ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

খেজুরের রসের পিঠাপুলি যেন সোনার হরিণ

শাকের মোহাম্মদ রাসেল, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশিত: ১৫:১৫, ৮ জানুয়ারি ২০২৩
খেজুরের রসের পিঠাপুলি যেন সোনার হরিণ
শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছের রস আহরণ করছেন গাছি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

লক্ষ্মীপুরের গ্রামাঞ্চলের সেই চিত্র এখন আর চোখে পড়ে না। এখন আর আগের মতো খেজুরের রসও নেই, নেই সে পিঠা পায়েসও। দিন দিন কমে যাচ্ছে খেজুর গাছের সংখ্যাও। গ্রামের পর গ্রামে এক সময় খেজুর গাছ দেখা গেলেও সেটি অনেকটাই সোনার হরিণে পরিণত হয়েছে। 

৫-৭ গ্রাম খুঁজে পাওয়া যায় দু্ই একটা খেজুর গাছ। তবে বিচ্ছিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাঝে মধ্যে দেখা যায়। শীতের সকালে কয়েক বছর আগেও চোখে পড়তো রসের হাড়ি ও খেজুর গাছ কাটার সরঞ্জামসহ গাছির ব্যস্ততার দৃশ্য। সকাল হলেই খেজুরের রস নিয়ে গাছিরা বাড়ি বাড়ি হাঁকডাক দিতেন। শীতের মৌসুম শুরু থেকেই বাড়ি বাড়ি চলতো খেজুরের রস। 

ছোটবেলায় বাপ দাদারা খেজুর রস সংগ্রহ করে পরিবারের লোকজনদের দাওয়াত করে খাওয়াতো। সে সময় এখন আর দেখা যায় না। শুধু তাই-নয় রসের পাটালি গুড় দিয়ে মজাদার পিঠাপুলির আয়োজন হতো। গ্রামবাংলার এ দৃশ্য এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। এর প্রধান কারণ খেজুর গাছ নিধন। এতে দিনে দিনে লক্ষ্মীপুরে কমছে খেজুরের গাছ। আগের মত খেজুরের রস ও গুড় পাওয়া যায় না। পেলেও আগের চেয়ে ১০ গুণ বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়। মূলত ইটের ভাটায় ব্যাপকভাবে খেজুর গাছ ব্যবহার করায় এ গাছ কমে গেছে।

Advertisement

শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছের রস আহরণ করছেন গাছি।  

খেজুর গাছ সস্তা হওয়ায় ইটের ভাটায় এই গাছই বেশি পোড়ানো হয়। এছাড়া অনেক সময় ঘরবাড়ি নির্মাণ করার জন্য খেজুরের গাছ কেটে ফেলা হয়। ফলে দিন দিন খেজুর গাছ কমে যাচ্ছে।

তবে যুগ যুগ ধরে পেশায় নিয়োজিত যারা তারা এখনো ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। গ্রাম গঞ্জে দুই একটা গাছের সন্ধান নিয়ে সেগুলো পরিচর্যাসহ বছর বছর গাছ কেটে রস সংগ্রহ করে থাকেন। কখনো নিজের গাছ আবার কখনো অন্যের গাছ। প্রতিদিন বিকেলে গাছ কেটে হাড়ি বসানো হয়। পরের দিন ভোর বেলায় সেই হাড়ি নামিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয় রস। যদিও রসের চাহিদা যথেষ্ঠ থাকে। পূর্বের অর্থ পরিশোধিত ব্যক্তিরাই আগ পায়। অর্থাৎ, আগের দিন রসের টাকা পরিশোধ করে থাকেন যিনি পরের দিন ওই রস পান তিনি। এভাবে রসের চাহিদা মিটায় স্থানীয়রা।

শীত মৌসুমে লক্ষ্মীপুরের বিভিন্ন গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছের রস আহরণ এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। তুলনামূলকভাবে লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন গ্রাম-গঞ্জে খেজুর গাছ অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। গ্রামের মাঠে আর মেঠোপথের ধারে কিছু গাছ দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ করা হয় না।

শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছের রস আহরণ করছেন গাছি।

সদর উপজেলার টুমচর গ্রামের দেলোয়ার হোসেন, সোহাগ, মাহফুজুর রহমান মাহফুজসহ একাধিক লোক বলেন, কাঁচা রসের পায়েস খাওয়ার কথা এখনো ভুলতে পারি না। আমাদের পরের প্রজন্মরা তো পুলি-পায়েস খেতে পায় না। তাই যে কয়টি খেজুর গাছ আছে তা থেকেই রস, গুড়, পিঠাপুলির আয়োজন করা হয়।

তারা জানান, গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এক সময় খেজুর রস প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেতো। এখন গাছ যেমন কমে গেছে তেমনি কমে গেছে গাছির সংখ্যাও। ফলে প্রকৃতিগত সুস্বাদু সে রস এখন আর তেমন নেই। 

গাছি আব্দুর রহিম জানান, খেজুরের গাছ কমে যাওয়ায় তাদের চাহিদাও কমে গেছে। আগে এই কাজ করে ভালোভাবেই সংসার চালাতেন। এমনকি আগে যে আয় রোজগার হতো তাতে সঞ্চয়ও থাকতো, যা দিয়ে বছরের আরো কয়েক মাস সংসারের খরচ চলতো। সদরের দত্তপাড়া ইউপির শ্রীরামপুর গ্রামে চোখে পড়েছে বেশ কয়েকটি খেজুর গাছ। 

শীত মৌসুমে গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছের রস আহরণ করছেন গাছি।

স্থানীয় আব্দুল্যাহ মিয়া গাছে উঠে গাছ কেটে রসের হাড়ি বসানোর দৃশ্যটাও চোখে পড়েছে। এছাড়া সদরের টুমচর গ্রামে যে কয়েকটা খেজুর গাছ আছে তা বুড়ো হয়ে যাওয়ায় রস তেমন পাওয়া যায় না। রস বাজারে বিক্রির মতো আগের সেই অবস্থা নেই।

আব্দুল্যাহ মিয়া জানান, এইতো কয়েক বছর আগে এক হাড়ি খেজুর রস বিক্রি করতাম ২০-৫০ টাকা। এখন খেজুর গাছ না থাকায় সে রসের দাম বেড়ে হয়েছে ৩শ থেকে ৪শ টাকা। রসের প্রচুর পরিমাণে সংকট রয়েছে। আমরা যারা শহরের বসবাস করছি তারা তো এখন আর খেজুর রস খেতেই পারেনা। গত বৃহস্পতিবার গন্ধব্যপুর গ্রাম থেকে ৮শ টাকা করে প্রতি হাড়ি রস কিনে এনেছি। কিন্তু তাতেও সঠিক রস পাওয়া যায়নি। 

পরিবেশবিদরা বলছন,  স্থানীয় ইটভাটায় খেজুর কেটে ব্যবহারের ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এসব গাছ। ফলে আগের মতো সেই রস পাওয়া যায় না। 
 
 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!