রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে সে। এর আগে ১৭ জানুয়ারি রাতে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাসা থেকে ফারজানাকে উদ্ধার করে পুলিশ। ছোট বয়সে ফারজানাকে রাজধানীর ঐ বাসায় কাজে দিয়েছিলেন তার মা-বাবা।
মঙ্গলবার হাসপাতালের বিছানায় বসে হাঁপাতে হাঁপাতে ফারজানা বলেন, টয়লেটে ঢুকিয়ে হাত-পা বেঁধে মার দিত। মারের পর জখমে মরিচ লাগিয়ে দিত। দেয়ালে মাথা বাড়ি মারত। মারধরের সময় চিৎকার করলে বলতো- ‘চিৎকার করলে তোর মা-বাবাকে মেরে ফেলব।’ আমি আর কথা বলব না। আমি শুধু বিচার চাই। আমার সঙ্গে যা করেছে, তার জন্য শাস্তি চাই।
.png)
ফারজানা যখন কথা বলছিল, তখন তার শয্যার পাশে দাঁড়িয়ে এক তরুণ বলতে থাকেন, ফারজানার চুলকানি হয়েছে। তাই শরীরে দাগ হয়েছে। ফারজানার সিস্ট আছে, তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় তার শরীরের এই দশা হয়েছে।
আরো পড়ুন: নিজের করা মামলায় জামিন পেলেন না বাবুল আক্তার
এ সময় ফারজানা উত্তেজিত হয়ে বলেন, আপনি আমার জ্বালা কেমন বুঝবেন? মিথ্যা কথা বলেন কেন? এইগুলা চুলকানির দাগ? এইগুলা হলো মাইরের দাগ।
পরিচয় জানতে চাইলে ঐ তরুণ জানান, তিনি ফারজানা যে বাসায় কাজ করতো সেই পরিবারের পক্ষ থেকে ফারজানাকে চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহায়তা দিতে এসেছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
ফারজানার পাশে বসা মা জ্যোৎস্না বেগম বলেন, একই বাসায় ফারজানার ছোট বোন ও এক খালার মেয়ে থাকত। ফারজানার ছোট বোনের পায়ে আঘাতের চিহ্ন আছে। ফারজানা তিন হাজার টাকা বেতন পেত। তবে ওর ছোট বোন কোনো বেতন পেত না। ওই দুজনকেও বাসা থেকে নিয়ে আসা হয়েছে।
তিনি বলেন, এর আগে ফারজানাকে এক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। মেয়ে হাসপাতালে ভর্তি—এ কথা তাকে গোপন রাখতে বলা হয়েছিল। এতে তার মনে খটকা লাগে। তিনি তার স্বামী বিল্লাল হোসেনকে মেয়ের অবস্থার কথা জানান। পরে তারা থানায় গিয়ে মেয়েকে উদ্ধারের আবেদন জানান।
গত ২০ জানুয়ারি ঐ বাসার গৃহকর্ত্রী সামিয়া ইউসুফের (সুমি) বিরুদ্ধে কলাবাগান থানায় মামলা করেন ফারজানার বাবা বিল্লাল হোসেন। এই মামলায় সাধারণ আঘাত, গুরুতর আঘাত, হত্যার হুমকিসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়। আসামিকে গ্রেফতার করে র্যাব। পরে আসামিকে কারাগারে পাঠান আদালত।
তবে সোমবার সামিয়া ইউসুফের জামিন হয়েছে বলে জানান তার আইনজীবী মো. কাজল রশীদ বিশ্বাস।
তিনি দাবি করেন, ফারজানাকে মারধর করা হতো না। তার সিস্ট আছে। এই সিস্ট থেকেই তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়েছে। সে জন্য আগেও তার চিকিৎসা করা হয়েছে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ফারজানার চিকিৎসাসংক্রান্ত নথিপত্র দেখে বলেন, ফারজানা সারা শরীরে পানি এসেছে। ওর কিডনিতেও পানি জমেছে। ওষুধ দিয়ে শরীরের পানি বের করা হচ্ছে। ফারজানার টিউমার বা সিস্ট আছে। এ ছাড়া রক্তস্বল্পতা, প্রোটিনস্বল্পতাসহ নানান জটিলতা আছে। তার শরীরে ক্ষত বা দাগ আছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার চিকিৎসা চলছে।
আরো পড়ুন: ট্রেনে কাটা পড়ে প্রাণ গেল ভ্যানচালকের
মামলার তদন্ত করছেন কলাবাগান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শামীম হাজরা। তিনি বলেন, ১৭ জানুয়ারি মেয়েকে বাসায় আটকে রেখে মারধরের অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেন মা-বাবা। তারপর মেয়ের মা-বাবাসহ ফোর্স নিয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। তখন ফারজানা অসুস্থতার জন্য কথা বলতে পারছিল না। মেয়েটিকে উদ্ধার করে থানায় আনা হয়। থানার ওসি মেয়েটিকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দেন। সে রাতেই ফারজানাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করা হয়। পরদিন ওসিসি থেকে ফারজানাকে অন্য কোনো হাসপাতালে ভর্তি করতে বলা হয়। পরে তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আনা হয়। কিন্তু সিট না থাকায় তাকে ভর্তি করা যায়নি। তাকে কমফোর্ট হাসপাতালে নিলে তারা এ ধরনের রোগী ভর্তি করে না বলে জানায়। পরে আবার বাধ্য হয়ে তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আনা হয়। সিট ফাঁকা হলে তাকে ভর্তি করা হয়।
এসআই শামীম হাজরা বলেন, প্রথমে ফারজানার মা-বাবা এ ঘটনায় কোনো মামলা করতে চাননি। পরে মামলা করতে রাজি হন। মামলার আসামি গৃহকর্ত্রী সামিয়া ইউসুফকে র্যাব গ্রেফতার করে। ২১ জানুয়ারি আসামিকে আদালতে নেয়া হয়। তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত। গতকাল (সোমবার) তিনি জামিন পান।