ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিল্প ও সাহিত্য ]

বুন্স আইল্যান্ড (Bunce Island)

মোহাম্মদ আসাদুল্লাহ
প্রকাশিত: ১২:৩৮, ১২ জুলাই ২০২৪
বুন্স আইল্যান্ড (Bunce Island)
ছবি: অন্তর্জাল

“সত্য কখনো কখনো আমাকে বালির নীচে পুঁতে রাখা একটা শহরের কথা মনে করিয়ে দেয়। সময় অতিক্রান্ত হবার সাথে সাথে তার ওপরে আরও পুরু বালির স্তর জমে ওঠে, এবং তারপর কদাচিত সেগুলো বাতাসে উড়ে গেলে  নীচের সবকিছু প্রকাশিত হয়ে যায়।"- হারুকি মুরাকামি

অ্যালেক্স হ্যালির বিখ্যাত উপন্যাস ‘রুটস’ নিয়ে তৈরী করা  মুভি সিরিয়াল ‘রুটস’ এর কথা নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে! পৃথিবীর ১৩০ মিলিয়ন মানুষ এই মিনি সিরিয়ালটি দেখেছিল। সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বর্ণ বিষয়ক আলোচনায় নতুন মাত্রার সৃষ্টি করেছিলো এটি। হঠাৎ আলোর ঝলকানি দিয়ে পৃথিবীর সবার সামনে দৃশ্যমান করে তুলেছিল বিশ্ব ইতিহাসের কালিমালিপ্ত এক অধ্যায়কে। অন্ধকার বেলাভূমিতে ঠিক যেমন করে সাগরের বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে দুগ্ধফেননিভ ঊর্মিমালা নিয়ে।

১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ। পশ্চিম আফ্রিকার বন বেষ্টিত নিবিড় গ্রাম। বয়:সন্ধিক্ষনের আফ্রিকান এক কিশোর। নাম কুন্তা কিন্তে। বাবা, মা, ভাইদেরকে নিয়ে তার সময় কাটে নিবিড় বনানীর ভেতরে। কিন্তু একদিন কাঠ খুঁজতে গিয়ে সে ধরা পড়ে যায় ‘সভ্যজগতের’ ক্রীতদাস ব্যবসায়ীদের হাতে। প্রতিরোধের সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয় তার। কুন্তার যাত্রা শুরু হয় জাহাজে করে, ‘সভ্য’ পৃথিবীর পথে! চরম অমানবিকভাবে- পশুদেরকেও এমনভাবে পরিবহন করা হয় না!

Advertisement

আমেরিকার মাটিতে নামার পর এক  সাদা মালিকের কাছে বিক্রি হয়ে যায় কুন্তা। নাম পরিবর্তিত হয়ে হয় ‘টবি’। কিন্তু আটলান্টিকের মুক্ত বাতাস আর পশ্চিম আফ্রিকার স্নেহময় নৈসর্গিক প্রতিবেশের ভেতরে বেড়ে উঠা কুন্তা দাসত্বের জীবনকে মেনে নিতে পারে না। অবিরাম পালানোর চেষ্টা করতে থাকে সে। কিন্তু প্রতিবারই ধরা পড়ে এবং  সহ্য করে  অমানুষিক নির্যাতন। অবশেষে মালিকের কুঠারের আঘাতে পায়ের অর্ধেকটা হারিয়ে মুক্তির পথ চিরতরে হারায়।

তারপরেও কুন্তার  প্রতিরোধ শেষ হয় না। মেয়ে কিসিকে সে শুনায় আফ্রিকার নিজের গ্রামের গল্প, হারিয়ে ফেলা কৈশোর আর বাবা-মা,ভাইবোনদের গল্প। চারপাশের সকলকিছুর নাম শিখায় নিজের উপজাতির ভাষায়। তাকে তৈরী করতে চায় আফ্রিকার ঐতিহ্য সচেতন কোন নারীতে। কিন্তু প্রেমিকের জন্য জাল মুক্তিপত্র লিখে দেবার কারণে অন্য মালিকের কাছে বিক্রি হয়ে যায় কিসি। সেটাই কন্যার সাথে শেষ দেখা কুন্তার। আমরাও হারিয়ে ফেলি কুন্তাকে।

কুন্তার মত অসংখ্য মুক্ত মানুষকে অষ্টাদশ শতাব্দীতে তাদের জন্মস্থান পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল জাহাজে করে। দাস হিসেবে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল ইউরোপের শিল্পবিপ্লব। প্রযুক্তির এই মহাযজ্ঞে বলিদান ঘটেছিল কুন্তার মত লাখো মুক্ত মানুষের।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরু। আমেরিকা তখন ব্রিটিশ শাসনাধীন। আমেরিকায় তখন তুলা ও আঁখ চাষের প্রসার ঘটেছে। ইংল্যান্ডের শিল্পে কাঁচা মাল হিসেবে ব্যবহৃত হবার জন্যে। সীমাহীন এই চাহিদা। এই চাহিদা পূরণের জন্যে আমেরিকায় উর্বর জমির অভাব না থাকলেও অভাব ছিল শ্রমিকের। কারণ, আমেরিকার আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানরা কখনই ব্রিটিশ আধিপত্য মেনে নেয়নি। লড়াই করতে করতে তারা গভীর জঙ্গল ও পাহাড় পর্বতের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। ফলে তাদেরকে শ্রমিক হিসেবে ব্যবহার করা যায়নি। এর সমাধান খুঁজে পেয়েছিল তারা আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিম উপকুলে। এখান থেকে লক্ষ লক্ষ কৃষ্ণবর্ণ মানুষকে জোর-জবরদস্তি করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সাদা প্রভুদের তুলা ও আখের ক্ষেতে শ্রম খাঁটার জন্যে। ইতিহাসে এই অমানবিক ব্যাপারটি পরিচিত হয়ে আছে ‘দ্য ট্রান্স আটল্যান্টিক স্লেভ ট্রেড’ নামে।

আটলান্টিক মহাসাগর ও সিয়েরালিওন নদীর মোহনার সংযোগস্থলে অবস্থিত বুন্স আইল্যান্ডে স্লেইভ পোর্ট স্থাপিত হয় ১৬৭০ সালে। সিয়েরালিওনের রাজধানী ফ্রিটাউন হতে ২০ মাইল উজানে। পশ্চিম আফ্রিকার প্রধানতম স্লেইভ পোর্ট হিসেবে বিবেচিত হত এটা। বুন্স আইল্যান্ড ও এই অঞ্চলের আরও কয়েকটি পোর্টের মাধ্যমে আমেরিকায় আনীত হয়েছিল প্রায় ৬ মিলিয়ন মানুষ। ১৮০৭ সালে ট্রান্স আটল্যান্টিক স্লেভ ট্রেড বিলুপ্ত ঘোষণা করার পূর্ব পর্যন্ত।

সেই থেকে ক্রমাগত বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যেতে থাকে ‘বুন্স আইল্যান্ড’। তবে অন্যান্য স্লেভ পোর্টের সাথে বুন্স আইল্যান্ডের পার্থক্য হলো পরবর্তীতে এখানে কোন মানববসতি গড়ে উঠেনি। স্লেভ ট্রেডের কলংকিত স্মৃতি নিয়ে এটা বিলীয়মান হয়ে যেতে থাকে নিবিড় সবুজ বনানীর ভেতরে। পশ্চিম  আফ্রিকার  সিয়েরা লিয়ন নদীর মোহনায় এবং আটলান্টিক মহাসাগরের তীরে।

২০০২ সাল। মে মাসের রৌদ্রদগ্ধ দিন। আটলান্টিক মহাসাগরের সৈকতবর্তী এলাকা গডরিচ। এখানেই অবস্থান নিয়েছে  আমাদের অর্থাৎ বাংলাদেশ সিগন্যাল ব্যাটালিয়ন নম্বর ২ (ব্যানসিগ-২) এই ইউনিট সদরদপ্তর। পুরো ইউনিটটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো সিয়েরালিয়নে। গডরিচে  আছে ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরের অফিস ও ব্যারাকের পাশাপাশি ফোর্স হেডকোয়ার্টার কোম্পানি ও সেক্টর-২ সিগন্যাল কোম্পানির বাসস্থান এলাকা। ইউনিট অধিনায়কের নাম কর্নেল আসিফ। ইউনিট উপ-অধিনায়ক মেজর মইন। ফোর্স হেডকোয়ার্টার কোম্পানির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শেখ মামুন খালেদ। সেক্টর-২ কোম্পানির অধিনায়ক মেজর দিদার। হেডকোয়ার্টার কোম্পানি ও সেক্টর-২ সিগন্যাল কোম্পানির অফিস এলাকা ফ্রিটাউন শহরে হোটেল ম্যামিয়োকো ও সন্নিকটবর্তী এলাকায়। UNAMSIL (United Nations Mission in Sierra Leone) সদর দপ্তরের আশেপাশে। আমার বদলি  সেক্টর-২ কোম্পানিতে। মেজর দিদারের কোম্পানি অফিসার হিসেবে। ছুটির দিন বাদে প্রতিদিন আমাদের অফিস শেষ হয় দুপুর দুই ঘটিকায়। অতঃপর আমরা ফিরে আসি কন্টকাকীর্ণ গডরিচ এলাকায়।

সেখানে ইউনিট অধিনায়ক কর্নেল আসিফের নেতৃত্বে শুদ্ধ সামরিক জীবন যাপন করি। প্রত্যহ সকালে ইউনিটের অফিসারেরা দল বেঁধে লুমলে অথবা গডরিচ সৈকতে যাই। দৌড়াতে দৌড়াতে। ধূলিধূসরিত পথে। লালচে ধুলায়  সারা আকাশ আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। কুয়াশার মত। প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকত ভ্রমণ শেষে ম্যামিয়োকো  হোটেলের কাছে সমুদ্র তীরে ব্যায়াম করি। সামুদ্রিক কাছিমের মত। হাত-পা নেড়ে নেড়ে। তারপর  দলবেধে গডরিচে ফিরে আসি।

প্রতিদিন ব্রেকফাস্টের পর আমরা যার যার অফিসে চলে যাই। একটা ধূলিধূসরিত রাঙামাটির পথ দিয়ে। এই পথটি ফ্রিটাউন হতে গডরিচ হয়ে অ্যাটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল দিয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গেছে। রাস্তাটির নাম পেনিনসুলার রোড। রাস্তার পশ্চিম পাশ দিয়ে পাহাড়ি এলাকা। সারি সারি সবুজ পাহাড়। সিয়েরালিওনের সবচেয়ে বড় রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকা এটি। আর রাস্তার পূর্ব পাশ দিয়ে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর। নয়নাভিরাম তার সৌন্দর্য।

মেজর দিদার স্যার এবং আমি দুজনেই মৃদুভাষী। সুতরাং দুপুর পর্যন্ত আমাদের নিশ্চুপ অলস সময় কাটে। দুপুর দুই ঘটিকায় ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে প্রত্যাবর্তন করি। রোদের উত্তাপে গনগণ করতে চারপাশ। বাঁশ-সিমেন্ট-কাঠ দিয়ে একটা বিশাল ডাইনিং হল তৈরী করা হয়েছে। ইউনিটের ভেতরে সবচেয়ে বড় স্ট্রাকচার এটি। দেখতে অনেকটা গ্রাম্য পাঠশালার মত। এখানে ইউনিটের সকল অফিসার একসাথে একটা দীর্ঘ টেবিলের দুই পাশে বসে লাঞ্চ করি। ইউনিট অধিনায়কের নেতৃত্বে। বিকালে যথারীতি গেইমস। বাংলাদেশের সেনা ইউনিটগুলোর মতো। রাতের ডিনারে সকল অফিসারবৃন্দ টাই-স্যুট পরে ডিনার করি। অধিনায়ক খাওয়া শুরু করলে আমরা খাওয়া শুরু করি। তিনি খাওয়া শেষ করার আগেই আমরা কাটাচামচ আর টেবিল চামচ পরস্পরের সমান্তরালে রেখে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। এই জীবন আমি মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের সপ্তম শ্রেণী হতে যাপন করে আসছি। ইতিমধ্যেই ব্যানসিগ-২ এই বনপাহাড়ের দেশে সবচেয়ে রেজিমেন্টেড মিলিটারি ইউনিটের সুনাম কুড়িয়েছে।

ডিনারের পর অধিনায়ক কর্নেল আসিফ, উপ অধিনায়ক মইন স্যার, সাইদুল স্যার এবং আমি ‘স্ক্র্যাবল’ খেলতে বসি। অধিনায়কের ইচ্ছায় তা চলে  রাত এগারোটা অথবা বারটা পর্যন্ত। বেশীরভাগ সময়ে সাইদুল স্যার অথবা অধিনায়ক জিতেন। উপ অধিনায়ক আর আমি প্রতিনিয়ত তৃতীয় অথবা চতুর্থ হই। এই জ্ঞানের খেলায় আমার মন ভরে না। বন্দীত্বের আবহও কাটে না। ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এর চেয়ে ঢের ভাল হতো সিয়েরালিওনের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অবস্থিত পোর্টলোকো, লুন্সার, মাগবুরাকা, ক্যানামা এলাকাগুলোর বন পাহাড়ের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে পারলে।

দিনের প্রায় সকল ওয়াক্তের নামাজ পড়ি। বাঁশের তৈরি মসজিদে। নুড়ি পাথরগুলোকে সমতল করে তার উপরে ত্রিপল বিছানো হয়েছে। তার ওপরে বাংলাদেশের সোনালী আঁশের তৈরি চটের জায়নামাজ। মাতৃভূমিকে ভুলে থাকার কোন অবকাশই নেই এখানেও।  শুধুমাত্র বৃহস্পতিবার সন্ধ্যের পর অনুষ্ঠিত হয় বারবিকিউ পার্টি। ফ্রিটাউন থেকে জাতিসঙ্ঘের প্রায় সকল সামরিক অসামরিক সদস্যরা এতে যোগদান করে। শিক কাবাবের মৌ মৌ গন্ধে উপকূল এলাকা ভরে যায়।

ফ্রি-টাউনের ভিক্টোরিয়া পার্কের রাস্তার পাশের ভাসমান বইয়ের দোকান থেকে আমি দুইটা বই কিনে এনেছি। প্রথমটা লিও টলস্টয়ের ‘ওয়ার এন্ড পিস’। পরেরটা সিয়েরালিওনের বিখ্যাত লেখক YEMA LUCILDA HUNTER এর ‘ROAD TO FREEDOM’। এই বইতে উত্তর আমেরিকার NOVA SCOTIA এলাকা হতে সিয়েরালিওনের ফ্রিটাউনে পুনর্বাসিত আফ্রিকান-আমেরিকান ক্রীতদাস পরিবারের মুক্তির সংগ্রামকে বর্ণনা করা হয়েছে। পরের বইটা আমি কিনেছি দুই কারণে। প্রথমতঃ এই দেশের মানুষদের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুটা ধারণা অর্জন করতে। দ্বিতীয়তঃ  KRIO বা CREOLE ভাষা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা অর্জন করতে।  KRIO বা CREOLE ভাষা মূলত ইংরেজি আর সিয়েরালিওনের স্থানীয় ভাষার সংমিশ্রণে সৃষ্ট এক শঙ্কর ভাষা। ‘ROAD TO FREEDOM’ বইটির আলাপচারিতার ভাষা KRIO। এ কারণেই আমার আগ্রহের আতিশয্য অনেক বেশি। তবে এই বইটা আমি পড়ে শেষ করতে পারিনি। বইটি আমার এক ভাতৃপ্রতিম সাংবাদিক ও সিগন্যালসেরই একজন স্নেহভাজন অবসরপ্রাপ্ত অফিসার লেফটেন্যান্ট আবু রুশদের কাছে রক্ষিত আছে। সেখানে সে গিয়েছিল বাংলাদেশ হতে প্রেরিত এক সাংবাদিক দলের সদস্য হিসেবে। উল্লেখ্য, সিয়েরালিওনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করার জন্যে সেই সময়ে এই সাংবাদিকদলকে সেখানে  প্রেরণ করা হয়েছিল। বইটা কীভাবে রুশদের কাছে গিয়েছিল সেটা ভিন্ন এক কাহিনি- অন্যদিন বলব!

ব্যান সিগ-১ থেকে আমরা উত্তরাধিকারসুত্রে পেয়েছিলাম বাঁশ দিয়ে ঘেরা একটা প্রস্তরময় ফণীমনসার বাগান এবং সেই বাগানের বাসিন্দা তিনটে চিত্রা হরিণ। হরিণগুলোর মায়াবী চেহারা প্রস্তরময় গডরিচের সৌন্দর্য কিছুটা বর্ধন করলেও হরিণগুলোকে কখনোই খুব সুখী মনে হয়নি আমার কাছে। কারণ, ইউনিটের পূর্বদিকে রাস্তার ওপারে বিশাল ঘন বন ও পাহাড় থাকলেও ওখানে এই হরিণদের প্রবেশাধিকার ছিল না। ঠিক যেমন আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেও একাকী স্বাধীনভাবে সৈকতে ভ্রমণ করার অধিকার ছিল না আমাদের। যেখানেই যেতাম দলবদ্ধ হয়ে যেতে হতো  নিরাপত্তা জনিত কারণে!

কর্নেল আসিফ একদিন সিদ্ধান্ত নিলেন সমুদ্র অথবা নৌপথে আমাদেকে নিয়ে বুন্স আইল্যান্ডে যাবেন। ব্যাটালিয়ন সদর দপ্তরে অবস্থানকারী সকল অফিসারদেরকে নিয়ে। বুন্স আইল্যান্ডের অবস্থান ‘লুঙ্গি বিমানবন্দরে অবস্থিত বাংলাদেশ ব্যাটালিয়ন-৭ এর দায়িত্বপূর্ণ এলাকায়। লুঙ্গি বিমান বন্দর থেকে একটা পাকা রাস্তা ক্রমশ সরু হয়ে সমুদ্রের তীরে এসে শেষ হয়েছে। এখান থেকে স্পিড বোটে করে কিছুদূর গেলেই সিয়েরালিওন নদীর মোহনা। দেখতে যমুনা নদীর মত বিস্তৃত। সিয়েরালিওনের বিখ্যাত ‘রকেল নদী’ ও পোর্ট লোকো ক্রিক (PORTLOKO CREEK) এর সম্মিলনে সৃষ্ট। ফ্রিটাউন হার্বার নামেও সমধিক পরিচিত। এর ভেতরেই উজানে বিন্দুর মত জলে ভেসে আছে বুন্স আইল্যান্ড।

প্রায় ৪৫ মিনিট জলের উপর দিয়ে চলার পর আমাদের স্পীড বোটগুলো দ্বীপের কাছে ভিড়তেই খেয়াল করলাম ঘন সবুজ অরণ্যানীতে ছেয়ে আছে একটা ছোট্ট দ্বীপ। কবি জীবনানন্দ দাশের বনলতা সেন কবিতার ‘দারুচিনি দ্বীপ’ বললেও অত্যুক্তি হবে না। দূর থেকে মনে হয় যুগযুগান্তর ধরে এখানে কোন মানুষের  বাস করেনি। প্রকৃতির এমনই নিবিড়তা ঘিরে আছে দ্বীপটিকে ঘিরে।

বোট থেকে নেমেই পাথরের তৈরি ঘাট। কঙ্করময় উঠোন। ঘন সবুজ অরণ্যানীতে ঢাকা। দুটো প্রাচীন বৃক্ষ মিলে একটা প্রবেশদ্বারের সৃষ্টি করেছে। বৃক্ষ দুটোর বয়স কত শতাব্দী হবে, তা কে জানে।  বৃক্ষের গায়ে অচেনা ভাষায় খোদিত কোন নাম বা অন্যকিছু। আফ্রিকা হতে আমেরিকায় নিয়ে যাবার পথে এই দ্বীপেই কুন্তা কিন্তেকে রাখা হয়েছিল অন্য সকল বন্দীদের সাথে।  হয়ত পালানোর ব্যর্থ প্রয়াসের পর কুন্তা কিন্তের মত কেউ একজন তার সমস্ত আর্তনাদ দিয়ে লিখেছিল নিজের অথবা কোন প্রিয়জনের নাম।

দ্বীপের শরীরে পা দিতেই যেন তিন শতাব্দী বা তারও পূর্বের ইতিহাস যেন সজীব হয়ে উঠলো। নিস্তব্ধতারও যে ভাষা আছে তা এই প্রথমবারের মত আমি বুঝলাম। সহস্র কালো মানুষের দীর্ঘশ্বাসে আকুল হয়ে আছে দ্বীপরূপী এই বনভূমি।

দ্বীপের উপরে সমুদ্রের তীর ঘেঁষে কিছুদূর পর পর রাখা হয়েছে বিশালাকার কামান। শায়েস্তাখানের আমলের কামানগুলোর মত। বন্দীদের মালিকানা দখল করতে প্রায়ই পর্তুগীজ বা ফরাসী জলদস্যুরা হানা দিত  এই দ্বীপে। ফরাসী নৌবাহিনীও নাকি চার বার আক্রমন করেছিল। তাদের হাত থেকে দ্বীপকে রক্ষা করতে ব্রিটিশরা স্থাপন করেছিল এই কামান গুলো। কামানগুলোর শরীরে ব্রিটিশ রাজমুকুট অংকিত রয়েছে।

পুরো দ্বীপ জুড়ে ঘন বন। বিশাল বিশাল বৃক্ষ। ভেতরে প্রবেশ করতেই একটা মুখর নিস্তব্ধতা আমাদেরকে ক্রমশ গ্রাস করতে লাগল। আমাদের কেউই কথা বলছিল না। কারণ তখন আমাদের মনের ভেতরে উন্মোচিত হচ্ছিল কয়েক শতক আগের কালিমালিপ্ত এক ইতিহাস!

 দ্বীপের মধ্যখানে ভেঙে গুড়িয়ে যাওয়া কুঠুরির ধ্বংসাবশেষ। এখানে বন্দী শিশু ও নারীদেরকে রাখা হতো।

দ্বীপের শেষ প্রান্তে একটা প্রকান্ড গাছের কোটরের নীচে অন্ধকার ভূগর্ভস্থ কুঠুরি। অন্ধকারের কারণে ভেতরে দৃষ্টি চলে না। এই কূঠুরীতে বিদ্রোহী বন্দীদের রাখা হতো। দশজনের জন্যে নির্ধারিত স্থানের মধ্যে শতাধিক বন্দীকে।  উদ্দেশ্য ছিল অন্ধকার, অনাহার ও বদ্ধ গুমোট পরিবেশের মধ্যে রেখে দুর্বল করে দিয়ে তাদের প্রতিবাদমুখরতা চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া। এই প্রক্রিয়ায় অধিকাংশ বন্দীই মৃত্যুবরণ করত। তারপর তাদেরকে নিক্ষেপ করা হতো নদীর  জলে। ভাসতে ভাসতে সেগুলো চলে যেত সাগরের গভীরে হাঙর বা কুমিরের খাদ্য হিসেবে।যারা বেঁচে থাকতো তাদের শুরু হতো দশ সপ্তাহের সমুদ্রযাত্রা। অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ আমেরিকার উদ্দেশে।

বুন্স আইল্যান্ডে আফ্রিকানদের কোন কবর বা সমাধি নেই। তবে কয়েকজন দাস ব্যবসায়ীর সমাধি ফলক আছে। জানা যায় এরা দুর্গকে বাঁচাতে পর্তুগীজ বা ফরাসীদের হাতে নিহত হয়েছিল।

খুব বেশীক্ষণ ছিলাম না আমরা সেখানে। জলের ভেতরে সবুজে ঢাকা ছোট্ট একটা দ্বীপ। ১৬৫০ ফুট দীর্ঘ ও ৩৫০ ফুট প্রশস্থ। পুরো দ্বীপ ঘুরে আসতে বেশি সময় লাগে না। অথচ এই দ্বীপেই রচিত হয়েছিলো শিল্প বিপ্লবের ফসল বর্তমান মানব সভ্যতার ভিত্তি মানবিকতার বিনিময়ে।

(লেখাটি আমার 'সমুদ্রতীরে তাদের পাড়ায় পাড়ায়' রচনার অংশবিশেষ)

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!