ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

ইতিহাসের সাক্ষী ৮০০ বছরের হারুলিয়া মসজিদ 

রিফাত আহমেদ রাসেল, নেত্রকোণা
প্রকাশিত: ১৮:০৮, ১১ এপ্রিল ২০২৪
ইতিহাসের সাক্ষী ৮০০ বছরের হারুলিয়া মসজিদ 
ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

মাঝে বড় একটি গম্বুজ আর চারপাশে ছোট চারটি গম্বুজ নিয়ে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৮০০ বছরের পুরোনো মসজিদ। সময়ের সঙ্গে পাল্টেছে রং, পাল্টেছে চারপাশের পরিবেশ। তবে ধর্মীয় বিশ্বাস আর মহান আল্লাহতালার সন্তুষ্টি অর্জনে আজো এই মসজিদে নামাজ পড়ছেন মুসল্লিরা। 

৮০০ বছরের পুরোনো এই মসজিদ নেত্রকোণার কেন্দুয়ায়। স্থানীয়দের কাছে মসজিদটি গাইনের মসজিদ নামেও পরিচিত। তবে এই মসজিদ ঘিরে নানা জনের নানা মত। 

নেত্রকোণার কেন্দুয়া উপজেলার মোজাফফরপুর ইউপির হারুলিয়া গ্রামে অবস্থিত এই মসজিদ। 

Advertisement

বর্তমানে এটিতে নামাজ পড়তে পারেন মাত্র সতেরো জন। একজন ইমাম ও দুই কাতারে আটজন করে। এমন ছোট একটি চারটি মিনারের মসজিদ কী কারণে কোনো সময় করা হয়েছিলো এর কোনো দালিলিক প্রমাণ না থাকলেও স্থানীয়দের দাবি এটি ১২০০ সালে তৈরি। 

গ্রামে গড়ে ওঠা জনবসতির মাঝে জনশ্রুতি রয়েছে এই মসজিদে একটি পাথর ছিলো যা বিগত কয়েক বছর আগে চুরি হয়ে যায়। সেটিতে আরবিতে একটি সাল লিখা ছিলো বলে স্থানীয়রা জানান। তারা হিজরি ওই সনটি হিসেব করে ১২০০ সাল বের করেন। 

তবে স্থানীয়ভাবে জনশ্রুতি রয়েছে এটিকে গাইনের মসজিদ বলে অভিহিত করেন স্থানীয়রা। কেন কী কারণে এই মসজিদ স্থাপন হয় তা নিয়ে আগ্রহ থাকলেও কোথাও নেই কোনো তথ্য। তবে বেশিরভাগ মানুষের দাবি এ অঞ্চলে ধর্ম প্রচারেই হয়তো মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। 

ভারপ্রাপ্ত ইমাম মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, এই মসজিদে যিনি পুরনো ইমাম ছিলেন তিনি বলেছেন চুরি হওয়া পাথরটির ভেতরে আরবি ফারসি ভাষায় লিখা অনুযায়ী ১২০০ সাল বুঝা গেছে। 

বর্তমানে নান্দনিক ছোট এই মসজিদকে বাড়িয়ে স্থানীয়রা একটি পাকা মসজিদ করে ফেলেছেন। এদিকে পাথর চুরির পরেই তারা বুঝতে পেরেছেন এই মসজিদের কোনো ইতিহাস বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিলো পাথরে। অথবা অনেক দামী ছিলো পাথরটি। এমন নানা তথ্য জানান মসজিদের পাশের ঘরের বজলুর রহমান। 

তবে কেউ কেউ বলছেন, এ এলাকায় হাওর বাওর নদী থাকায় বিভিন্ন এলাকা থেকে নৌকায় বাণিজ্য করতে আসতেন। সেই মুঘল বা সুলতানি আমলে। তখনকার সময়ে এই গ্রামে কোনো মানুষ ছিলেন না। জঙ্গলের মতো থাকায় চারপাশে পানি বেষ্টিত হওয়ায় হয়তো নামাজ বা বিশ্রামের জন্য কোনো সওদাগর এটি তখন বানিয়ে থাকতে পারেন। অথবা বসতি স্থাপনের জন্য গ্রামটিতে এই স্থাপনা করেছিলেন বলে জানান স্থানীয় গবেষক হুমায়ূন কবীর। 
তিনি বলেন, আবার পূর্বপুরষদের মাঝে তেমন নামাজি ছিলো না জানা গেছে। এই অঞ্চলে হয়তো ধর্ম প্রচারের জন্যও এটি স্থাপন করেছিলেন। 

স্থানীয় মুসল্লি লতিফ মিয়া জানান, মুঘল আমলে নির্মিত এ সুপ্রাচীন মসজিদটি ইসলামি ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। তারা নানা পুঁথি পড়ে জেনেছেন মুঘলদের রাজত্বকালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজির অত্যন্ত স্নেহধন্য শাইখ মুহাম্মদ ইয়ার নামে এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ১২০০ সালে এ এলাকায় আসার পর মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। 

সুপ্রাচীন এ মসজিদের ভেতরের দেয়ালে ফার্সিতে লিখা শাইখ মোহাম্মদ ইয়ারের নাম এবং ১২শ সালের কথা উল্লেখ থাকায় শাইখ মুহাম্মদ ইয়ারকে এ মসজিদটির প্রতিষ্ঠা মনে করা হয়। 

মসজিদটি মাত্র সাত শতাংশ ভূমির উপর নির্মিত। মসজিদের চারকোনায় রয়েছে চারটি পিলার। যার ওপরে কলসির আকৃতিতে গম্বুজের কারুকার্য করা।

মসজিদের পুরো ছাদ জুড়েই একটি মাত্র গম্বুজ। মসজিদের উত্তর পূর্ব ও দক্ষিণে তিনটি লম্বা আকারের দরগা এবং সামনের অংশে ছোট্ট একটি চারচালা টিনের ঘরও ছিলো। যা ভেঙে স্থানীয়রা মসজিদেরে আয়তন বাড়িয়েছেন। তারা আরো জানান, মসজিদের নির্মাণ শৈলী ও অবকাঠামো কোনো রড সিমেন্টের নয়। 

তবে নানা ইতিহাস থেকে পাওয়া তথ্যে আরো জানা যায় এগুলো পোড়ামাটি, লালি, চুন, চিনি, চিটাগুড়, কষ এবং এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছে। হাওর সংলগ্ন এ মসজিদটি মুঘল আমলের মানুষের ইবাদত—বন্দেগি ও ইসলামি ঐতিহ্যের স্মৃতিচিহ্ন ধারণ করে রয়েছে বলেও জানা যায়। 

এটিতে কোনো খাদেম নেই। আশপাশের বাড়িঘরের মানুষজন মসজিদের দেখাশোনা করেন। একজন ইমাম ছিলেন তিনি বয়সের ভারে বাড়ি চলে গেছেন। 

তবে ঐতিহাসিক এই মসজিদের মহল্লার লোকজন বলছেন, তারা মসজিদের এই ইতিহাস ধরে রাখার জন্য পাচ্ছেন না প্রশাসনিক কোনো সুযোগ সুবিধা। এমনকি মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য নেই অজু খানার কোনো সুব্যবস্থা।  

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!