ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ট্রলারে ১০ লাশ: জবানবন্দিতে রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন আসামি

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৪:৫৬, ৩ মে ২০২৩
ট্রলারে ১০ লাশ: জবানবন্দিতে রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন আসামি
ফাইল ফটো

কক্সবাজারের নাজিরারটেকে ডুবন্ত ট্রলারে অর্ধগলিত ১০ জনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় করা মামলায় গ্রেফতার আরেক আসামি কামাল হোসেন ওরফে বাইট্যা কামাল আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে কামাল জানান, ঘটনার সময় তিনি কক্সবাজার শহরে ছিলেন। তবে ট্রলারের মাঝিমাল্লাদের সঙ্গে তার কয়েক দফার কথায় নিশ্চিত হয়েছেন, ১০ জনের ট্রলারটি সাগরে ডাকাতি করতে নেমেছিল। একপর্যায়ে কয়েকটি ট্রলারের জেলেরা ১০ জেলেকে প্রথমে গণপিটুনি দেন। এরপর গুম করার জন্য লাশগুলো বরফ রাখার কক্ষে আটকে রেখে সেই ট্রলারটি সাগরে ডুবিয়ে দেয়।

গত সোমবার সন্ধ্যায় কামালের জবানবন্দি রেকর্ড করেন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আখতার জাবেদ। এর আগে দুই আসামি আবু তৈয়ুব ও ফজল কাদের আদালতে জবানবন্দি দেন। তারা বলেছেন, ঘটনাটি তাদের চোখের সামনে ঘটেছে, তবে তারা জড়িত ছিলেন না। ওই দুই মাঝির জবানবন্দি রেকর্ড করেন কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্রীজ্ঞান তঞ্চঙ্গ্যা। 

তিন আসামির স্বেচ্ছায় জবানবন্দি প্রদানের কথা নিশ্চিত করলেও তারা (আসামি) আদালতে কী বলেছেন তা  বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তদন্তকারী কর্মকর্তা কক্সবাজার সদর থানার পরিদর্শক দুর্জয় বিশ্বাস। তবে তিনি বলেছেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি এবং ট্রলার মালিক বাইট্টা কামাল জবানবন্দিতে ঘটনায় জড়িত অন্তত ২০ জনের নাম প্রকাশ করেছেন।

Advertisement

পুলিশ জানায়, জবানবন্দিতে কামাল হোসেন জানান, তার মাছধরার ট্রলারের ব্যবসা আছে। বর্তমানে একটি ভাসা জালের ট্রলার আছে। ৯ এপ্রিল সন্ধ্যায় তিনি জানতে পারেন সমুদ্রে তার ভাই আনোয়ারের (মামলার পলাতক আসামি) ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। এরপর মাতারবাড়ীর আবদুল গফুর, সাগরে থাকা দুই ট্রলারের জেলে বেলাল ও আক্কাসের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলে নিশ্চিত হন আনোয়ারের ট্রলারে ডাকাতি হয়েছে। ১০ এপ্রিল সকালে আক্কাসের সঙ্গে তার দ্বিতীয় দফায় আরো ১৫ মিনিট কথা হয়। তখন আক্কাস ঘটনার বিস্তারিত তাকে তুলে ধরেন। আক্কাস তখন ঘটনাস্থলে ট্রলারে ছিলেন।

কামাল হোসেন জবানবন্দিতে বলেছেন, ৯ এপ্রিল রাত সাড়ে ৩টার দিকে আনোয়ারের ট্রলার সাগরে জাল ফেলে। হঠাৎ এই ট্রলারের (আনোয়ারের) পাশে ভেড়ে আরেকটি ছোট ট্রলার। তখন আনোয়ারের ট্রলারের জেলে ফোরকান টর্চলাইট মেরে কাছে ভেড়ার কারণ জানতে চান। কিছু বুঝতে না দিয়ে ছোট ট্রলারের (ডাকাতদের বোট) লোকজন দা, কিরিচ, রড ও বন্দুক নিয়ে আনোয়ারের ট্রলারে উঠে পড়ে এবং আনোয়ারের ট্রলারের জেলেদের এলোপাতাড়ি মারতে থাকে। একপর্যায়ে কায়সার ও জয়নাল মাঝি ছাড়া অবশিষ্ট জেলেদের জাল রাখার কক্ষে ঢুকিয়ে রাখে। এরপর ডাকাতরা কায়সারকে (আনোয়ারের ট্রলারের চালক) ট্রলারের ইঞ্জিন চালু করতে বাধ্য করে। জয়নাল মাঝিকে ট্রলার চালাতে বাধ্য করে ডাকাতরা। 

ট্রলারটি পূর্ব-উত্তরে কিছুদূর যাওয়ার পর ডাকাতরা জয়নাল ও কায়সারকে রেখে ট্রলারের অবশিষ্ট জেলেদের সাগরে ফেলে দেয়। তারপর ডাকাতরা আনোয়ারের ট্রলার অন্য একটি ট্রলারের সঙ্গে ভেড়াতে বলে। এতে দেরি হওয়ায় ওই ট্রলারটি দ্রুত সরে পড়ে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ডাকাতরা জয়নাল ও কায়সারকেও মারধর করে সাগরে নিক্ষেপ করে। এ সময় আনোয়ারের ট্রলারে ডাকাত ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। 

এরপর ডাকাতরা আনোয়ারের ট্রলারের সঙ্গে তাদের (ডাকাতদের) ছোট ট্রলারটি বেঁধে উত্তর-পূর্ব দিকে যাচ্ছিল। তখন সামনে পড়ে আফসার মাঝি ও বাবুল মাঝির দুই ট্রলার। দুই মাঝি আনোয়ারের ট্রলার চিনতে পেরে কাছে ভেড়ানোর চেষ্টা করে। এতে বাধা দেয় ডাকাতরা। সন্দেহ হলে আনোয়ারের ট্রলারের জেলে জয়নাল, কায়সার ও মালিক আনোয়ারকে নাম ধরে ডাকতে থাকেন তারা। এতেও সাড়াশব্দ না পেলে আফসার ও বাবুল মাঝির সন্দেহ হয়। এরপর বাবুল মাঝি তাদের ট্রলারটি ভেড়ানোর চেষ্টা করলে ডাকাতরা গুলি ছুড়তে থাকে। উপায় না দেখে বাবুল মাঝি ও আফসার মাঝি বাঁশের মাথায় কাপড় বেঁধে ট্রলারে তুলে দেয়। এটি এক ধরনের বিপদ সংকেত। 

সেই সংকেত দেখানোর ২০-৩০ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় ১০-১২টি ট্রলার। ট্রলারগুলো ডাকাতদের ট্রলারটি চারদিক থেকে ঘিরে ফেললে ডাকাতরা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে থাকে। অবস্থা বেগতিক দেখে একপর্যায়ে ডাকাতরা আনোয়ারের ট্রলারের বাঁধা নিজেদের ছোট ট্রলারটি রশি কেটে দিয়ে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর আনোয়ারের ট্রলার নিয়ে ডাকাতরা পালাতে থাকে। তখন অন্যান্য ট্রলারের জেলেরা ডাকাতদের ধাওয়া করে। একপর্যায়ে ডাকাতদের ট্রলারের জ্বালানি তেল শেষ হয়ে যায়। 

চট্টগ্রামের বাঁশখালী ও কুতুবদিয়ার দুটি ট্রলার দুই পাশ থেকে ঘিরে ডাকাতদের ট্রলারটি আটকায় এবং ডাকাতদের হাত-পা রশি দিয়ে বেঁধে ফেলে। এরপর বাঁশখালী ও কুতুবদিয়ার দুটি ট্রলারের সঙ্গে বাবুল মাঝি, আফসার মাঝি, আমান উল্লাহ ও আনোয়ারের ট্রলারের জেলেরা (সাগরে নিক্ষেপের পর অন্য ট্রলার কর্তৃক উদ্ধার) ডাকাতদের চারদিক ঘিরে ধরে বাঁশ, বরফ ভাঙার মুগুর, লাকড়ি দিয়ে গণপিটুনি দেন। এই পিটুনিতে ডাকাতদের মৃত্যু হয়। এরপর আফসার মাঝি, বাবুল মাঝি, আমান উল্লাহ মাঝি, আনোয়ার মাঝি ও অন্যান্য ট্রলারের জেলেরা (অন্তত ৬০ জন) সাগরে ভাসমান ডাকাতদের ছোট ট্রলারটি খুঁজে নেন। তারপর ডাকাতদের লাশগুলো ছোট ট্রলারের মাছ রাখার কক্ষে ঢুকিয়ে ঢাকনা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেন। পরে লাশ গুম করার উদ্দেশ্যে ট্রলারটি সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। 

প্রসঙ্গত গত ২৩ এপ্রিল গুরা মিয়া নামে এক ব্যক্তির মালিকানাধীন একটি ট্রলার সাগরে ভাসমান থাকা নামবিহীন ট্রলারটিকে নাজিরারটেক উপকূলে নিয়ে আসে। ওই ট্রলারের হিমঘর থেকে হাত-পা বাঁধা ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে উদ্ধার হওয়া ছয়জনের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করলেও মর্গে রয়ে গেছে চারজনের মরদেহ ও একটি কঙ্কাল। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!