ঢাকা,  মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

মর্গে কেটেছে ৪০ বছর, এখন নিজেই ‘জীবন্ত লাশ’

নাটোর প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৫:৪৫, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২২
মর্গে কেটেছে ৪০ বছর, এখন নিজেই ‘জীবন্ত লাশ’
আবুল হাশেম

টানা ৪০ বছর লাশ টেনেছেন নিজের ভ্যানে করে। বয়স সত্তরের কাছে গেলেও থেমে থাকেননি। ধীরে ধীরে হলেও চলেছেন নিজ গতিতে। এর মধ্যেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় একটি সড়ক দুর্ঘটনা। সড়কে পা হারিয়ে থমকে গেছে পুরো জীবন। দীর্ঘ বছর মর্গে লাশ আনা-নেয়া করলেও নিজের কষ্টে পাশে নেই কেউ।

বলছি নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার কচুয়া কারিগরপাড়া গ্রামের হাশেম প্রামাণিকের কথা। লাশ টানার কাজে দীর্ঘদিন থাকায় পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘লাশ টানা হাশেম’ নামে। হাশেমের বাবার নাম আবু বক্কর প্রামাণিক।

কচুয়া কারিগরপাড়া গ্রামে হাশেমের বাড়িতে যান এ প্রতিবেদক। বাড়িতে যেতেই চোখে পড়ে হাশেমের কষ্টের চিত্র। বারান্দায় ভাঙা পা নিয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন তিনি।

Advertisement

জানা গেছে, চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি প্রতিবেশী এক ভাতিজার মেয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিলেন হাশেম। ওই ভাতিজারও ভ্যানগাড়ি রয়েছে। তাই তিনি হাশেমের ভ্যান চালাচ্ছিলেন। আর ভ্যানের ডান পাশে বসেছিলেন হাশেম। মালঞ্চি বাজার পার হওয়ার সময় বিপরীত থেকে ইঞ্জিনচালিত একটি ভ্যান তাকে ধাক্কা দেয়। ওই সময় গাড়ির সামনের দুটি রড নাটসহ তার পায়ের মাংসের ভেতর চলে যায়। হঠাৎ ধাক্কায় ভ্যানটি উল্টে গেলে ভেঙে যায় তার পায়ের হাড়।

স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে প্রথমে তাকে রাজশাহী ও পরে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে পর পর দুবার অস্ত্রোপচার করতে তার ১৮ কাঠা জমি ও বাড়িতে পালন করা দুটি গরুর বাছুর বিক্রি করতে হয়েছে। এখন তার ৩ কাঠা জমি রয়েছে। ২০ দিন পর তার আরো একটি অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা রয়েছে। অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা, সংসারের খরচের পাশাপাশি অস্ত্রোপচারের টাকা জোগাড় কীভাবে হবে ভেবেই দিশেহারা ৪০ বছর ধরে লাশ টানা এ হাশেম।

হাশেম বলেন, অনেক লাশের গায়ে পচাগলা, পোকামাকড় থাকলে কেউ সামনে যেতেন না। এমনকি কবর থেকেও মাঝে-মধ্যে লাশ তুলতে হয়েছে। দুর্গন্ধের কারণে আত্মীয়-স্বজনও লাশের কাছে যেতেন না। কিন্তু আমরা লাশটা কোলে তুলে নিতাম। পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আবার দাফন করা হতো। তবু অবহেলায় রয়ে গেলাম আমি।

তিনি বলেন, ২৫ বছর বয়সে বিয়ে করি। বিয়ের আগে স্থানীয় বিভিন্ন চায়ের দোকানে খড়ি সরবরাহ করতাম। বিয়ের পর দাদার কাছ থেকে টাকা নিয়ে একটি ভ্যান কিনি। বিয়ের ১৪ দিন পর থেকেই বড়াইগ্রাম আর বাগাতিপাড়া থানা পুলিশের ডাকে লাশ বহনের কাজ শুরু করি। দুর্ঘটনার পর দুই ছেলে কিছু সহযোগিতা করেছে। এছাড়া দুই থানা থেকেও পাঠিয়েছিল সামান্য কিছু টাকা।

তিনি আরো বলেন, আমার সংসারে দুই ছেলে আর তিন মেয়ে রয়েছে। সবারই বিয়ে হয়েছে। দুই ছেলেও ভ্যান চালায়। তাদের সংসার আলাদা। স্ত্রীর এক চোখ অপারেশনের পর অনেক দিন থেকেই অসুস্থ।

হাশেম বলেন, ৪০ বছর লাশ টেনেই জীবন চালিয়েছি। আর এখন নিজেই জীবন্ত লাশ হয়ে জীবনযাপন করছি। অপারেশন ছাড়াও প্রতিদিন ৭০০-৮০০ টাকার ওষুধ লাগে।

এ অবস্থায় চিকিৎসার খরচ জোগাড় করতে পুলিশ, প্রশাসনসহ সমাজের হৃদয়বান ও বিত্তবানদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন হাশেম। হাশেমকে সাহায্য করতে ০১৭১০-৬১১৩০৪, ছেলে শুকুরের ০১৭৪৬-৮৬১৩৬৪ (বিকাশ পার্সোনাল) নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন।

বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু সিদ্দিক বলেন, হাশেমকে তাৎক্ষণিক কিছু সহযোগিতা করা হয়েছে। এখন লাশ টানা কাজ করছেন তার ছেলে শুকুর।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!