গাজীপুর মহানগরের গাছার কলম্বিয়া এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকতেন রাসেল। রাসেল নিহত হওয়ার আগে তার সঙ্গে ছিলেন একই প্রতিষ্ঠানের কর্মী মো. সুফিয়ান। তিনি বলেন, কারখানায় তিনি ও রাসেল একই পদে চাকরি করতেন। তাদের কারখানায় কোনো আন্দোলন হয়নি। কিন্তু অন্য কারখানায় আন্দোলনের কারণে মালিকপক্ষ তাদের দ্রুত ছুটি দিয়ে দেয়। তারা কারখানা থেকে বাসায় যাওয়ার পথে এক সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে রাসেল আহত হন।
এ সময় রাসেল ‘মা’ ও ‘বাবা’ বলে চিৎকার করে অচেতন হয়ে পড়েন। তিনি রাসেলকে টঙ্গী হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু পথেই তার মৃত্যু হয়। সর্বশেষ সঙ্গি সুফিয়ান বলেন, রাসেল খুব শান্ত ও পরিশ্রমী ছিলেন। কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে টাকা জমাতেন। আমার কাছে বলতেন, ১৩ হাজার টাকা বেতনের এই টাকা দিয়ে কবে বাড়িতে ঘর তুলতে পারব। মাঝে মাঝে আমার কাছ থেকেও টাকা ধার নিতেন।
.png)
জানা গেছে, রাসেল (২৪) ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া বাইপাস এলাকার এনার্জিপ্যাক ডিজাইন গার্মেন্টসের ইলেকট্রিক মিস্ত্রি ছিলেন। তার বাড়ি ঝালকাঠি সদর উপজেলার বিনয়কাঠি ইউনিয়নের বালকদিয়া গ্রামে। সেখানে থাকে তার পরিবার। পুত্রহারা শোকে মূর্ছা যেতে যেতে বাবা বলেন, ‘আমার সোনার ছেলে পৃথিবী থেকে চলে গেছে। আমি এখন কাকে নিয়ে আশায় বুক বাঁধব। কার সঙ্গে কী বলব, বলেই বা কী হবে।’ এভাবেই বলছিলেন আর বিলাপ করছিলেন নিহত পোশাক শ্রমিক রাসেল হাওলাদারের বাবা হান্নান হাওলাদার।
বুধবার রাসেলের গ্রামের বাড়িতে গেলে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। উঠতি বয়সী যুবক রাসেলের মৃত্যুতে যেন এলাকাব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে।
রাসেলের পিতা হান্নান হাওলাদার কাঠ বিক্রির ছোট ব্যবসা করেন। সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। রাসেল বড়। ছোট ছেলে নাইম হাওলাদার দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। নিজেদের বাড়ির বাগানে তৈরি করা কবরেই রাসলেকে চিরতরে শুইয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এইচএসসি পাস করার পর টাকার অভাবে রাসেলের আর পড়াশোনা হয়নি। তাই কাজ পেয়ে ঢাকায় চলে যান। তার পাঠানো টাকায় তিন বছর আগে একই গ্রামে নিজেদের জমিতে ঘর তৈরির কাজ শুরু করে পরিবারটি। রাসেলের বাবা সেই নির্মাণাধীন ঘর দেখিয়ে বলছিলেন, এই ঘর আর হবে কিনা, জানি না। সংসারের অভিভাবক ছিল রাসেল। আমার সচ্ছলতা থাকলে ওকে আমি চাকরি করতে দিতাম না। ছেলে নিরপরাধ হয়েও মারা গেল। আমি এর বিচার চাই।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে রাসেলের বাবা আরও বলেন, ওর (ছোট ছেলে নাইম) পড়াশোনা ও সংসারের খরচ বহন করত রাসেল। কত টাকা বেতন পায়, কোনোদিন জানতে চাইনি। আমার সঙ্গে শেষ কথা হয় ২৯ অক্টোবর রাতে।
রাসেলের মা রাশিদা বেগম বলেন, আমাকে বাবায় বলছে; মা, আমি ডিসেম্বরে আসব। তোমার জন্য কী আনব জানাবা। আমি বলছি- তুমি সহিসালামতে ফিরে আসো। এইডাই আমি চাই আল্লাহর কাছে।
একমাত্র বোন মিম আক্তারের সব সময় খোঁজ নিতেন রাসেল। সেই কথা বলে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছে মিম। সে বলে, আর ভাই আমাকে ফোন করবে না।
মাসিক বেতন ন্যূনতম ২৩ হাজার টাকা করার দাবিতে এক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন করছেন পোশাক শ্রমিকরা। সোমবার সকালেও বিক্ষোভ শুরু করেন তারা। সন্ধ্যার দিকে এক সংঘর্ষে গাজীপুর মহানগরের ভোগড়া বাইপাস, কোনাবাড়ী, মালেকের বাড়ি, চান্দনা চৌরাস্তা, বোর্ডবাজারসহ ১০টি এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। মালেকের বাড়ি এলাকায় এক সংঘর্ষে আহত হন রাসেল। মঙ্গলবার রাত সোয়া ৮টার দিকে বালকদিয়া গ্রামের বাড়ির পারিবারিক গোরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়।