বছরের ব্যবধানে বেড়েছে যক্ষ্মা রোগী
যক্ষ্মা। যার অপর নাম টিউবারকিউলোসিস বা টিবি। ‘মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস’ নামের ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট এ রোগটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের ফুসফুসকেই প্রভাবিত করে। একসময় ‘যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই’ বলা হলেও এখন বলা হয় চিকিৎসায় ‘যক্ষ্মা ভালো হয়’। তবে বিশ্বে মৃত্যুজনিত ১০টি রোগের মধ্যে এটি একটি। ২০১৮ সালে সারা বিশ্বে এ রোগে আক্রান্ত হন এক কোটি মানুষ। যার মধ্যে ১৫ লাখের মৃত্যু ঘটে।
প্রাণঘাতী এ রোগটি বাংলাদেশেও এখন বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে দিন দিন বেড়েই চলেছে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা।
চট্টগ্রামে যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২০ সাল ও ২০২১ সাল, এক বছরের ব্যবধানে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দুই তৃতীয়াংশ। একই সময়ে প্রাণহানি হয়েছে ২২৮ জনের।
.png)
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২১ সালে এক লাখ ২৫ হাজার ২৫৬ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২০ হাজার ৮৫৭ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। এর মধ্যে ১০ হাজার ৬১৪ জন ছিলেন পুরুষ ও ১০ হাজার ২৪৩ জন নারী। আগের বছর ২০২০ সালে যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ১১৬ জন। সে হিসাবে এক বছরে আক্রান্ত বাড়ে ছয় হাজার ৭৪১ জন। আর এ বাড়ার পেছনে মানুষের অসচেতনতা ও অবহেলাকেই দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, যক্ষ্মা একটি সংক্রামক রোগ। করোনাভাইরাসের মতো এটিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফুসফুসকে সংক্রমিত করে। তিন সপ্তাহ বা এর অধিক সময় কাশি হলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে।
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াছ চৌধুরী বলেন, যক্ষ্মা নিয়ে আমাদের প্রচার-প্রচারণার অব্যাহত রয়েছে। তারপরও সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে বেশি। সচেতন না হলে যক্ষ্মা প্রতিরোধ সম্ভব নয়। এছাড়া কোনোভাবেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ নেয়া উচিত নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, যক্ষ্মার প্রকোপ বেশি বিশ্বের এমন ৩০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ১৯৯৩ সালে পৃথিবীতে যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব বেড়ে গেলে এটিকে ‘গ্লোবাল ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দীর্ঘকাল ধরে অন্যতম প্রধান সংক্রামক রোগের স্থান দখল করে থাকা যক্ষ্মাতে প্রতিদিন বিশ্বে চার হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। আক্রান্ত হন ৩০ হাজার। বিশেষ করে দারিদ্র্য ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোতেই এটির প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
বর্তমানে সময়ে এসেও যক্ষ্মা নিয়ে কিছু ভ্রান্ত ধারণা রয়েছে মানুষের। এসব ধারণা দূর করে যক্ষ্মা প্রতিরোধে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
যক্ষ্মা শুধু ফুসফুসে নয়
অনেকের ধারণা- যক্ষ্মা শুধুমাত্র ফুসফুসেই দেখা দেয়। এক্ষেত্রে চিকিৎসকরা বলছেন, যক্ষ্মার জীবাণু ফুসফুস ছাড়াও ত্বক, অন্ত্র, লিভার, কিডনি, হাড়সহ শরীরের যেকোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সংক্রমণ হতে পারে। তবে ফুসফুসে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় এটিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফুসফুসের বাইরে হওয়া যক্ষ্মাকে ‘এক্সট্রাপালমোনারি টিউবারকিউলোসিস’ বলে।
যক্ষ্মা জেনেটিক রোগ নয়
কারো কারো মতে- যক্ষ্মা একটি জেনেটিক রোগ। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের ভাষ্য, যক্ষ্মা কোনো জেনেটিক রোগ নয়। এটির বিস্তারের সঙ্গে জিনের কোনো সম্পর্ক নেই। ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট এ রোগ যেকোনো মানুষের হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা।
ধূমপান না করলেও আছে যক্ষ্মার সম্ভাবনা
ধূমপান না করলে যক্ষ্মা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই- এমন ধারণা নিয়ে বসবাস করেন অনেকেই। এক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, ধূমপানই যক্ষ্মার একমাত্র কারণ নয়। অন্যান্য রোগ, যেমন- এইচআইভি, ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগও এর জন্য সমানভাবে দায়ী। এছাড়া ধূমপান শুধুমাত্র ফুসফুস নয়, মস্তিষ্ক, হাড়, মেরুদণ্ড ও চোখকেও প্রভাবিত করে।
যক্ষ্মার সংক্রমণ বোঝায় উপায়
চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরের কোনো অংশ যক্ষ্মার জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হলে সেই অংশটি ফুলে উঠবে। যেমন- গলার গ্লান্ড আক্রান্ত হলে গলা ফুলে যাবে, মেরুদণ্ডে আক্রান্ত হলে পুরো মেরুদণ্ড ফুলে উঠবে। তবে ফোলা অংশটি খুব শক্ত বা তরল জাতীয় হবে না। সেমি সলিড হবে। ফোলার আকার বেশি হলে ব্যথাও হতে পারে।
লিভারে যক্ষ্মা হলে পেটে পানি চলে আসে, ফলে পেট অস্বাভাবিক ফুলে যায়। মস্তিষ্কে সংক্রমিত হলে সেখানেও পানির মাত্রা বেড়ে যায়। অর্থাৎ মানুষের মস্তিষ্ক যে ইডিমা বা পানির মধ্যে থাকে, সেটার পরিমাণ বেড়ে যায়।
এছাড়া চামড়া বা অন্য কোনো অংশে হলেও সেটি ফুলে উঠবে। এর বাইরে ক্ষুধামন্দা, হঠাৎ শরীরের ওজন কমে যাওয়া, জ্বর জ্বর অনুভব হওয়া, অনেক ঘাম হওয়া ইত্যাদি যক্ষ্মার প্রাথমিক লক্ষণ।
চিকিৎসায় যক্ষ্মা ভালো হয়
যক্ষ্মা রোগের কোনো চিকিৎসা নেই- এখনো এমন ধারণা মনে পোষণ করেন অনেকেই। তবে ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল। যক্ষ্মার লক্ষণ কিংবা উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়ে চিকিৎসা নিলেই যক্ষ্মা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। যক্ষ্মা দীর্ঘমেয়াদি রোগ হওয়ায় এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ খেতে হয়। যেটা ছয় থেকে নয় মাস পর্যন্ত হয়ে থাকে।
বিসিজি টিকা
টিকাটির পুরো নাম ‘ব্যাকিলাস ক্যালমেট-গেরিন’। এ টিকা প্রধানত যক্ষ্মার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। যক্ষ্মার প্রাদুর্ভাব কমাতে শিশুদের জন্মের পর এটির একটি ডোজ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। তবে এইচআইভি কিংবা এইডস আক্রান্তদের শিশুদের জন্য এ টিকা প্রযোজ্য নয়।
১৮৮২ সালের ২৪ মার্চ ডা. রবার্ট কোচ যক্ষ্মার জীবাণু আবিষ্কার করেন। যার ফলে উন্মোচিত হয় যক্ষ্মার রোগনির্ণয় ও নিরাময়ের পথ। বিশ্বে মৃত্যুজনিত ১০টি রোগের মধ্যে যক্ষ্মা একটি। তাই যক্ষ্মার বিরুদ্ধে সচেতনতা ও প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।