ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]
সুন্দরবনে আগুন

খাদ্য-আবাসস্থল হুমকিতে বাঘসহ অন্য প্রাণীরা

বাগেরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৯:১১, ৬ মে ২০২৪
খাদ্য-আবাসস্থল হুমকিতে বাঘসহ অন্য প্রাণীরা
সুন্দরবনে নেভাতে হচ্ছে আগুন

টানা প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পুড়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। চাঁদপাই রেঞ্জের আমুরবনিয়া লতিফের ছিলা এলাকায় লাগা আগুন ছড়িয়েছে দুই কিলোমিটার অংশে। আগুন নিয়ন্ত্রণে বন বিভাগের পাশাপাশি কাজ করেছে ফায়ার সার্ভিস, কোস্ট গার্ড, বিমান ও নৌবাহিনী। তবে দুর্গম এলাকা হওয়ায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এটি নাশকতা। পরিকল্পিতভাবেই কেউ আগুন দিয়েছে।

এদিকে, বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায় সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের আওতাধীন চাঁদপাই রেঞ্জের বনে প্রায়ই বাঘ বিচরণ করে। আর এই বনেই গত শনিবার দুপুরে আগুনের সূত্রপাত হয়ে সোমবার পর্যন্ত জ্বলেছে। এতে বন ও বন্যপ্রাণীর কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা এখনো অজানা। তবে বন ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের এই অংশটি উঁচু হওয়াতে সেখানে অজগরের আবাসস্থল রয়েছে। এছাড়া হরিণ, বানর, শূকর, বাদুড়সহ নানা প্রজাতির প্রাণীর বিচরণ তো রয়েছেই। ফলে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারা এবং তাদের আবাসস্থল। তবে আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দ্রুত চলাফেরা করতে না পারা প্রাণী, পতঙ্গ এবং বিশেষ করে অজগর।

বাঘ গবেষকরা বলছেন, বাঘ আগুন ও শব্দকে বেশি ভয় পায়। তাই সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আমরবুনিয়া ক্যাম্পের বনাঞ্চলের আগুনে বেশি প্রভাব পড়বে বাঘের ওপর। কারণ টেরিটোরিয়াল প্রাণী হওয়াতে বাঘ সহসা অন্য এলাকায় গিয়ে থিতু হতে পারবে না। অন্যদিকে আগুন বেশিদূর না গড়ালেও বাঘের শিকার প্রাণীরা আগুনের কারণে এই এলাকা ছেড়ে চলে গেলে খাদ্য সংকটে পড়তে পারে বাঘ।

Advertisement

এছাড়া বনের বাঘের বিচরণক্ষেত্রে আগুন লাগার নেপথ্যে বাঘ শিকারিদের যোগাসাজশ রয়েছে কি না তাও খতিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন সুন্দরবনের বাঘ গবেষকরা। 

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, সুন্দরবনের যে জায়গায় আগুন লেগেছে এলাকাটি উঁচু, বর্ষার জোয়ার ছাড়া এখানে পানি ওঠে না। আর সারাবছর এলাকাটি শুষ্ক ছিল। যে তাপপ্রবাহ চলছে এতে এই এলাকা এমনিতেই তীব্র তাপের প্রভাবে ছিল। তার ওপর এই আগুন বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।

তিনি মনে করেন, সুন্দরবনের যারা বনজীবী তারা ইচ্ছাকৃতভাবে আগুন লাগাতে পারে না। তবে কিছু দুষ্কৃতকারী যারা ভেতরের জলাশয়ে মাছ ধরে তাদের যোগসাজশ থাকতে পারে। এই আগুনের কারণে বড় প্রভাব পড়তে পারে অজগরের ওপর। কারণ এই প্রাণীটি ধীরে চলে। এছাড়া কীটপতঙ্গ এবং ক্ষুদ্র প্রাণী যারা দ্রুত চলাফেরা করতে পারে না তারা ক্ষতির মুখে পড়বে। বাঘ, শূকর, হরিণ তারা দ্রুত সরে যেতে পারে; তাই তাদের ক্ষতির সম্ভাবনা কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ফিরোজ জামান বলেন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনে সাধারণত আগুন লাগার সুযোগ কম। কারণ সারাবছর এতে পানি থাকে। এই বনে ঝরা পাতা কম থাকে। আর এখানকার ফরেস্ট ট্রিতেও আগুন ধরে না। কোনো দুষ্কৃতকারী এটি করেছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার। 

তিনি আরো বলেন, বন বিভাগকে আরো সতর্ক হতে হবে। পাহারা জোরদার করতে হবে। ম্যানগ্রোভ বন না থাকলে ঝড়-ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের ক্ষয়ক্ষতি বেড়ে যাবে। কত এলাকায় আগুন ছড়িয়েছে তা দেখতে হবে। আগুনের কারণে সুন্দরী ও কেওড়ার মতো গাছ ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। 

ছবি:ডেইলি বাংলাদেশ

তিনি বলেন, বাঘ নির্দিষ্ট এলাকায় বিচরণ করে। এই এলাকায় যে বাঘগুলো ছিল সেগুলো এখন বনের অন্য পাশে চলে যেতে বাধ্য হবে। এতে খাদ্য শিকারে তারা সমস্যায় পড়তে পারে। কারণ বাঘের শিকার হরিণ, শূকর, শজারুসহ বিভিন্ন ছোট-বড় প্রাণী এই এলাকা থেকে সরে যেতে পারে। যেহেতু বনের ওই এলাকায় একটি দুর্যোগ ঘটেছে, তাই সহসা এই এলাকায় ফিরে আসতে চাইবে না বাঘ, হরিণসহ বন্য প্রাণীরা। শিকারি প্রাণী কমে গেলে বাঘের খাদ্যের অভাব হবে। আর বাঘ বেশিদিন ক্ষুধার্ত থাকলে লোকালয়েও তাদের শিকার খুঁজতে আসার আশঙ্কা রয়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সুন্দরবন গবেষক মনিরুল হাসান খান বলেন, যতদিন আগুনের ক্ষয়ক্ষতি থাকবে ততদিন আগুন লাগা বনে বন্য প্রাণীর আনাগোনা থাকবে না। তবে শোনা যায়, বিভিন্ন কারণে ইচ্ছে করেই আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। যেসব প্রাণী চলাচল করতে পারে তারা দ্রুত সরে গিয়ে রক্ষা পেতে পারে। তবে উদ্ভিদসহ নিম্ন শ্রেণির যে প্রাণীগুলো রয়েছে; যেমন- পোকামাকড়, শামুক, সরীসৃপ ইত্যাদি প্রাণী এ ধরনের আগুনে বেশিই মারা পড়ে। এছাড়া আগুনের ঘটনা থেকে বন ও বন্যপ্রাণীকে রক্ষায় ম্যানগ্রোভকে আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে। 

এদিকে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক নাগরিক সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা-(ধরা)’ এবং ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’। ধরার সদস্য সচিব শরীফ জামিল এবং ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’-এর সমন্বয়ক নূর আলম শেখ এই যুক্ত বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন।

ধরার সদস্য সচিব শরীফ জামিল বলেন, প্রতি বছরই এই সময়ে সুন্দরবনে অগ্নিকাণ্ড হচ্ছে। এখানে বিভিন্ন চক্র রয়েছে যারা এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত থাকে। আমরা মনে করি, সুন্দরবনের এই ধরনের অগ্নিকাণ্ড কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এই ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে বন বিভাগকে আরো সচেষ্ট হতে হবে।

‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়ক নূর আলম শেখ বলেন, পরিবেশকর্মী, সংবাদকর্মী, গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের মতামত উপেক্ষা এবং অতীতে সংগঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন না করার কারণেই সুন্দরবনের আমরবুনিয়া এলাকায় চার বছর পরে আবারো অগ্নিকাণ্ড সংগঠিত হলো। সুন্দরবন সংরক্ষিত বনাঞ্চল হলেও আমরবুনিয়া টহল ফাঁড়ি অঞ্চলে চোরা শিকারিসহ মানুষের অবাধ যাতায়াত রয়েছে। সুন্দরবনের পরিকল্পিত অগ্নিকাণ্ড বন্ধে বনবিভাগসহ সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!