তারা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশন ও এর আশপাশ এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে পথশিশুরা ড্যান্ডি সেবন করে আসছেন। পথশিশুদের মাঝে দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে এ মরণব্যাধি নেশা। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন যদি সঠিক ভাবে দেখবাল করেন তাহলে তারা মরণ ব্যাধি এ নেশা থেকে মুক্ত হয়ে সুস্থ সুন্দর জীবনে ফিরে আসতে পারে। এ জন্য তারা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনসহ সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, এই স্টেশন এলাকায় অনেক অসহায় হতদরিদ্র পথশিশু রয়েছে। এদের মধ্যে অনেকেই কুড়িয়ে পাওয়াা প্লাস্টিক, লোহা কিংবা পুরনো জিনিস সংগ্রহসহ বিভিন্ন ছোটখাট পেশায় কাজ করছেন। আবার কেউ কেউ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গেও যুক্ত, আবার কেউ কেউ ঘুরে বেড়ায় খেয়াল খুশি মতো যত্রতত্র।
.png)
একাধিক পথশিশু জানায়, কুড়িয়ে পাওয়াা প্লাস্টিক, লোহা কিংবা পুরনো জিনিস বিক্রিসহ নানা কাজ করছেন। ওই সব কাজ করে যে টাকা আয় করছে তাদের মধ্যে অনেকেই ড্যান্ডি সেবক করছেন। যে বয়সে ওদের বই খাতা হাতে নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা। অথচ এরাই এখন সবচেয়ে বিপথগামী শিশু। মরণ নেশা ড্যান্ডিতে আসক্ত হয়ে তারা এখন নিশ্চিত অন্ধকারের পথে চলে যাচ্ছে।
নেশার এই উপকরণটির নাম ড্যানড্রাইট অ্যাডহেসিভ বা ড্যান্ড্রাইট আঠা, তবে ‘ড্যান্ডি’ নামেই বেশি পরিচিত।
সেবনকারীরা জানায়, ড্যান্ডি সেবন করলে তাদের কাছে খুব ভালো লাগে। সময় সুযোগ ও টাকার ওপর নির্ভর করে তারা ডান্ডি সেবন করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিভিন্ন রং এর দোকান থেকে এক ধরণের সল্যুশন ক্রয় করছে। এ সল্যুশন সাধারণত চামড়া জাতীয় দ্রব্য ও ফোম জাতীয় দ্রব্যে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। সচরাচর এ সল্যুশনকে জুতা তৈরির গাম বলা হয়। ওই সল্যুশন বা জুতা তৈরির গাম জাতীয় আঠালো পদার্থ একটি পলিথিনে ভরে, কিছুক্ষণ ঝাঁকিয়ে নাক ও মুখের সাহায্যে তারা শ্বাস নিচ্ছেন। এতেই এক ধরণের নেশা তৈরি হয়। এভাবেই দিনের পর দিন পথশিশুরা ক্রমশ আসক্ত হয়ে পড়েছে। যাদের প্রায় সবাই থাকেন স্টেশনের আশপাশে এলাকায়। দিন-রাত নেশায় বুঁদ হয়ে এসব পথশিশু-কিশোররা জড়িয়ে পড়ছে চুরিসহ নানা অপরাধে।
এদিকে রেলওয়ে জংশন স্টেশন এলাকায় দেখা যায়, কিছু পথশিশু বসে ঝিমুচ্ছে আর পলিথিন দিয়ে কি যেন করছে। তোমরা এখানে কি করছ এই কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে চলে যায় অন্যত্র। তাদের কেউ কেউ যঠপণ ‘ড্যান্ডি বানাইয়া খাই। এটি খাইলে মনের দুঃখ থাকে না। ক্ষুধাও লাগে না।’
রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় পথশিশু সেতু জানায়, তার বাবা নেই মা আছে। বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে। সন্ধ্যা হলে স্টেশন এলাকায় চলে আসে। সে ময়লা আবর্জনা থেকে প্লাস্টিক লোহা কুড়িয়ে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করছেন। এতে তার দৈনিক ৮০-১শ টাকা আয় হয়। প্রায় সময় অন্য ছেলেদের সঙ্গে বসে ড্যান্ডি সেবন করছে বলে জানায়।
পথশিশু অপু জানায়, তার মায়ের সঙ্গে আগে ভৈরব রেলওয়ে স্টেশনে থাকতো। গত ২ মাস ধরে আখাউড়ায় স্টেশন এলাকায় থাকছেন। তার মা ভিক্ষা করেন। মাঝে মধ্যে টুকটাক কাজ করেন। তার সাথের ছেলেরা সবাই আঠা খায়, তাই ওদের দেখাদেখি সেও আঠা খায়। সে আরো বলে- এখানে শিশুরা ঝটলা বেধে বসে থাকলে পুলিশ তাদেরকে বকাঝকা করে তাড়িয়ে দেয়।
আখাউড়া মানবধিকারকর্মী সাথী আক্তার বলেন, পথশিশুদের নিয়ে কাজ শুরুর পর থেকেই দেখেছি স্টেশন এলাকায় অনেক পথশিশু ড্যান্ডিসহ অন্যান্য নেশায় আসক্ত হচ্ছে। চোখের সামনে শিশুরা এভাবে মরণ নেশায় আসক্ত হচ্ছে তা দুঃখজনক। তাদেরকে কীভাবে নেশা থেকে ফেরানো যায় এ বিষয়ে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে এগিয়ে আসা উচিত।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হিমেল খান বলেন, ড্যান্ডি নেশার প্রবণতা পথশিশুদের মধ্যেই বেশি। কারণ এ মাদক গ্রহণ করলে সাধারণত ক্ষুধামান্দা তৈরি হয়। মূলত খাবারের অভাবের কারণেই ছিন্নমূল এসব পথশিশু ড্যান্ডি নেশায় আসক্ত হয়। এ অবস্থা থেকে তাদের বের করে এনে একটি সুস্থ-সুন্দর জীবন দেওয়া আমাদের দায়িত্ব।
আখাউড়া রেলওয়ে থানার ওসি আব্দুল আলিম শিকদার বলেন, শিশু অধিকার আইনে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ খুবই কঠিন। এ বিষয়ে সর্বপ্রথম জনসচেতনতা বাড়ানো দরকার। আমরা চাই এসব নিষ্পাপ কোমলমতি শিশুরা সমাজের অন্যসব শিশুর মতো তারাও যেন পড়াশোনা করে সুস্থ-সুন্দর জীবনে ফিরে আসতে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের পাশে সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।