স্থানীয় প্রবীণ ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ‘ধুলাউড়ি গণহত্যা’ ছিল একটি প্রতিশোধমূলক হিংস্র গণহত্যা। ১৯৭১ সালের ১৪ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা সাঁথিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থিত রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালায়। রাত ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত চলে যুদ্ধ। মুক্তিযোদ্ধারা রাজাকারদের কমান্ডার আব্দুস সামাদ ফকিরসহ নয়জনকে হত্যা করেন। লুট করা হয় প্রচুর অস্ত্র সামগ্রীও। রাজাকার ও তাদের দোসররা এই পরাজয়ের তীব্র প্রতিশোধ নেয়ার প্রস্তুতি নেয়।
২৭ নভেম্বর মোক্ষম সুযোগটি রাজাকারদের হাতে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে ঐদিনই গ্রামটিতে অবস্থান নেয়। রাজাকাররা এ খবর পাক হানাদার বাহিনীর কাছে পৌঁছে দেয়। ২৭ নভেম্বর রাতে কৃষ্ণপক্ষের গাঢ় অন্ধকারে পাকিস্তানি সেনারা সাঁথিয়া, আতাইকুলা ও ফরিদপুর থেকে তিনটি পথে রাত প্রায় ২টার দিকে গ্রামটি ঘিরে ফেলে।
.png)
শেষ রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর তারা চতুর্মুখী আক্রমণ চালায়। ধুলাউড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশে কয়েকটি বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর হামলা চালিযে অস্ত্রসহ কয়েকজনকে আটক করে। চোখ এবং হাত বেঁধে বীর মুক্তিযোদ্ধ দারা মিয়া, চাঁদ আলি, মহসিন আলী, খবির উদ্দিন, শাজাহান আলী, মোসলেম উদ্দিন, আখতার আলম মোকছেদ আলীকে ইছামতি নদী পাড়ে নিয়ে গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। আধমরা অবস্থায়ই পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় তাদের শরীরে। গুলি করে ১১ জনকে হত্যা করা হয়। আটজন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ ও স্থানীয় ১১জনকে ধুলাউড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পিছনে গর্ত করে পুঁতে রাখা হয়। মুক্তিযোদ্ধারা যেসব বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল সেসব বাড়িও পাক সেনারা ভস্মিভূত করে।
প্রত্যক্ষদর্শী জবেদা খাতুন (৮৫) জানান, সেদিন নারীরা পালিয়ে গিয়ে তাদের জীবন ও সম্ভ্রম রক্ষা করেছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শী মোসলেম উদ্দিন (৮২) জানান, গ্রামবাসীর মধ্যে তাকেও পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা হয়েছিল। হঠাৎ একটা হুইসেল বাজল। তখন মিলিটারিরা তাদের ফেলে রেখে সব চলে যায়। এতে তিনিসহ অনেকেই প্রাণে বেঁচে যান।
_1700988045.jpg)
হানাদার বাহিনী সাঁথিয়া ফেরার পথে রুদ্রগাঁতি ও ধোপাদহ গ্রামের অন্তত ১০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। তারা মুক্তিযোদ্ধা আ. সামাদকে ধরে সাঁথিয়া থানার সামনে একটি গাছে ঝুলিয়ে হাত-পা বেঁধে গুলি করে হত্যা করে। ধুলাউড়ি প্রাইমারি স্কুলের পেছনে যে স্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পুঁতে রাখা হয়েছিল সে স্থানটির চারদিকে ছোট একটি বাউন্ডারি তৈরি করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় নিরীহ গ্রামবাসী যারা সেদিন ঘটনাচক্রে শহিদ হয়েছিলেন তাদের পরিবারের লোকজন শহিদ হওয়ার সরকারি স্বীকৃতি চান। এদেরই একজন রেজাউল করিম বলেন, আমাদের স্বজনরা সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে প্রাণ হারান। নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার এই ১১ জনকে বলা হয় গণশহিদ। ‘হোয়াট ইজ গণশহিদ?’ তিনি বলেন, আমরা চাকরি চাই না, ভাতা চাই না। আমাদের স্বজনদের মুক্তিযোদ্ধার মর্যাদা দেওয়া হোক।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাঁথিয়া উপজেলা সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আ. লতিফ জানান, তার প্রচেষ্টায় এখানে ‘দুর্জয় সাঁথিয়া’ নামে স্মৃতিসৌধ করা হয়েছে।
ধুলাউড়ি ইউপি চেয়ারম্যান জরিফ আহমেদ জানান, ধুলাউড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছনে যে স্থানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পুঁতে রাখা হয়েছিল সে কবরটি বাঁধানো হয়েছে। এ প্রজন্মের কাছে সেদিনের ইতিহাস তুলে ধরতে প্রতি বছরই নানা আয়োজন করা হয়।