ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

নববর্ষ ও বাংলা সনের নামকরণ নিয়ে কিছু কথা

নিঘাত কারিম
প্রকাশিত: ১৩:০৪, ১৪ এপ্রিল ২০২৪
নববর্ষ ও বাংলা সনের নামকরণ নিয়ে কিছু কথা
ছবি: সংগৃহীত

বাংলা সনের নামকরণের ইতিহাসে মোঘল সম্রাট আকবরের ভূমিকাই প্রবল। সম্রাটের সিংহাসনে আরোহনের দিনকে স্মরণীয় করে রাখতে রাজ জ্যোতিষী আমীর ফতেহ আলি সিরাজী যে ফসলি সন প্রবর্তন করেন তা বাংলা সন হিসেবে পরিচিত। বঙ্গাব্দ মূলতঃ বাংলার জন্য উদ্ভাবিত বলেই একে বাংলা সন বলা হয়।

নিজ অক্ষরেখায় পৃথিবীর ঘুরতে যে সময় লাগে তাকে দিন। সাতদিনে হয় এক সপ্তাহ আর ৩০ দিনে হয় মাস। পৃথিবীর চারিদিকে চাঁদের ঘুরতে যে সময় লাগে তাকে চন্দ্রমাস বলে। যে সন চন্দ্রের হিসেবে গ্রহণ করা হয় তাকে চন্দ্রসন এবং যে সন সূর্যের হিসেবে গণনা করা হয় তাকে সৌরসন বলা হয়। সৌরসনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে প্রচলিত হিজরি সনকে ফসলি সন হিসেবে চালু করার মাধ্যমেই বাংলা সনের বা বঙ্গাব্দের জন্ম হয়। বাংলা সন হিজরি সনেরই সৌর রূপ।

সম্রাট আকবরের সময় থেকে বাংলা সন শুরু হয়। বাংলা বারোমাস আর বারের নামকরণ করা হয়েছে গ্রহ, উপগ্রহ ও নক্ষত্র থেকে। প্রাচীনকালে উপমহাদেশে প্রচলিত ছিল পঞ্জিকা। পঞ্চাঙ্গ নামেও এর প্রচলন ছিল। পঞ্জিকা গণনা পদ্ধতি শুরু হয়েছিল ১৫০০ পূর্বাব্দে। তখন বছরকে ভাগ করা হয়েছিল বারো মাসে। সেই সময় নামগুলো ছিল- তপ, তপস্যা, মধু, মাধব, শুভ্র, শুচি, নভস, নভস্য, ইষ, উর্য, সহস ও সহস্য।

Advertisement

পরে মহাশূন্যের নক্ষত্রের নামানুসারে বারোমাসের নামকরণ করা হয়। রাশিচক্রে নক্ষত্র সংস্থাপন চিত্র থেকে বুঝা যায় যে প্রাচীনকালে কীভাবে চন্দ্র মাসের নামকরণ করা হতো। সাধারণত পূর্ণিমার পরদিন থেকে চন্দ্রমাসের সূচনা হতো। যখন যে নক্ষত্র পূর্ণিমাস্ত হয় তখন তার নামানুসারে মাসের নাম নির্ধারিত হয়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রে পূর্ণমাস্ত হওয়ার পর যে মাস শুরু হয় তার নাম বৈশাখ। কৃত্তিকা নক্ষত্রে পূর্ণিমাস্ত হলে কার্তিক। আকাশে চন্দ্রের গতির কারণে প্রতিভাত হয় চন্দ্র-দশা আর যা থেকে আমরা ধারণা করি মাসের। বাংলা সালটির সঙ্গে জ্যোতিষী গণনার সম্পর্ক ছিল বলে প্রতিটি মাসকে এক একটি নক্ষত্রের নামে নাম রাখা হয়েছে।

যে চন্দ্রমাসে সাধারণত মৃগশিরা নক্ষত্রের পূর্ণিমাস্ত হয় একে মার্গ-শীর্ষ বলে। এই সময় চাঁদ মৃগশিরা নক্ষত্রের কক্ষপথে অবস্থান করে। এই নক্ষত্রের অপর নাম অগ্রহায়ণী। তাই এই মাসের নাম রাখা হয়েছে অগ্রহায়ণ। এটিকে ফসলি মাস হিসেবে অগ্রগণ্য করতে গিয়ে এর নাম দেওয়া হয় অগ্রহায়ণ। বাংলাদেশের কথ্য ভাষায় একে আগন বলা হয়। নববর্ষ অনুষ্ঠানের প্রাচীন ধারার দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যাবে যে প্রাচীনকালে নববর্ষ শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাসে। অগ্রহায়ণ নামটির অর্থের মধ্যেই এর ইঙ্গিত রয়েছে। হায়ণ অর্থ বছর। অগ্র হায়ণ বছরের প্রথম। অগ্রহায়ণ শব্দের পুরো অর্থ প্রধান শষ্য অথবা ধান। অগ্রহায়ণী নক্ষত্র থেকে এর নাম হয়েছে। প্রাচীন লোকের বিশ্বাস ছিল অগ্রহায়ণী উদয়ে ধান পাকে। বাঙালির জীবনে নববর্ষ ও তাকে উপলক্ষ করে উৎসব শুরু হয়েছে ফসল উৎপাদনের সূচনা ধরে। আর সেই উৎসব পালন হতো অগ্রহায়ণে, বৈশাখে নয়।

বারোমাসে এক বছর হয়। কোনো বারোমাসীতে বৈশাখ, কোনোটাতে অগ্রহায়ণ আবার কোনো বারোমাসীতে মাঘ মাসকে বছরের প্রথম মাস ধরা হয়।

মাসে মাসে প্রকৃতি কী রূপ ধারণ করে। মানুষের মাঝে এর কী প্রভাব পড়ে, নর-নারীরা কীরূপ আচরণ করে, এর বর্ণনা পাওয়া যায় বারোমাসীতে।

সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলা সন, মাস, বার ইত্যাদি রীতিবদ্ধ গণনা পরিবর্তিত হয়। তখন থেকেই বছরের প্রথম মাস হিসেবে বৈশাখের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

ড. নীহার রঞ্জন রায়ের মতে, বাঙালির নববর্ষের উৎসব ছিল নবান্ন। তখন অগ্রহায়ণ মাসেই নবান্ন হতো। মুর্শীদকুলি খাঁ যখন শাসক ছিলেন তখন খাজনা আদায়ের জন্য ধার্য হয় বৈশাখ মাস। অবশ্য বৈশাখ মাসই বাংলা বর্ষের প্রথম মাস ছিল, এর বহু বর্ণনা পাওয়া যায়।

বঙ্গাব্দের এই বারোমাসের নামকরণ গৃহীত হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক প্রাচীন গ্রন্থ ‘সূর্য সিদ্ধান্ত’ থেকে।

বারো মাসের নামকরণ
বৈশাখ: বিশাখা নক্ষত্র থেকে এই মাসের নামকরণ হয়েছে। বৈশাখে থাকে ৩১ দিন।

জৈষ্ঠ: জেষ্ঠা নক্ষত্র থেকে এই মাসের নামকরণ হয়েছে। জৈষ্ঠ মাসে ভীষণ গরম পড়ে। ৩১ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

আষাঢ়: অষধা নক্ষত্র থেকে আষাঢ় মাসের নাম এসেছে। আষাঢ়ের কথা মনে হলেই চোখের সামনে ঘন কালো মেঘ ভেসে বেড়ায়। ৩১ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

শ্রাবণ: এই সময়ের পূর্ণিমায় চাঁদ শ্রবণা নক্ষত্রের কক্ষপথে অবস্থান করে। শ্রবণা নক্ষত্রের নামেই এ মাসের নাম রাখা হয়েছে। এ মাসে সারাদিন বৃষ্টি ঝরতে থাকে। ৩১ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

ভাদ্র: ভদ্রা নক্ষত্রের নাম থেকে এই মাসের নামকরণ করা হয়েছে। ভাদ্রে গ্রাম বাংলায় শুভ্র কাশ ফুল ফোটে। ৩১ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

আশ্বিন: অশ্বিনী নক্ষত্রের কক্ষপথে এই সময় চাঁদ অবস্থান করে। তাই এ মাসের নাম আশ্বিন। পূজা-পার্বণের জন্য এটি সবার কাছে প্রিয়। ২৮ দিন রয়েছে এ মাসটিতে।

কার্তিক: কৃত্তিকা নক্ষত্রের নাম থেকে এই মাসের নাম হয়েছে কার্তিক। এ মাসে নানা রঙ্গে সাজে প্রকৃতি। ৩০ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

অগ্রহায়ণ: এই সময় চাঁদ মৃগশিরা নক্ষত্রের কক্ষপথে অবস্থান করে। এই নক্ষত্রের অপর নাম অগ্রহায়ণী। ৩০ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

পৌষ: পুষ্যা নক্ষত্রের নাম থেকে এই মাসের নাম হয়েছে পৌষ। এ মাসে মজার মজার পিঠা পার্বন হয়ে থাকে। ৩০ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

মাঘ: মঘা নক্ষত্রের নাম থেকে এই মাসের নাম রাখা হয়েছে মাঘ। প্রচণ্ড শীত উপেক্ষা করেও সবাই নানা ধরনের উৎসব আনন্দে মেতে ওঠে। ৩০ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

ফাল্গুন: ফাল্গুনী নক্ষত্রের নামানুসারে এই মাসের নামকরণ করা হয়েছে। ৩০ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

চৈত্র: বছরের শেষ এ মাসের নাম এসেছে চিত্রা নক্ষত্র থেকে। এ মাসের শেষের দিন চৈত্র সংক্রান্তি পালন হয়ে থাকে। ৩০ দিনে মাসটি সম্পন্ন হয়।

সবাইকে রইল নববর্ষের শুভেচ্ছা।

এমন করে ঘুরে ঘুরে চাঁদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে নববর্ষ আসুক সবার জীবন রাঙিয়ে দিয়ে।

লেখা: নিঘাত কারিমের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!