ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

প্রবাসে নির্মম নির্যাতন, সেই ভিডিও দেখিয়ে মাদারীপুরে মুক্তিপণ আদায়

বেলাল রিজভী, মাদারীপুর
প্রকাশিত: ১৮:৪৪, ৩০ ডিসেম্বর ২০২২
প্রবাসে নির্মম নির্যাতন, সেই ভিডিও দেখিয়ে মাদারীপুরে মুক্তিপণ আদায়
ছবিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা -ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে ইউরোপের দেশ ইতালি নেয়ার কথা বলে প্রথমে নেয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানেই আটকে রেখে চালানো হয় অমানবিক নির্যাতন। কখনো কখনো সেই নির্যাতনের ভিডিও করে পাঠানো হয় স্বজনদের কাছে। আবার কখনো ভিডিও কলে দেখানো হয় সেই নির্মম নির্যাতন।

এ নির্যাতন চালানো হয় মুক্তিপণের টাকা আদায়ের জন্য। মাদারীপুরে কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠেছে।

মানবপাচারের শিকার একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে রোমহর্ষক তথ্য। চক্রটি প্রথমে অল্প খরচে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার প্রস্তাব দেয়। এরপর লিবিয়া নেয়ার পর তাদের লিবিয়ার দুর্গম কোনো স্থানে আটকে রাখা হয়। চালানো হয় শারীরিক নির্যাতন। সেই নির্যাতনের ভিডিও চিত্র ধারণ করে পাঠানো হয় স্বজনদের কাছে। আবার কখনো কখনো ভিডিও কলে স্বজনদের দেখানো হয় নির্যাতনের ভয়ঙ্কর চিত্র।

Advertisement

জানা যায়, মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতনের মূলহোতা মাফিয়া শরীফ। মাদারীপুর সদর উপজেলার শিরখাড়া ইউনিয়নের নতুন মাঠ গ্রামের সাকা মাতুব্বরের মেয়ে সুমিকে বিয়ে করেন শরীফ। সুমিসহ একাধিক দালাল মাদারীপুর থেকে লোক সংগ্রহ করে লিবিয়াতে পাঠাতেন। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পরই চালানো হয় নির্যাতন। লিবিয়াতে যারা নির্যাতন করেন তাদের একজন আজিজুল ইসলাম নির্ঝর।

জানা যায়, নির্যাতন চালানো আজিজুল হক নির্ঝর মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের চরনাচনা গ্রামের আবুল কালাম হাওলাদারের ছেলে। তিনি লিবিয়ার পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর জোয়ারা ক্যাম্পের মাফিয়া শরীফ হোসেনের সহযোগী। তার দায়িত্ব ছিল বন্দিশালার বন্দিদের নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায় করা।

মাদারীপুর সদর উপজেলার হোসনাবাদ গ্রামের রাকিব ফরাজী নামে এক ভুক্তভোগী বলেন, শরীফের ক্যাম্পের আমি বন্দি ছিলাম। ক্যাম্পে থাকার দুই মাসের মধ্যে নির্ঝরের নির্যাতনের শিকার হয়ে দুইটি ছেলে মারা গিয়েছে। আমাকে মারতে মারতে অজ্ঞান বানিয়ে ফেলেছিল। জ্ঞান ফেরার পর আবারো মেরেছে। মারার ফলে আমার চোখের মধ্যে রক্ত জমাট বেঁধে গিয়েছিল।

নির্যাতনের শিকার আরেক ভুক্তভোগী মাদারীপুরের ডাসার উপজেলার গোপালপুর গ্রামের বনি আমিন। তাকে ক্যাম্পে আটকে রেখে মুক্তিপণের জন্য কয়েক দফায় নির্যাতন চালানো হয়। পরে শরীফের স্ত্রী সুমি এজেন্ট ব্যাংকিং নম্বরে ২০ লাখ টাকা দিলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

মুন্সীগঞ্জ জেলার মোল্লাকান্দি গ্রামের সেলিম শেখের ছেলে জাহাঙ্গীর শেখকেও নির্যাতন করা হয়। লিবিয়ার মাফিয়া শরীফের বন্দিশালায় থাকাকালীন আজিজুল হক নির্ঝরের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হন তিনি। ২০২১ সালের ১৬ নভেম্বর কাজের সন্ধানে গিয়েছিলেন লিবিয়ায়। সেখানে গিয়ে মাফিয়ার খপ্পরে পড়ে বন্দিশালায় এমন বিভীষিকাময় জীবন কেটেছে তার। পরে টাকার বিনিময়ে লিবিয়ার বন্দিশালা থেকে মুক্ত হয়ে হাইতেম নামের এক দালালের মাধ্যমে ২০২২ সালের ৬ এপ্রিল পৌঁছেছেন ইতালিতে। দীর্ঘদিন ইতালির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর শেখ বলেন, নির্ঝর এতটাই নির্দয় যে, তিনি কাউকেই ছাড়তেন না। বাবা-চাচার বয়সী লোকজনকেও টাকার জন্য প্রচুর মারধর করতেন। গলায় পাড়া দিয়ে, দাড়ি টেনে কাঠের লাঠি দিয়ে পিটিয়ে নির্যাতন চালাতেন। বন্দিশালার বিভিন্ন জায়গায় রক্ত লেগে ছিল। আমাকে করা নির্যাতন দেখে বাবা স্ট্রোক করে মারা গিয়েছেন। পরিবারের লোকজন আমার কাছে বাবার মৃত্যুর খবর গোপন রেখেছিলেন। পরে ইতালি গিয়ে আরেক জনের কাছ থেকে জানতে পেরেছি।

সম্প্রতি বাংলাদেশে নিজ বাড়িতে ফিরেছেন অভিযুক্ত আজিজুল হক নির্ঝর। মুক্তিপণের দাবিতে নির্যাতনের ব্যাপারে তিনি বলেন, আমি নিজেও কাজের সন্ধানে লিবিয়া গিয়েছিলাম। আমাকে ইতালি যাওয়ার পথে মাফিয়ারা বন্দি করে শরীফের ক্যাম্পে নিয়ে যান। ক্যাম্পের বন্দিরা সবাই অনেক কান্নাকাটি আর চেঁচামেচি করতেন। আমি ভাষা জানতাম বলে শরীফ আমাকে ক্যাম্পের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সবাইকে চুপচাপ রাখার। ঐ সময় অনেককেই গালাগালি করেছি। এ জন্য হয়তো ক্ষুব্ধ হয়ে আমার নামে অভিযোগ দিতে পারেন। আমি কারো কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করিনি। টাকা পয়সার ব্যাপারে আমি কিছু জানতাম না। আমি শুনেছি সেখানে সাড়ে আট লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা করে নেয়া হয়। আমি কারো কাছ থেকে কোনো টাকা পয়সা নেইনি। আমি শুধু সবাইকে চুপচাপ রাখার জন্য শাসন করেছি। আমি ক্যাম্পে ভালো সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য এ দায়িত্ব পালন করেছি।

এ বিষয়ে জানতে লিবিয়াতে অবস্থানরত মাফিয়া শরীফের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিক বার ফোন দিলেও রিসিভ করেননি। এসএমএস করলেও জবাব দেননি। তার স্ত্রী সুমি আক্তার এবং তার পরিবার কয়েক মাস ধরে এলাকা ছাড়া। তাদেরকেও বাড়িতে গিয়ে পাওয়া যায়নি।

মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখবো। মানবপাচার রোধে আমরা বদ্ধপরিকর। মানুষকে কোথাও আটকে রেখে জিম্মি করে টাকা পয়সা নেয়া মেনে নেয়া যায়না। তাই আমরা আইনের মধ্যে থেকেই মানবপাচারকারীদের গ্রেফতারের ব্যবস্থা করছি। অনেককে আমরা গ্রেফতারও করেছি। আর সব অভিভাবকদের উদ্দেশে বলব, তারা যেন অবৈধ পথে তাদের সন্তানকে বিদেশ পাঠিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেন।

ডেইলি-বাংলাদেশ/আরএম
ট্যাগ: মাদারীপুর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!