সাবমারসিবল মোটর মেশিন ব্যবসায়ী লালন মিয়া জানান, পানির চাহিদা মিটাতে গত সাতদিনে প্রায় ১২শ’ সাবমারসিবল পাম্প মোটর মেশিন বিক্রি ও বসানো হয়েছে পৌর এলাকাসহ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে।
তিনি আরো বলেন, গত মার্চ মাস থেকেই পানি ওঠা কমে যায়। আর এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে এই সমস্যা তীব্র হতে শুরু করেছে। পানির সংকটের কারণে সামর্থ্যবান অনেকেই বাড়িতে ৩৫ থেকে ৪৫ হাজার টাকা খরচ করে সাবমারসিবল মেশিনের মোটর বসিয়ে নিচ্ছেন।
.png)
ভেড়ামারা পৌর এলাকাসহ উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের খাবার পানির জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে। এ যেন মারার ওপর খাঁড়ার ঘা। গত একমাস ধরে পানি তীব্র সংকটে কষ্ট করেছেন এ উপজেলার হাজার হাজার মানুষ।
ভেড়ামারায় উপজেলা সহকারী পরিসংখ্যান কর্মকর্তা সিরাজুল ইসলাম বলেন, উপজেলায় প্রায় শতকরা ৯৬ জন লোক টিউবওয়েলের পানি পান করেন। কিন্তু উপজেলার প্রায় ২০ হাজার টিউবওয়েলের বেশির ভাগেই মিলছে না পানি। পানি সংকটে গ্রামে গ্রামে চলছে খাবার পানির চরম হাহাকার।
ভেড়ামারা শহরের পৌর এলাকায় ২৭ ফুট। ইউনিয়র বাহাদুরপুর ৩৪ ফুট। মোকারিমপুর ২৮ ফুট। চাঁদগ্রাম ও বাহিরচর ইউনিয়নে পানির স্থিতিতল ৩০ থেকে ৩৪ ফুটের নিচে পানির স্তর নেমে গেছে। সেখানে ৬ নম্বর হ্যান্ড পাম্পযুক্ত নলকূপ এবং সেন্ট্রিফিউগাল পাম্পযুক্ত নলকূপের পানি উত্তোলনে অসুবিধা হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভেড়ামারা উপজেলায় সরকারি ও বেসরকারি মিলে এই উপজেলায় প্রায় মোট ৩ লাখ নলকূপ রয়েছে। এরমধ্যে সরকারিভাবে পূর্বের ৩১১০টি এবং নতুন ভাবে ১৫৬টি নলকূপ বসানো হয়েছে। তারমধ্যে চালু রয়েছে ২৩১৯টি। অকেজো হয়ে আছে ৪৫০টি। দীর্ঘদিন বৃষ্টি না হওয়ায় ওইসব এলাকায় পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলোও ক্রমেই শূন্য হয়ে পড়ছে।
এলাকার সচেতন মহল বলছেন, খাল, বিল, জলাশয় ভরাট ও দখলের কারণে পানির প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। বেশিরভাগ খালে পানি নেই। নদীগুলো এখন মৃতপ্রায় এছাড়াও নিচু ও কৃষিজমি মাটি এবং বালু ফেলে ভরাট করে ফেলায় পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। এখন প্রায় প্রতিটি টিউবওয়েলই অকেজো। টিউবওয়েলের হাতল ধরে অনেকক্ষণ চাপাচাপি করলেও পানি আসছে না।
সরেজমিনে উপজেলার জুনিয়াদহ ইউনিয়নের মির্জপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। অনেকে টিউবওয়েলের সঙ্গে মোটর বসিয়েছেন। তবে সেখানেও পানির দেখা মিলছে না।
মির্জপুর গ্রামের শাবানা খাতুন বলেন, গত দেড় মাস ধরে পানির সমস্যা। একমাস আগে টিউবওয়েলের সঙ্গে মোটর বসিয়েছি, তাতেও পানি আসছে না। খাবার পানির জন্য এখন দূরের একটি মাঠের স্যালো মেশিন থেকে পানি আনতে হচ্ছে।
উপজেলার মোকারিমপুর, বাহিরচর, বাহাদুরপুর ও চাঁদগ্রাম ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের পরিস্থিতি একই। টিউবওয়েলে পানি ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে। পানির সংকটের কারণে সংসারের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে।
চরদামুকদিয়া রশিদা বেগম বলেন, এক জগ পানি তুলতে কমপক্ষে ১০ মিনিট সময় লাগছে। পানির সমস্যার কারণে সাবমারসিবল বসাতে ৪৫ হাজার টাকা জোগার করতে গরু-িছাগল বিক্রি করে দিয়েছি। আশপাশের পুকুর ও খালেও পানি নেই। খুব কষ্টে আছি।
পৌর এলাকা ফারাকপুর গ্রামের গৃহবধূ শামিমা আক্তার বলেন, আগে ২০-৩০ মিনিট মোটর চালালেই ট্যাংক পূর্ণ হয়ে যেত। ১৫-২০ দিন ধরে দুই-তিন ঘণ্টা মোটর চালালেও প্রয়োজনীয় পানি মিলছে না। এভাবে নষ্ট হচ্ছে অনেকের বৈদ্যুতিক মোটর।
কাঠেরপুল গ্রামের আলীমদ্দীন বলেন, আমার বাড়ির টিউবওয়েলে প্রায় ১৫-২০ দিন পানি নেই। শুধু আমার বাড়ি নয়, পৌর এলাকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একই অবস্থা। খাবার পানির জন্য এখানে হাহাকার শুরু হয়ে গেছে।

ষোলদাগ গ্রামের কৃষক মাসুদ পারভেজ জানান, বৃষ্টি নেই। খুব তাপ। কলেও (টিউবওয়েলে) পানি উঠছে না। মাঠের ক্ষেত নষ্ট হচ্ছে। তাই বৃষ্টি চেয়ে নামাজের মধ্যে আল্লাহকে রাজি খুশি করানোর জন্য কান্নাকাটি করেছি তবু বৃষ্টি মিলছে না।
চক ভেড়ামারা হাফেজিয়া মাদরাসার সহকারী শিক্ষক হাফেজ হারুন আর রশীদ জানান, দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির কারণে মানুষ, পশুপাখি ও গাছপালাসহ সবাই খুব কষ্টে আছে।
ভেড়ামারা উপজেলার পৌর মেয়র আনোয়ারুল কবির টুটুল, ইউপি চেয়ারম্যান সোহেল রানা পবন, আব্দুস সামাদ, রওশনায়ারা বেগম ও আব্দুল হাফিজ তপন বলেন, ওই ইউনিয়নগুলোতে অধিকাংশ গ্রামেই টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। অপরিকল্পিতভাবে শ্যালো মেশিন দিয়ে পানি তোলা এবং যত্রতত্র পুকুর-খাল-বিল ভরাট করে ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
ভেড়ামারা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাধারণত পানির স্তর ২২ থেকে ২৫ ফুটের নিচে নেমে গেলে নলকূপে পানি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এ বছর এই মুহূর্তে এ উপজেলাতেই পানির স্তর নেমে গেছে ২৪ থেকে ২৫ ফুট। যে কারণে অধিকাংশ টিউবওয়েলেই পানি উঠছে না। গ্রীষ্ম মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।