ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ রাজধানী ]

চায়ের ‘ধোঁয়ায়’ নেশায় বুঁদ

মামুনুর রশীদ
প্রকাশিত: ১৯:৪৩, ২৮ অক্টোবর ২০২২
চায়ের ‘ধোঁয়ায়’ নেশায় বুঁদ
ফাইল ছবি

সুনসান নীরবতা। স্তব্ধ পুরো পথ। নেই কোনো আলো। ঘড়ির কাঁটায় রাত দেড়টা বাজলেও হেঁটে চলা। দূরপথে চোখে পড়ে ঝাপসা আলোর। মিনিট দুয়েক হাঁটতেই দেখা মেলে চায়ের দোকানের। দোকান ঘিরে উঠতি বয়সী কিছু তরুণ। আছেন শ্রমবেচা মানুষও। চা আর গরুর দুধের ধোঁয়া দেখে ইচ্ছে জাগে চুমুক দিতে। তবে ধোঁয়ায় ভেসে আসছে উৎকট গন্ধ।

দোকানিকে চায়ের কথা বলতেই হাতে ধরিয়ে দিলেন গাঁজাভরা সিগারেট। রীতিমতো অবাক হলেও অপরিচিত জায়গা আর গভীর রাত হওয়ায় চুপসে যাওয়া। নম্র ভাষায় ধূমপান না করার কথা বললেও দোকানি জানান দিলেন- ‘মামা ভয়ের কিছু নেই, সবকিছু আমাদের হাতেই। কেউ আসবে না, আপনি নিশ্চিন্তে টানেন। দেখতেই তো পাচ্ছেন সবাই কি সুখটান দিচ্ছে। গাঁজা না খেলে কী হয়’।

এসব কথা শুনে খোঁজ মেলে উৎকট সেই গন্ধের উৎস। গভীর রাতে চা বেচলেও দোকানির মূল পেশা মাদকের। ষাটের কাছাকাছি এ দোকানিই নয়, রাতভর রেলস্টেশন, বাসস্ট্যান্ড কিংবা অলিগলিতে চা বেচার নামে এভাবেই মাদক বিক্রি করছেন অনেকে। এমনকি কিছু কিছু ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রেতারাও জড়িত এমন পেশায়।

Advertisement

হাতে চায়ের ফ্লাস্ক আর প্লাস্টিকের বোয়ামে কিছু বিস্কুট থাকলেও কোমরে থাকে গাঁজা কিংবা ইয়াবা। ক্রেতাও থাকে নির্দিষ্ট। নীরবেই চলে বেচাকেনা। বেশভূষায় সাধারণ মনে হলেও অপরাধজগতে বিস্তর প্রভাব এসব বিক্রেতার। তবে অনেকেই সবকিছু হারিয়ে নিরুপায় হয়ে ফেরি করে বেচেন চা।

রাতের আঁধারে রাজধানীর গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে ফ্লাস্ক নিয়ে ঘোরাঘুরি করতে দেখা মেলে ১৫ বছর বয়সী কিশোরের। রাত গভীর হওয়ায় তেমন ক্রেতা নেই। দু-একজন এসে চায়ের অর্ডার করছেন। এর মধ্যেই তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় কাগজে মোড়ানো পোঁটলা। বিনিময়ে কিশোর বিক্রেতা পান কিছু টাকা।

কথা হয় ১৫ বছরের এ কিশোরের সঙ্গে। তিনি বলেন, পাঁচ সদস্যের পরিবার। বাবা থেকেও নেই। বস্তিতে থাকি। কোনো কাজ না থাকায় রাতে চা বিক্রি করি। আর এ আয় দিয়েই সংসারে জোগান দিতে হয়।

কাগজে মোড়ানো পোঁটলা নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই কিছুটা ভড়কে যান পাঁচ সদস্যের মুখে আহার জোগানো এ কিশোর। প্রথমে বলতে না চাইলেও ধীরে ধীরে মুখ খোলেন। এক সরদারের কথায় চা বেচার নামে রাতভর বাসস্ট্যান্ডে করেন গাঁজা বিক্রি। যা টাকা আসে এর তিন ভাগের দুই ভাগ দিতে হয় সরদারের হাতে। বাকি টাকায় চলে সংসার।

কমলাপুর রেলস্টেশনের কোলঘেঁষে গরম দুধ আর ডিম বিক্রি করছেন ৩৫ বছরের এক যুবক। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় ক্রেতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বারবারই কোমরে হাত রাখতে দেখা মেলে দুধ বিক্রেতার। কিছুক্ষণ পরপর দুধ-ডিম ছাড়াও কিছু ক্রেতাকে দেন বিশেষ কিছু; আর গুনে নেন মোটা অংকের টাকা। এর মধ্যেই ক্রেতা কিছুটা কমতেই হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে একজন এসে বললেন- ‘মামা, গুটি (ইয়াবাকে গুটি বলেই সম্বোধন করে সেবনকারীরা) লাগবে’।

গুটির কথা শুনেই দুধ বিক্রেতার মুখে ফুটেছে হাসি। কোমরে গুঁজিয়ে রাখা পোঁটলা বের করে গুনে গুনে পাঁচটি দেন আর বুঝে নেন টাকা। এমন দৃশ্য দেখে জানতে চাইলেই অস্বীকার করেন এ বিক্রেতা। যদিও শেষমেশ নিজেই সব খুলে বলেন।

লোক দেখানো দুধ-ডিম বেচলেও তার মূল পেশা ইয়াবার। দেশের বিভিন্ন মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার চুক্তি রয়েছে। মূলত প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিতেই ধরেন দুধের ব্যবসা। তবু দু-একবার ধরা পড়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। কদিন জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে ফের জড়িয়ে পড়েন এ পেশায়।

পোশাক কারখানায় কাজ করতেন ২৩ বছরের শিমুল (ছদ্মনাম)। অসুস্থতার কারণে এখন আর তেমন ভারী কাজ করতে পারেন না। বছর দুয়েক আগে বিয়েও করেছেন। সংসারে স্ত্রী ছাড়াও রয়েছেন মা আর ছোট বোন। চারজনের মুখে খাবার তুলতে হেঁটে হেঁটে চা-সিগারেট বিক্রি করেন। দিনে সর্বোচ্চ ২০০-৩০০ টাকা বিক্রি হয়। আর তা দিয়েই কোনোরকম সংসার চলে তার।

সততার কারণে কোনো খারাপ পথও বেছে নিতে পারছেন না এ যুবক। হেঁটে হেঁটে চা বেচতে কষ্ট হলেও পরিবারের সদস্যদের কথা ভেবে নিরুপায় হয়ে করছেন। কারো দয়া পেলে টঙের দোকান তোলার স্বপ্ন রয়েছে অসুস্থ এ চা বিক্রেতার।

জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার হাফিজ আল আসাদ বলেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে সামাজিক সচেতনতার বিকল্প নেই। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সমাজের সবাইকে এর কুফল ভালোভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

তিনি বলেন, শুধু পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এককভাবে মাদকদমন ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সামাজিকভাবে সবাইকে মাদককে না বলতে হবে এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!