কান্না থামেনি দুই পা হারানো রেবেকার, খোঁজ মেলেনি শাবানার
দুই পা হারিয়ে আজ কর্মহীন হয়ে পুরোটা দিন বাড়িতে বসে কাটাতে হয়। স্বামী সন্তানদের নিয়ে কোথাও যেতেও পারি না। তাদের প্রয়োজনে তেমন কাজে আসতে পারি না। একজন কর্মক্ষম মানুষ এভাবে চলতে পারে না। হয়তো কিছু টাকা পেয়েছি, কিন্তু কেউ কী আমার পা দুটো ফিরিয়ে দিতে পারবে? যা দিয়ে আমি আগের মতো কাজ করতে পারবো, স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারব।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা ধসে দুই পা হারানো দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার পঙ্গু রেবেকা খাতুন (৩৪)।
রেবেকা খাতুন (৩৪) ফুলবাড়ী উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাই চেয়ারম্যানপাড়া গ্রামের মোস্তাফিজার রহমানের স্ত্রী। সেদিনের দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হন উপজেলার কাজিহাল ইউনয়নের ডাঙ্গা গ্রামের আতাউর রহমানের স্ত্রী গুলশানে জান্নাত (শাবানা)। দুর্ঘটনার সময় তার বয়স ছিল (২৭) বছর।
.png)
কথা হয় রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণকারী রেবেকা খাতুন এবং ওই ঘটনায় নিখোঁজ হওয়া গুলশানে জান্নাত (শাবানার) পরিবারের সঙ্গে।
আজ ২৪ এপ্রিল ভয়াবহ রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১১ বছর পূর্ণ হলো। রানা প্লাজার ভয়াবহ দুর্ঘটনায় সেদিন ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে দুই পা হারিয়ে পঙ্গুত্ববরণ করেন রেবেকা। সেই ভয়াল দুঃসহ স্মৃতি আজও বহন করে চলেছেন। এখনও কান্না থামেনি তার। সেদিন নিখোঁজ হন উপজেলার কাজিহাল ইউনয়নের ডাঙ্গা গ্রামের আতাউর রহমানের স্ত্রী গুলশানে জান্নাত (শাবানা)।

সেদিনের সেই রোমহর্ষক ঘটনা বর্ণনা করে রেবেকা জানান, ঘটনার আগের দিন অর্থাৎ ২৩ এপ্রিল রানা প্লাজায় ফাটল দেখা দিলে বিকেল ৪টায় সবাইকে ছুটি দিয়ে দেন কর্তৃপক্ষ। পরদিন সকাল ৮টায় যথারীতি কাজে এসে বিল্ডিংয়ের ফাটলের কারণে কাজে যোগ দিতে না চাইলে রানা প্লাজা কর্তৃপক্ষ জানায়, বেতন-ভাতাসহ অভারটাইমের টাকা দেওয়া হবে না এবং সেইসঙ্গে চাকরিচ্যুত করার কথাও জানান তারা। পরিশ্রমের টাকা আর চাকুরি হারানোর ভয়ে সব শ্রমিকের সঙ্গে সেদিন বাধ্য হয়ে রেবেকাও কাজে যোগ দেন।
তিনি বলেন, ঘটনার দিন সকাল ৯টায় তার মা নিখোঁজ চান বানু নাস্তা খাওয়ার কথা বললে রেবেকা বলেন, অল্প কিছু কাজ আছে মা, এটা শেষ করেই একটু পরেই নাস্তা খাব। এরপর ৩ দিন আর খাবার মুখে উঠেনি। দুর্ঘটনায় অচেতন হয়ে ৩ দিন আটকে পড়েছিলাম ওই বিল্ডিংয়ের ধ্বংসস্তূপের নিচে। জ্ঞান ফিরলে দেখি চারিদিকে অন্ধকার, বাঁচাও বাঁচাও বলে কারা যেন চিৎকার করছে। তখন আমার ‘তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছিল। পানি পানি চিৎকার করেও পানি পাইনি। নিরুপায় হয়ে গায়ের ঘাম শুষে নেয়াসহ নিজের মূত্র পান করেছি। তারপর আর কিছুই বলতে পারি না। কখন যেন উদ্ধারকর্মীরা এসে আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন। পরে নিজেকে হাসপাতালের বেডে আবিষ্কার করি। পরে জানাতে পারি আমার শরীরে অপরিহার্য দুটি পা উরু পর্যন্ত কেটে ফেলা হয়েছে। এরই মধ্যে দুই পায়ে ৮ বার অপারেশন কারা হয়। দীর্ঘ এক বছর ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কর্মহীন হয়ে গ্রামে নিজ বাড়িতে ফিরি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো ওইদিন আমি আমার গর্ভধারিণী মা চান বানু ও দাদি কোহিনুর বেওয়াকে হারিয়েছি। তারাও সেখানে কাজ করতেন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাদের পাইনি।

ঘটনার কিছুদিন পর আমার পঙ্গুত্ব জীবনে কোলজুড়ে আসে প্রথম সন্তান ছিদরাতুন মুনতাহা। বর্তমানে তার বয়স ১০ বছর। সে স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে। অপর সন্তান মাদানী আন নুর, তার বয়স বর্তমানে ৪ বছর।
আক্ষেপ করে রেবেকা খাতুন আরো বলেন, একটা জীবন্ত লাশ হয়ে বেঁচে আছি। পঙ্গুত্বের কারণে সন্তানদের সব আবদার পূরন করতে পারি না। ইচ্ছে হলেও অন্য মায়েদের মতো সন্তানদের বাইরে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারি না। স্বামীর প্রয়োজনেও কাজে আসতে পারি না। একটা অভিশপ্ত জীবন নিয়ে বেঁচে আছি।
রেবেকা খাতুন বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী দুই পা হারানো ব্যাক্তিরা ক্ষতিপূরণ বাবদ ১৫ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই সময় চিকিৎসাজনিত কারণে ক্ষতিপূরণের ৫ লাখ টাকা কম পেয়েছি। ১৫ লাখ টাকার স্থলে পেয়েছি ১০ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র। সেই সঞ্চয়পত্রের লভ্যাংশ প্রতিমাসে ৯ হাজার ১শ’ টাকা করে পাই। তা দিয়েই বর্তমানে কোনো রকমে কষ্ট করে চলে আমাদের সংসার। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরাসহ কিছু করতে পারি না। তাই আমার স্বামীও কাজে যেতে পারেন না। সারাক্ষণ আমার পাশেই থাকতে হয় তাকে। সেদিনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন পঙ্গুত্ববরণকারী রেবেকা।
অপরদিকে, সেদিনের দুর্ঘটনায় নিখোঁজ হন উপজেলার কাজিহাল ইউনয়নের ডাঙ্গা গ্রামের আতাউর রহমানের স্ত্রী গুলশানে জান্নাত (শাবানা) তখন তার বয়স ছিল (২৭) বছর।
কথা হয় গুলশানে জান্নাত শাবানার স্বামী আতাউর রহমানের সঙ্গে। তিনি জানান, শাবানা রানা প্লাজার ষষ্ঠ তলায় সুয়িং অপারেটর হিসেবে কাজ করত। প্রতিদিনের মতো শাবানা ওইদিন রানা প্লাজায় কাজ করতে যায়, এরপর ঘটে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনা। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাইনি। তবে নিখোঁজ তালিকায় শাবানার নাম ছিল। সেই সূত্র ধরে ওই সময় ১৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছি। কিন্তু পাইনি স্ত্রীকে কিংবা স্ত্রীর মরদেহ। সেদিনের ঘটনায় এলোমেলো হয়ে যায় আমার সাজানো সংসার। মাহারা শিশুদের অনেক কষ্টে লালন-পালন করেছি। তাকে হারানোর ব্যথা আজও বয়ে বেড়াই, স্মৃতিগুলো মনে পড়ে।

তিনি আরো বলেন, সে সময় আমাদের ছেলে সাজ্জাদ আহম্মেদ সজিবের বয়স ছিল ৫ বছর। এখন তার বর্তমান বয়স ১৮ বছর। সে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। মেয়ে সোহানা আফরিন সানুর তখন তার বয়স ছিল ৩ বছর। বর্তমানে তার বয়স ১৪ বছর। সে বর্তমানে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ছে। আজ তাদের মা থাকলে কতো খুশি হত।
শাবানার মেয়ে সানু বলেন, তখন আমি অনেক ছোট ছিলাম, মায়ের চেহারাটা মনে নেই। মা কে খুব কাছে পেতে ইচ্ছে করে। আজ মা থাকলে আমাদের কত আদর যত্ন করত। প্রতিটি মুহূর্তে মাকে খুব মনে পড়ে।
প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা নামের ভবন ধসের ঘটনায় ১ হাজার ১১৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। ধ্বংসস্তূপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার হয়। উদ্ধারকৃত লাশের মধ্যে ৮৪৪টি স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ডিএনএ পরীক্ষার নমুনা রেখে ২৯১ জনের অশনাক্ত লাশ জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়। উদ্ধারকৃত জীবিতদের মধ্যে ১ হাজার ৫২৪ জন আহত হন। তাদের মধ্যে পঙ্গুত্ববরণ করেন ৭৮ জন। সেদিনের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় পুরো বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল। ভয়াবহ সেই বিপর্যয়ের রেশ রয়ে গেছে আজও। আহতদের অনেকে এখনো আতঙ্কগ্রস্ত। এরই মাঝে বেঁচে থাকার তাগিদে নতুন পথ খুঁজছেন অনেকে।

রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় হত্যা মামলা
রানা প্লাজা ধসের পরদিন অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে একটি মামলা করেন সাভার থানার এসআই আলী আশরাফ। ওই মামলায় সোহেল রানাসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়। এছাড়া রানা প্লাজা ধসে নিহত হওয়ার ঘটনাকে হত্যাকারী আখ্যায়িত করে আদালতে আরেকটি মামলা করেন গার্মেন্ট শ্রমিক জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী শিউলি আক্তার। আদালতের নির্দেশে একে অবহেলাজনিত মৃত্যু মামলার সঙ্গে একীভূত করে তদন্ত করে সিআইডি। আদালতে দায়ের করা হত্যা মামলার বাদী শিউলি আক্তার এখন পুলিশের মামলার সাক্ষী। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে।
২০১৬ সালের ১৮ জুলাই এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। চার্জশিটভুক্ত ৪১ আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা কারাগারে। রানার বাবা আব্দুল খালেক, আবু বকর সিদ্দিক ও আসামি আবুল হোসেন জামিনে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।
বর্তমানে ঢাকার জেলা দায়রা জজ হেলাল উদ্দিনের আদালতে মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। এ মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষীর মধ্যে প্রায় ৮৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ করেছে রাষ্ট্রপক্ষ। সর্বশেষ গত ২১ এপ্রিল মামলাটির ৪ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন আদালত। আগামী ২৮ এপ্রিল মামলাটির পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ধার্য রয়েছে।