তবে পুলিশ জানিয়েছে, আত্মহত্যার প্ররোচনার দায়ে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন পলাতক থাকায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
নিহতের বড় বোন সাহিদা বেগম জানান, মুকসুদপুর উপজেলার চরভাটরা গ্রামে জমি জমা নিয়ে মৃত মুখলেছ চোকদারের পরিবারের সঙ্গে সানজিদার বাবা মো. ইলিয়াছ শেখের বিরোধ ছিল। পরে এই বিরোধ মেটানোর জন্য সানজিদার সঙ্গে মৃত মুখলেছ চোকদারের পরিবার ছাব্বির চোকদারের (২৩) বিয়ের প্রস্তাব দেন। পরবর্তীতে গত ২০২৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর সানজিদার সঙ্গে ছাব্বির চোকদারের বিয়ে হয়।
.png)
এরপর থেকে সানজিদার ওপর নেমে আসে নির্যাতন। বিভিন্ন সময় যৌতুকের জন্য সানজিদার ওপর নির্যাতন চালাতেন স্বামী ছাব্বির চোকদার ও তার পরিবারে সদস্যরা। এর জের ধরে ২০২৩ সালের ২০ এপ্রিল সানজিদা আত্মহত্যা করেছেন এমন খবর এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে সানজিদার পরিবারের কাউকে না জানিয়ে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে সানজিদাকে ডাক্তার মৃত ঘোষণা করলে শ্বশুরবাড়ির লোকজন মরদেহ ফেলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যান। পরে পরিবারের লোকজন খবর পেয়ে হাসপাতালে গিয়ে সানজিদার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠালে সানজিদা আত্মহত্যা করেছেন বলে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট দেয়।
তিনি আরও জানান, ময়নাতদন্তের রিপোর্ট নিয়ে আমাদের সন্দেহ রয়েছে। আমার বোন কখনই আত্মহত্যা করতে পারে না। এমনকি পুলিশ একজন আসামিকেও গ্রেফতার করতে পারেনি। পুলিশ আসামিদের গ্রেফতার করতে পারলে আমার বোনের মৃত্যুর আসল কারণ বেরিয়ে আসবে।
এ ব্যাপারে অভিযুক্তদের বক্তব্য নিতে সানজিদার শ্বশুড়বাড়িতে গেলে ঘর তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। এমনকি সানজিদার স্বামী ছাব্বির চোকদারের ব্যবহৃত মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। তারা কোথায় গেছেন সে বিষয়ে কিছুই বলতে পারেনি এলাকাবাসী। তবে এলাকাবাসী ধারণা করছে, সানজিদার স্বামী বিদেশে পালিয়ে গেছেন।
সানজিদার ভাই সাইফুল ইসলাম টুটুল বলেন, বিয়ের পর থেকে আমার বোনের ওপর বিভিন্ন সময় নির্যাতন চালানো হতো। বিষয়টি আমি জেনে গোপালগঞ্জ নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতে একটি মামলা দায়ের করি। ময়নাতদন্তে আমার বোন আত্মহত্যা করেছেন বলে রিপোর্ট দেয়। আমি মনে করি এ রিপোর্ট ভুল।
সানজিদার বাবা মো. ইলিয়াছ শেখ বলেন, আমার মতো কোনো বাবা যেন তার মেয়েকে না হারায়। আমার মেয়েকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু তদন্ত শেষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
সানজিদার মা হেনোরা বেগম বলেন, আমার মেয়ে গোপালগঞ্জ শহরের লাল মিয়া সিটি কলেজে পড়াশোনা করতো। বাড়ির পাশে থাকবে, সব সময় দেখতে পারবো বলে বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আমার মেয়েকে ওরা দূরে পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন আর আমার মেয়েকে দেখতে পাই না। আমার মেয়ের লাশ গোপালগঞ্জ না নিয়ে ওরা মাদারীপুর গেছে। ময়নাতদন্ত গোপালগঞ্জ না হয়ে মাদারীপুরে হয়েছে। আমি আমার মেয়েকে হত্যার বিচার চাই।
এলাকাবাসী নাসিমা বেগম বলেন, সানজিদা আত্মহত্যা করতে পারে না। সানজিদার মতো ভালো মেয়ে হয় না। বিয়ের পর তার ওপর নির্যাতন চলতো। সানজিদাকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিয়েছে। এমনকি সানজিদার বাবার বাড়ির লোকজন লুটপাট করেছে এমন অভিযোগও মিথ্যা।
এলাকাবাসী সোহানা বেগম বলেন, সানজিদা অনেক ভালো মেয়ে ছিল। সবার সঙ্গে মিশতো, হাসি খুশি থাকতো। কিন্তু বিয়ের পর থেকে সানজিদাকে বাইরে বের হতে দিতো না। এমনকি সানজিদার পরিবারের ওপর লুটপাটের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা মিথ্যা। আমরা সানজিদা হত্যার বিচার চাই।
এ ব্যাপারে সিন্দিয়াঘাট পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক জালাল উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তবে পলাতক থাকায় আসামিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি ডাক্তারদের বিষয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পুলিশ দেয়নি।