ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

মুন্সীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের গেট যেন দালালদের আস্তানা

মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১৭:২৯, ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
মুন্সীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিসের গেট যেন দালালদের আস্তানা
মুন্সীগঞ্জের আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে দিনদিন দালালদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। প্রতিদিন অফিস খোলার আগে থেকে অফিসের গেটে অবস্থান করেন বেশ কয়েকজন অপরিচিত যুবক। সেবাপ্রত্যাশী কেউ পাসপোর্ট অফিসের গেটে যাওয়া মাত্র তাকে ঘিরে ধরেন দালাল চক্রের এই সদস্যরা। আশ্বাস দেন ঝামেলা ছাড়া নির্ধারিত সময়ে পাসপোর্ট পাওয়ার। এই পাসপোর্ট অফিসের গেট যেন দালালদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে।

এদিকে, পাসপোর্ট পাওয়ার আশ্বাসে প্রতারণার ফাঁদে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে পাসপোর্ট অফিস হতে দূরের উপজেলা ও চরাঞ্চল থেকে আসা মানুষজন সহজেই তাদের কথা বিশ্বাস করে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে পাসপোর্ট করাচ্ছেন।

মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের খালইস্ট এলাকায় এ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের অবস্থান। ২০১০ সালে মুন্সীগঞ্জ জেলা শহরের মাঠপাড়ায় একটি ভাড়া ভবনে এ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১৬ সালে খালইস্ট এলাকার নিজস্ব ভবনে এর কার্যক্রম শুরু হয়।

Advertisement

বুধবার সকালে পাসপোর্ট অফিসের অদূরে যাওয়া মাত্র ডেইলি বাংলাদেশের এই প্রতিবেদককে দু’জন দালাল ঘিরে ধরে বলেন, পাসপোর্ট নবায়ন করবেন নাকি নবায়ন? নতুন পাসপোর্ট করবেন  বলেই এদের মধ্যে একজন বলেন, দেন ভোটার আইডিকার্ড দেন করে দিচ্ছি।

এ সময় কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক যুবক বলেন, বিদ্যুৎ বিল এবং পেশার সার্টিফিকেট থাকলে কাজ সহজ হবে। সবকিছু আমরা করে দেবো পুলিশ ক্লিয়ারেন্সও করে দেবো। আপাতত আপনার ভোটার আইডিকার্ড দেন।

কত টাকা লাগবে জানতে চাইলে তিনি জানান, ১৫ দিনে পাসপোর্ট করলে ১২ হাজার, আর ৩০ দিনে করলে ৯ হাজার টাকা লাগবে। পরে এই প্রতিবেদক পাসপোট অফিসে ঢুকে দেখেন প্রায় ২০০ জন লোক পাসপোর্ট আবেদন করার জন্য পাসপোর্ট অফিসের ভেতরে ঢুকে বসে রয়েছেন।

সকাল সাড়ে ৯টা বাজলেও পাসপোট কাউন্টারে কাউকে পাওয়া যায়নি। পরে সকাল ৯.৩৫ মিনিটের দিকে ঐ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস কাউন্টারে পাসপোর্টের আবেদন ফরম জমা নেয়ার জন্য এক ব্যক্তি প্রবেশ করেন। এরপরে এই কাউন্টারের পাশের কাউন্টারে পাসপোর্ট ডেলিভারি দেওয়ার জন্য প্রবেশ করেন অপর আরেক ব্যাক্তি।

এ সময় এই প্রতিবেদক আবার পাসপোর্ট অফিসের ভেতর হতে বের হয়ে দেখেন গেটে  দাঁড়িয়ে আছে দালাল চক্র।  কেউ ঢুকলেই তার সামনে গিয়ে জিজ্ঞাসা করছেন রিনিউ করবেন? নাকি  নবায়ন। বিভিন্নভাবে তাদের দিয়ে পাসপোর্ট করার জন্য প্রভাবিত করছেন।

পাসপোর্ট অফিসের গেটে দায়িত্ব পালন করছেন রাজু মিয়া নামের একজন আনসার সদস্য। তার সঙ্গে দালালদের বেশ সখ্যতা। রাজু নিজেও সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের কাছে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করছেন নতুন পাসপোর্ট নাকি নবায়ন। মাঝেমধ্যে গেট থেকে সেবাপ্রত্যাশীদের লাইনে দাঁড় না করিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ভেতরে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পাসপোর্ট অফিসে ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট করতে সরকার নির্ধারিত খরচ ৫ হাজার ৭৫০ টাকা। এই পাসপোর্ট এক সপ্তাহের মধ্যে ডেলিভারি নিতে হলে ৮ হাজার ৫০ টাকা এবং দুই  দিনে ডেলিভারি নিতে ১০ হাজার ২০০ টাকা জমা দিতে হবে। এর বাইরে অনলাইন আবেদনের জন্য দিতে হয় অতিরিক্ত ফি।

মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সামনে ছাড়াও আশপাশের অনেক দোকানে অনলাইনে আবেদন করা যায়। অনলাইনে আবেদন করতে গেলেই ঐসব দালালরা প্রতারণার ফাঁদ ফেলে পাসপোর্ট করতে বিভিন্ন ঝামেলার কথা তুলে ধরে পাসপোর্ট অফিসে তাদের লোক রয়েছে বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

পাসপোর্ট অফিসে কথা হয় আরমান হোসেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। তিনি তার পাসপোর্ট রিনিউ করতে এসেছেন। তিনি বলেন, গেটে আসা মাত্র বেশ কয়েকজন দালাল আমাকে ঘিরে ধরেছে। ১৫ দিনের মধ্যে রিনিউ করে দেবে বলে আমার কাছে ১২ হাজার টাকা চাচ্ছে। আর এক মাসে দিলে নেবে ৯ হাজার টাকা। ফরম আমি নিজে ফিলাপ করেছি, তাই আমি নিজে জমা দিয়েছি।

মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসপাসপোর্ট অফিসের দালালির সঙ্গে জড়িত এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখন মূলত কম সংখ্যক দালালই পাসপোর্ট অফিসের গেটে দাঁড়ান। দালালরা মূলত এখন অনলাইন আবেদনের অফিসেই বেশি অবস্থান করেন। মুন্সীগঞ্জ পাসপোর্ট অফিস ও তার আশপাশের অনলাইন অফিসে ৫০-৬০ জন দালাল রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন উপজেলার হাটবাজারেও রয়েছে অনলাইনে পাসপোর্টের আবেদন করার দোকান। তারাও টাকা নিয়ে পুলিশ ভেরিফিকেশন করে পাসপোর্ট করে দিচ্ছেন।

ঐ ব্যক্তি আরো বলেন, মূলত ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে যখন কেউ ঝামেলায় পড়েন তখনই পাসপোর্ট অফিসের সামনে থাকা দালালরা সুযোগটা নেন। ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে ঝামেলা হলেই দালালরা বলেন, আসেন আমরা ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। এ বলে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা দাবি করেন। তখন সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে টাকার বিনিময়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিতে রাজি হন।

তখন দালালরা টাকা হাতিয়ে নিয়ে অফিসে যোগাযোগ করলে কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে ফিঙ্গারপ্রিন্ট করিয়ে দেন। মূলত দালাল পান তিন থেকে চার শ টাকা। বাকি টাকা পাসপোর্ট অফিসের লোকজন ভাগাভাগি করে নিয়ে থাকেন।

পাসপোর্ট নিতে অফিসে আসা টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং গ্রামের শাহিন বলেন, গত ৩০ জানুয়ারি আমার গ্রামের এক লোকের মাধ্যমে পাসপোর্টের আবেদন করেছিলাম। এখন এসে পাসপোর্ট নিয়ে গেলাম। পাসপোর্ট করতে আমার কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা নিয়েছে।

টংগিবাড়ী উপজেলার পাঁচগাওঁ গ্রামের প্রবাসী বাদশা শেখের স্ত্রী সামিয়া বলেন, মুন্সীগঞ্জ সুপার মার্কেট এলাকায় আমার দেবরের পরিচিত আলামিন নামের একজনের পাসপোর্টের জন্য অনলাইন আবেদন করার অফিস রয়েছে। তাকে ৯ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। আমরা শুধু পাসপোর্ট অফিসে আবেদন জমা দিয়েছি, আর এখন নিয়ে গেলাম। বাকি সব কাজ উনিই (আলামিন) করেছেন।

মুন্সীগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন খন্দকার বলেন, পাসপোর্ট অফিসে দালাল কই। আমিতো কোনো দালাল দেখি না। এখন কেউ যদি পাসপোর্ট করতে গিয়ে দালালকে টাকা দেয় আমার কিছু করার নেই।

তিনি আরো বলেন, পাসপোর্ট অফিস আগের চেয়ে এখন অবস্থা অনেক ভালো। আপনি নিজেই খোঁজ নিয়ে দেখেন। একদিনে আমিতো সব পরিবর্তন করে ফেলতে পারবো না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!