নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, নিরাপত্তাহীনতায় নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীরা
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) পড়াশোনার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসেন শিক্ষার্থীরা। নিজ জেলা ও পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে নতুন শহরে এসে আবাসন, পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় তাদের। তবে ক্যাম্পাসের বাইরে চলাচল, মেসে যাতায়াত কিংবা প্রয়োজনীয় কাজে শহরে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। বিশেষ করে চুরি, ছিনতাই, অপহরণ ও হয়রানির অভিযোগের পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা।
সর্বশেষ গত ২ অক্টোবর মাইজদী শহরের বার্লিংটন মোড় এলাকায় মোবাইল ফোন চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে নোবিপ্রবির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে স্থানীয়দের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, একপর্যায়ে স্থানীয় কয়েকজন তাদের ওপর চড়াও হন এবং মারধরের চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করতে হয়।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, ক্যাম্পাসের আশপাশসহ মাইজদী শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা তাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরমান হোসাইন জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভোর পাঁচটার দিকে তার বাসা থেকে একটি মোবাইল ফোন চুরি হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পাশাপাশি থাকা দুটি বহুতল ভবনের গ্রিল বেয়ে উঠে চোরেরা চারতলার একটি খোলা জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে ফোনটি নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ওই দিন বিকেলেই স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।
আরমানের সহপাঠী সজিব আহমেদ বলেন, গত ২ অক্টোবর বার্লিংটন মোড় এলাকায় একটি ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় স্থানীয়রা দুই যুবককে আটক করেন। খবর পেয়ে তারা সেখানে যান। আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে খোঁজ নেওয়ার পাশাপাশি আগে চুরি হওয়া মোবাইল ফোনটির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা জানাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য।
সজিবের অভিযোগ, মোবাইল ফোন চুরির বিষয়ে কথা বলতে চাইলে স্থানীয় কয়েকজন ও অভিযুক্তদের অভিভাবকেরা তাদের ওপর চড়াও হন। পরে পুলিশকে খবর দেওয়া হলে সদস্যরা ঘটনাস্থলে আসেন। তবে পুলিশের উপস্থিতিতেও পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তাদের ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং কয়েকজনের গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করা হয়।
একই বিভাগের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফখর উদ্দিন বলেন, ল্যাপটপ চুরির ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে জানতে গেলে স্থানীয়রা তাদের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। আগে করা জিডির সূত্র ধরে তারা পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। সেখানে তাদের সহপাঠী সালমান হোশমী ও সজিবের গায়ে হাত তোলা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ফখর উদ্দিনের ভাষ্য, পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠলে পুলিশ অতিরিক্ত সদস্য এনে তাদের নিরাপদে ঘটনাস্থল থেকে বের করে থানায় যেতে বলে।
নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের ঘটনা নতুন নয়। গত ২৯ জুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসটিই) বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের এক ছাত্রীকে বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন ঠক্কর এলাকায় রিকশাচালকের মাধ্যমে অপহরণের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই ছাত্রী চলন্ত রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন।
এর আগে, গত ১৫ জুন সমাজকর্ম বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সুমনকে অপহরণের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাকে অপহরণের পর মুক্তিপণ দাবি করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি রাত আটটার পর ক্যাম্পাস থেকে শহরে যাওয়ার পথে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইসিই) বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলামকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
এসব ঘটনার পর ক্যাম্পাসের বাইরের সড়ক, যাতায়াতব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের বসবাসের এলাকাগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী খাদিজাতুল কোবরা শেফা বলেন, দৈনন্দিন প্রয়োজনে প্রায় প্রতিদিনই তাকে মাইজদী শহরে যেতে হয়। অনেক সময় বাসায় ফিরতে রাত হয়ে যায়। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস পাওয়া যায় না।
শেফার অভিযোগ, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে। অর্থের জন্য তারা যে কাউকে আক্রমণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং (বিজিই) বিভাগের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান ইমনও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। টিউশনি করানোর জন্য তাকে মাইজদী শহরে যেতে হয়। অনেক সময় টিউশনি শেষ হতে দেরি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস মিস করেন। তখন স্থানীয় পরিবহনে ক্যাম্পাসে ফিরতে হয় তাকে।
ইমন বলেন, নোয়াখালীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা যেভাবে বাড়ছে, তাতে তিনিও নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ চান তিনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাইজদী শহরের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মাদক, ইভটিজিং, চুরি, ছিনতাই ও অপহরণসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। কোনো কোনো গোষ্ঠী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় পায় বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শহরের বিভিন্ন স্থাপনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দেয়ালে গোষ্ঠীগুলোর নাম লিখে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার ঘটনা ঘটছে। নোবিপ্রবির পকেট গেটসংলগ্ন এলাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা বাসেও গোষ্ঠীর নাম লেখার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহড়া দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা দমনে পুলিশের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে সুধারাম থানার পুলিশ সদস্য সুমন বণিক বলেন, এ ধরনের গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলমান রয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই তাদের সদস্যদের আটক করা হচ্ছে।
তিনি জানান, গত ৩০ সেপ্টেম্বর নোয়াখালীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের ১৬৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আটকের পর অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সঙ্গে কথা বলে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী আদালতেও পাঠানো হয়।
তবে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহ দেখাননি তিনি।
নোবিপ্রবির উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন। তাদের অনেকে ক্যাম্পাসের বাইরে মেস ও বাসাবাড়িতে থাকেন। তাই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ চুরি, ছিনতাই এবং হয়রানির ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে কারা রয়েছে এবং মাদক ও অপরাধী চক্রের সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখে জড়িত ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের টহল-নজরদারি বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে কিশোর গ্যাং দমনে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান।
উপ-উপাচার্য বলেন, নোয়াখালী এখন শুধু একটি জেলা শহর নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনের ঠিকানা। শিক্ষার্থীরা যেন নিরাপদে চলাচল ও বসবাস করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।
সব মিলিয়ে, ক্যাম্পাসের বাইরে চুরি, ছিনতাই, অপহরণ ও হয়রানির অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনাকর ঘটনাগুলো নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করে ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকাগুলোয় নিরাপত্তা জোরদার করুক। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।