ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

সৌন্দর্যের নিদর্শন করটিয়া জমিদার বাড়ি

আরিফ টগর, টাঙ্গাইল
প্রকাশিত: ১০:০৬, ২৯ মে ২০২৩
সৌন্দর্যের নিদর্শন করটিয়া জমিদার বাড়ি
করটিয়া জমিদার বাড়ি

সৌন্দর্যের নিদর্শন টাঙ্গাইল সদর উপজেলার করটিয়া জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়িতে রয়েছে লোহার ঘর, রোকেয়া মহল, রাণীর পুকুরঘাট, ছোট তরফ দাউদ মহল এবং বাড়িসংলগ্ন মোগল স্থাপত্যের আদলে গড়া মসজিদ একটি ঐতিহাসিক স্থাপত্য।

ঐতিহ্যবাহী করটিয়া জমিদার বাড়িটি টাঙ্গাইল জেলার অন্তর্ভুক্ত করটিয়া ইউনিয়নে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক জমিদার বাড়ি। টাঙ্গাইল শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে করটিয়া নামক স্থানে অবস্থিত। আতিয়ার চাঁদ খ্যাত জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী করটিয়া জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা।

করটিয়া জমিদার বাড়িটি প্রাকৃতিক এবং নিরিবিলি পরিবেশের এই জমিদার বাড়িটি প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ০.৫ কিলোমিটার প্রস্থ বিশিষ্ট প্রাচীরঘেরা। মোগল ও চৈনিক স্থাপত্যের মিশেলে নির্মিত জমিদার বাড়িটি প্রথম দর্শনেই আপনার মন কেড়ে নেবে। সীমানা প্রাচীরের ভেতরে অবস্থিত মোগল স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন রোকেয়া মহল; যা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মর্যাদা পাওয়ার দাবিদার। বর্তমানে লাইট হাউজ বিদ্যালয় ও কোচিং সেন্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

Advertisement

করটিয়া জমিদার বাড়ির দক্ষিণে অবস্থিত এই মসজিদটি প্রায় ১৪০ বছরের পুরনো মসজিদ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিভিন্ন সময়ে সমপ্রসারিত এই মসজিদটি ৩টি অংশে বিভক্ত। প্রথম অংশ ৩ গুম্বজ বিশিষ্ট ছিল। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে ৫টি গম্বুজ। তৃতীয় অংশে কোন গম্বুজ নেই। মসজিদের উপরে উত্তরে এবং দক্ষিণে রয়েছে ৪টি করে ছোট গম্বুজ। ১৮৭১ সালে হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদের সামনে রয়েছে ত্রিকোণ বিশিষ্ট মিনার।

মিনারের দুপাশে সিড়ি। মসজিদের মূল অংশে ৫টি দরজা। দ্বিতীয় অংশে উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে দরজা এবং তৃতীয় অংশের পূর্ব দিকে রয়েছে পাঁচটি দরজা। ভেতরে প্রাচীন আমলের তিনটি ঝুলন্ত ঝাড় এবং একটি সিন্দুক। প্রবেশ পথ বরাবর দেয়ালে তিনটি মেহরাব যেগুলোর কারুকাজগুলি সকলেরই দৃষ্টি কাড়ে।

‘আটিয়ার চাঁদ’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, আফগান অধিপতি সোলায়মান খান পন্নী কররানির ছেলে বায়েজিদ খান পন্নী ভারতে আগমন করেন। তার পুত্র সাঈদ খান পন্নী আটিয়ায় বসতি স্থাপন এবং ১৬০৮ খ্রি. সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে আটিয়ার বিখ্যাত মসজিদ নির্মাণ করেন। এই বংশেরই ১১তম পুরুষ সাদত আলী খান পন্নী টাঙ্গাইলের করটিয়ায় এসে পন্নী বংশের ভিত প্রতিষ্ঠা করেন।

উনিশ শতকের প্রথম দিকে সাদত আলী খান পন্নী সম্পত্তির মালিকানা নিয়ে নানা মামলায় জড়িয়ে পড়েন। ঢাকার জমিদার খাজা আলীমুল্লাহর সহায়তায় তিনি পৈত্রিক সম্পত্তি উদ্ধার করেন, কিন্তু শর্ত ভঙ্গের কারণে পাল্টা মামলা করে খাজা আলিমুল্লাহ ভোগ-স্বত্বের ডিক্রি লাভ করেন। তখন সাদত আলী খান সম্পত্তি রক্ষার জন্য স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানমের নামে তা দানপত্র করে দেন।

করটিয়া মসজিদ

পরে অবশ্য উভয় পক্ষের মধ্যে আপোষ মীমাংসা হয়। সাদত আলী খান সম্পত্তির ৭ আনা অংশ খাজা আলিমুল্লাহকে ছেড়ে দেন। অতঃপর বাংলা ১২২৭ সনের ৯ পৌষ সাদত আলী খান এবং তার স্ত্রী জমরুদুন্নেসা খানম যৌথভাবে একটি দলিল করেন। এতে সমস্ত সম্পত্তি দুটি ভাগে বিভক্ত করে এক ভাগ পরিবারের ব্যয় ও অন্য ভাগ ওয়াকফ্ করে ধর্মীয় ও দাতব্য কাজে ব্যয় করার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়। ওয়াকফ্ সম্পত্তি দেখাশুনা করার জন্য মুতাওয়াল্লী নিয়োগের বিধান রাখা হয়।

সাদত আলী খান পন্নীর মৃত্যুর পর তার পুত্র হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী মুতাওয়াল্লী ছিলেন। মাহমুদ আলী খান পন্নীর মৃত্যুর (১৮৯৬) পর মুতাওয়াল্লী কে হবেন এ নিয়ে তার পুত্র ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া) এবং পিতামহী জমরুদুন্নেসা খানমের মধ্যে বিবাদ ও মামলা মোকদ্দমা সংঘটিত হয়। পরিশেষে ওয়াজেদ আলী খান পন্নী জয়ী হন এবং দক্ষতার সঙ্গে জমিদারি পরিচালনা করেন।

পন্নী পরিবারের ১৩তম পুরুষ দানবীর জমিদার আটিয়ার চাঁদ হিসেবে খ্যাত ওয়াজেদ আলী খান পন্নী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার কারণে ১৯২১ সালের ১৭ ডিসেম্বর কারা অবরুদ্ধ হন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তার অনমনীয় মনোভাব ও দৃঢ় ব্যক্তিত্বের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শনস্বরূপ আজও লন্ডন মিউজিয়ামে সংরক্ষিত ওয়াজেদ আলী খান পন্নীর তৈলচিত্রের নিচে লেখা রয়েছে ‘ওয়ান হু ডিফাইড দি ব্রিটিশ।’

১৯২২ সালে জেল থেকে মুক্ত হয়ে তিনি সমাজ ও শিক্ষা সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন এবং বাংলার আলীগড় নামে খ্যাত ১৯২৬ সালে করটিয়ায় সাদত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজের পাশাপাশি তিনি স্থাপন করেন রোকেয়া সিনিয়র মাদরাসা, এইচএম ইনস্টিটিউশন (স্কুল অ্যান্ড কলেজ) এবং দাতব্য চিকিৎসালয়সহ জনকল্যাণকর বহু প্রতিষ্ঠান। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল প্রকার ব্যয় নির্বাহের অভিপ্রায়ে তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি, বসতবাড়িসহ এলাহীর উদ্দেশে ১৯২৬ সালের ৯ এপ্রিল এক ওয়াকফ্ দলিলের সৃষ্টি করেন।

করটিয়া জমিদার বাড়ির কেয়ারটেকার আব্দুল লতিফ জানান, স্কুল আর কোচিং ভাড়ার টাকায় রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে জমিদার বাড়ির। বর্তমানে এই জমিদার বাড়ির মালিক ওয়াজিদ আলী খান পন্নী বলেও জানান তিনি।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!