ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

হোপ হসপিটাল বন্ধ, বিপাকে অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গারা

কক্সবাজার প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ২১:৩৬, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩
হোপ হসপিটাল বন্ধ, বিপাকে অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গারা
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

কক্সবাজারের উখিয়ার মধুরছড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ১০০ শয্যা হোপ হসপিটালের কার্যক্রম সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই বন্ধ। এতে বিপাকে পড়েছেন উখিয়ার ১০টির বেশি ক্যাম্পের অন্তঃসত্ত্বা রোহিঙ্গারা। বেকার হয়ে পড়েছেন হাসপাতালের ৩ শতাধিক কর্মী। বেতনও বকেয়া রয়েছে অনেকের।

হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, ভেতরে চিকিৎসকের অপেক্ষায় বসে আছেন কয়েকজন অন্তঃসত্ত্বা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নারীদের ভরসার জায়গায় পরিণত হয়েছিল হোপ হসপিটাল। কিন্তু হঠাৎ তাদের এমন কার্যক্রম মেনে নিতে পারছে না রোহিঙ্গা নারীরা।

লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা রোকেয়া বলেন, আমি ৭ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। শুরু থেকেই এখানে চিকিৎসা নিচ্ছিলাম। হঠাৎ হাসপাতাল বন্ধ হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছি। এ অবস্থায় আমার ৮০ কিলোমিটার দূরে কক্সবাজার শহরের হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।

Advertisement

রোহিঙ্গা নেতা কামাল উদ্দিন বলেন, মধুরছড়া ক্যাম্পে প্রায় ৭৫ হাজার রোহিঙ্গার বসবাস। আশপাশের আরো ১০টি ক্যাম্পে আছে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা। যেখানে অন্তঃসত্ত্বা আছে ৩৩ হাজারের বেশি। ৯০ শতাংশ অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতির চিকিৎসা চলে হোপ হসপিটালে। কিন্তু হঠাৎ হাসপাতালের সেবা বন্ধ হওয়ায় বিপাকে পড়েছে তারা।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিপাকে হসপিটালের ৩ শতাধিক নারী ও পুরুষকর্মী
উখিয়ার রত্নাপালং হোপ বার্থ সেন্টারে মাসিক ১৭ হাজার টাকায় পাঁচ বছর ধরে মিডওয়াইফ সহকারী হিসেবে চাকরি করেন স্থানীয় জোৎস্না আকতার। চাকরির টাকায় চলতো দুই সন্তানের লেখাপড়া ও সংসারের খরচ। জোৎস্না আকতার বলেন, ১ সেপ্টেম্বর থেকে হসপিটাল বন্ধ হলেও তিনি জুলাই-আগস্ট মাসের বেতন পাননি। দ্রুত আরেকটি চাকরি না জুটলে সংসারে দুর্যোগ নেমে আসবে।

চাকরি হারিয়ে আন্দোলনে নামা স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের মুখপাত্র মইন উদ্দিন শাহীন বলেন, আমরা অন্তত ৩০০ মানুষ ৪-৬ বছর ধরে হোপ ফাউন্ডেশনের অধীনে চাকরি করছিলাম। কিন্তু জুলাই ও আগস্ট মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধ না করে হঠাৎ কর্মচারীদের ছাঁটই করে হোপ কর্তৃপক্ষ। এর প্রতিবাদে আমরা আন্দোলন করেছি। পরে হোপ কর্তৃপক্ষ আমাদের লিখিতভাবে জানিয়েছে, তারা ১৫ অক্টোবরের মধ্যে দুই মাসের বেতন পরিশোধ করবে।

হসপিটালের তত্ত্বাবধায়ক ও হোপ ফাউন্ডেশনের ঊর্ধ্বতন ব্যবস্থাপক শওকত আলী বলেন, ইউএনএফপিএ অর্থ-সহায়তা বন্ধ করায় হসপিটালে অন্তঃসত্ত্বাদের চিকিৎসা বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সেবা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে অন্তঃসত্ত্বা, মানসিক রোগী, কিশোরীদের স্বাস্থ্যসহায়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় হসপিটালের ১৮২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারিয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসক ২৬ জন, নার্স ২৪ জন, মিডওয়াইফ ১৯ জন, মেডিকেল সহকারী ৯ জন। বাকিরা তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী।

ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

বিনামূল্যে সেবা নিয়েছে প্রায় ৫ লাখ মানুষ
হসপিটাল কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, গত ছয় বছরে হোপ হসপিটালে সেবা নিয়েছেন ৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৭০ জন। এর মধ্যে সন্তান প্রসবসংক্রান্ত সেবা নিয়েছেন ৭ হাজার ৫২৮ জন। স্বাভাবিক সন্তান প্রসব হয়েছে ৮ হাজার ৬৩টি এবং অস্ত্রোপচার হয়েছে ৩ হাজার ৪৬৫টি। এছাড়া ৬০ হাজার ৯১৯টি শিশু ও নবজাতক; ২১ হাজার ৮১৩ নারীকে প্রসবকালীন এবং ৮ হাজার ৩৮১ জনকে প্রসব-পরবর্তী সেবা দেওয়া হয়েছে। সব সেবাই বিনামূল্যে দেওয়া হয়।

কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. বিপাশ খীসা বলেন, রোহিঙ্গাদের জরুরি মাতৃস্বাস্থ্য সেবার জন্য হোপ হসপিটাল ভূমিকা রেখে আসছিল। ঝুঁকিপুর্ণ অন্তঃসত্ত্বাদের স্বাভাবিক ও সিজারিয়ান ডেলিভারির নির্ভরযোগ্য হসপিটাল ছিল এটি। বিভিন্ন হসপিটাল ও ক্লিনিক থেকে গুরুতর অবস্থায় গর্ভবতীদের এ হসপিটালে পাঠানো হতো। রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি উখিয়া-টেকনাফের স্থানীয়রাও এ হসপিটালে সেবা পেয়ে আসছে। কিন্তু গত ১ আগস্ট থেকে ইউএনএফপিএ আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দিলে হসপিটালে সংকট দেখা দেয়।

চুক্তির মেয়াদ শেষ, বকেয়া পরিশোধ অক্টোবরের মধ্যে
এ বিষয়ে বাংলাদেশে ইউএনএফপিএ’র প্রতিনিধি ক্রিস্টিন ব্লোখাস বলেন, ইউএনএফপিএ হোপ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে রোহিঙ্গা শিবির এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাঝে কাজ করছিল। সম্প্রতি হোপ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে। ইউএনএফপিএ’র অনেক অংশীদার কক্সবাজারে নারী ও কন্যা শিশুদের সেবায় কাজ করছে। সেখানে সেবাদানে যেন কোনো ঘাটতি না হয় সেজন্য আমরা ঐসব অংশীদারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছি।

হোপ ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মো. জাহিদুজ্জামান বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে ১০০ শয্যার হোপ ফিল্ড হসপিটাল এবং উখিয়া ও টেকনাফের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো ছয় বছর ধরে ইউএনএফপিএর অর্থায়নে পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু ১৯ জুলাই ইউএনএফপিএর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা হোপ ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী নয়। ১ আগস্ট থেকে ইউএনএফপিএ অর্থ সহায়তা বন্ধ করে দেয়। এতে বিপাকে পড়েন প্রকল্পের অধীনস্থ ৩০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী। পরবর্তীতে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) মধ্যস্থতায় ইউএনএফপিএ জুলাই ও আগস্ট মাসের অর্থ-সহায়তা দিতে সম্মত হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জুলাই মাসের বেতন ৩০ সেপ্টেম্বর এবং আগস্ট মাসের বেতন ১৫ অক্টোবর পরিশোধ করা হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!