্বিগুণ বড় হয়ে গেছে আমের চারাগুলো। মুকুলে মঞ্জরিত হয়ে আছে সকল গাছের মাথা। স্কুলের এসেম্বলি ক্লাস হচ্ছে। ‘আমার সোনার বাংলা’ গানে মুখরিত স্কুল প্রাঙ্গণ। খালেক জ্যাঠা একটা আমগাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছেন। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গি কোনো  কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ‘হেড অফ এইচ আর’ এর মতো। আমি মুগ্ধ।
 
১৯৮০'র দশকের মাঝামাঝি সময়। বাংলা নববর্ষের আগের রাত। স্কুল মসজিদের পেছনে ঝাড় কাটা বাজার। কয়েকটা মাত্র দোকান। কলাগাছ দিয়ে দোকানগুলোর গেট সাজানো হয়েছে। সাথে রঙিন কাগজের ফুল। নববর্ষের হালখাতা অনুষ্ঠিত হবে। বটগাছের তলায় বিশাল কড়াইতে মার্বেল সাইজের রসগোল্লা তৈরি করা হচ্ছে।স্কুল মাঠের মাঝখানে দুই তিনটা বিশাল লম্বা বাঁশকে জোড়া দিয়ে একটা পাইলন তৈরি করা হয়েছে। এই পাইলনের মাথা থেকে অনেকগুলো রশির গায়ে ত্রিকোণাকার কাগজের ছোট ছোট ফ্ল্যাগ ময়দার আঠা দিয়ে লাগিয়ে আমগাছগুলো পর্যন্ত বিস্তৃত করা হয়েছে। সফরদ্দি ভাই ও  তার সতীর্থরা কাঠের টেবিলের ওপরে সাদা চাদর দিয়ে বিশাল রেডিও তৈরি করেছেন। এর ভেতর থেকে  নববর্ষের সন্ধার বিচিত্রানুষ্ঠানে গান ও  খবর পরিবেশন করা হবে। 

নববর্ষের সকাল। চারদিক মুখরিত নতুন বছরের বর্ণচ্ছটায়। কিন্তু স্কুল মসজিদের পাশের আমগাছটার তলায় একটা অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। খালেক জ্যাঠা আমগাছের গোঁড়ায় মাথা দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন। তার দুই চোখ খোলা ও স্থির। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। সকালের নরম আলো তার সুখী মুখের ওপরে প্রতিফলিত হয়ে অপরূপ স্বর্গীয় দ্যুতি ছড়াচ্ছে।

শুধু কয়েকটা শালিক পাখি নিশ্চুপ শুয়ে থাকা খালেক জ্যাঠার চারপাশে ছুটোছুটি করছে। চারপাশের মানুষের ভিড়কে তারা ভ্রূক্ষেপ করেও দেখছে না।  খালেক জ্যাঠা প্রকৃতির অংশ হয়ে গেছেন। তিনি নিজেও এখন একটা শালিক পাখি!

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!