স্ত্রীকে ‘মৎস্য ব্যবসায়ী’ সাজিয়েও হলো না সম্পদ রক্ষা
স্ত্রী চুমকি কারণকে ‘মৎস্য ব্যবসায়ী’ সাজিয়েও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে গড়া জমি, বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট কিছুই রক্ষা করতে পারেননি প্রদীপ কুমার দাশ। এসব সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করেছে আদালত।
বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মুন্সী আবদুল মজিদ এ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে চার কোটি টাকা জরিমানার পাশাপাশি প্রদীপকে ২০ বছর ও তার স্ত্রী চুমকিকে ২১ বছরের কারাদণ্ড দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, নগরের কোতোয়ালি থানার পাথরঘাটার ‘লক্ষ্মীকুঞ্জ’ নামে ভবনটির ষষ্ঠ তলার ওপরের দুটি কক্ষ, পাঁচলাইশ থানার পশ্চিম ষোলশহর মৌজায় অবস্থিত এক কোটি ৩৯ লাখ ৯২ হাজার ৬০০ টাকার জমি ও সেমিপাকা ঘর, কক্সবাজারের ঝিলংজা মৌজায় একটি ফ্ল্যাট, ২২ লাখ ৮২ হাজার টাকা মূল্যের দুটি মাইক্রোবাস রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দিয়েছে আদালত।
দুদকের আইনজীবী মাহমুদুল হক মাহমুদ বলেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে স্ত্রীর নামে একাধিক স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গড়েছেন প্রদীপ কুমার দাশ। স্ত্রীর নিজস্ব কোনো আয়ের উৎস না থাকা সত্ত্বেও নিজের উপার্জন বৈধ করার কৌশল হিসাবে স্ত্রীকে মৎস্য ব্যবসায়ী ও কমিশন ব্যবসায়ী পরিচয়ে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন তিনি।
মাহমুদুল হক আরো বলেন, দুদকের তদন্ত ও সাক্ষ্যে এসব দুর্নীতির বিষয় উঠে এসেছে। আদালত সবকিছু বিচার বিশ্লেষণ করে বলেছেন- আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে এ অপরাধ করেছেন। তাই আদালত তাদের শাস্তি দিয়েছেন। রায়ে আমরা সন্তুষ্ট। এখন সেটি কার্যকর চাই।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের সহকারী পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন জানান, পেশায় গৃহিণী চুমকি কমিশন ব্যবসায়ী হিসেবে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে প্রথম আয়কর রিটার্ন প্রদান করেন। এরপর থেকে মাছের ব্যবসা ও বাড়িভাড়া থেকে আয় দেখিয়ে রিটার্ন দাখিল করে আসছেন। ২০১৩-১৪ বছরে ১১ লাখ ২০ হাজার ও পরের অর্থবছরে তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা মূলধন দেখান তিনি। কিন্তু দুদকের তদন্তে কমিশন ব্যবসার কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। এছাড়া কমিশন ব্যবসার লাইসেন্স, ব্যাংক লেনদেনের প্রমাণ ও সরকারি কর্মকর্তার স্ত্রী হিসাবে ব্যবসা করার যথাযথ অনুমোদন দেখাতে পারেননি তিনি।
তিনি আরো জানান, সম্পদ বিবরণীতে মাছের ব্যবসা থেকে দেড় কোটি টাকা আয় দেখান চুমকি। এক্ষেত্রে ২০০২ সালে ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকায় বোয়ালখালী উপজেলার সারোয়াতলী ইউনিয়নের উত্তর সারোয়াতলী গ্রামে পাঁচটি পুকুর ইজারা বরাদ্দ নেয়ার কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু দুদকের তদন্তে উঠে আসে- চুমকি পেশায় গৃহিণী। তার স্বামী প্রদীপ কুমার দাশ ১৯৯৫ সালে এসআই হিসেবে পুলিশে যোগ দেন। ২০০২ সালে তাদের ১৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা সঞ্চিত অর্থ ছিল না। ২০০২ সাল থেকে মাছের ব্যবসার মাধ্যমে আয়ের কথা বলা হলেও আয়কর রিটার্নে সেটি উল্লেখ করেননি তিনি। এতে স্পষ্ট হয় যে- মাছের ব্যবসা থেকে দেড় কোটি টাকা আয়ের বিষয়টি সঠিক নয়। স্বামী প্রদীপের দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থে গড়া সম্পদ স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের উদ্দেশ্যে নিজেকে মৎস্য ব্যবসায়ী সাজান চুমকি।
গত ১৮ জুলাই চট্টগ্রাম বিভাগীয় বিশেষ জজ মুন্সী আবদুল মজিদের আদালতে এ মামলায় দুদকপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। এরপর ২৭ জুলাই রায় ঘোষণার দিন ধার্য করে আদালত।
২০২০ সালের ২৩ আগস্ট মামলাটি করেন দুদক কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন। পরে গত বছরের ২৬ জুলাই আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে তাদের বিরুদ্ধে তিন কোটি ৯৫ লাখ পাঁচ হাজার ৬৩৫ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়।
একই বছরের ১ সেপ্টেম্বর অভিযোগপত্রের ওপর শুনানি হয়। ২০ সেপ্টেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিনের করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মামলার এজাহারে উল্লিখিত সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেয় আদালত। ১৫ ডিসেম্বর এ মামলায় তাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হয়।