জানা যায়, উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের নিয়ে একীভূতকরণ শিক্ষা বিষয়ক প্রশিক্ষণে সদর উপজেলার ১৫টি বিদ্যালয়ের ৩০ জন শিক্ষক অংশ নেন। তাদের মধ্যে ৬ জন শিক্ষক ও ২৪ জন শিক্ষিকা। পাঁচ দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণের শেষদিন ছিল গত ৮ মে। ওইদিন ১২টার দিকে নাস্তায় বনফুলের স্যান্ডউইচসহ আপেল ও সন্দেশের ব্যবস্থা ছিল। নাস্তা খাওয়ার পর বিকেল থেকেই অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক শিক্ষক-শিক্ষিকা বমিসহ পেটের ব্যথা, ডায়রিয়া ও প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। বাকিদের মধ্যে কয়েকজন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। অনেক শিক্ষক তাদের স্যান্ডউইচ ভাগ করে বাড়িতে থাকা বাচ্চাদের খাওয়ালে কয়েকজন বাচ্চাও অসুস্থ হয়ে যায়।
তারা বলছেন, বনফুলের স্যান্ডউইচ খেয়েই তাদের এই সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং বনফুল কর্তৃপক্ষদের জানানোর পরও কেউ হাসপাতালে তাদের কোনো খোঁজ খবর নেয়নি।
.png)
হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের ডায়রিয়া ইউনিটে অসুস্থ হয়ে ভর্তি রয়েছেন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষিকা। কেউ হাসপাতালে ডায়রিয়ায় ২৫ থেকে ৩০ বার টয়লেট করেছেন ও পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। আবার কেউ স্যালাইন নিয়ে শুয়ে আছেন। অসুস্থদের মধ্যে ৭ জন শিক্ষক জেলা সদর হাসপাতালে এখনো ভর্তি রয়েছেন এবং কয়েকজন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তিকৃতদের মধ্যে দুইজনের খুবই খারাপ অবস্থা দেখা গেছে।
৮৮নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান বলেন, প্রশিক্ষণে আমিও সবার সঙ্গে অংশগ্রহণ করি। নাস্তায় আপেল, ছানা ও স্যান্ডউইচ দেওয়া হয়। মূলত বনফুলের স্যান্ডউইচ খাওয়ার পর বিকেল থেকে আমার পেট ব্যথা, জ্বর ও ডায়রিয়া শুরু হয়। ওইদিনই রাতে আমি হাসপাতালে ভর্তি হই। আমি এখন মোটামুটি সুস্থ। তবে বনফুল দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি। তাদের খাবারে যদি এমন হয় তাহলে আর কী বলার আছে। আমরা সুস্থ হয়ে ও আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরামর্শ করে বনফুলের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
পশ্চিম দাশড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শামছুন্নাহার জানান, আমাদের শারীরিক অবস্থা এতটাই খারাপ যে আজ চারদিন ধরে সোজা হয়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা নেই। চারদিন ধরে ১টার পর একটা স্যালাইন চলছে। ডাক্তাররা কোনোভাবেই আমাদের এই অবস্থার উন্নতি করতে পারছেন না। না আমাদের টয়লেট কমাতে পারছেন, না পেটের ব্যথা। এই খাবার খেয়ে আমাদের জীবন বিপন্ন। আমরা মারা যেতেও পারতাম। অতিরিক্ত দুর্বল হওয়ার কারণে সুস্থ হওয়ার পর শরীর এত দুর্বল হয়ে পড়েছে যে কিভাবে আমরা স্কুলে ক্লাস নেব বুঝতে পারছি না। আমাদের চাকরি ও জীবন নিয়ে টানাটানি দেখা দিচ্ছে।
মত্ত বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রাওফুন্নাহার জানান, বনফুল একটি নামিদামী ব্যান্ড বলেই মানসম্মত খাবারের আশায় বনফুল থেকে আমরা খাবার অর্ডার করেছি। তারা যদি মানসম্মত খাবার না দিতে পারে তাহলে খাবার বিক্রি করার কোনো মানেই হয় না। আর তাদের স্যান্ডউইচ খেয়ে ৩০ জন শিক্ষক ও দুইজন বাচ্চা আজ হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। তাদের কঠিন শাস্তি দাবি করছি।
কর্ণেল এ মালেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মহব্বত খান জানান, উপজেলা রিসোর্স সেন্টারে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের নিয়ে ৩০ জনের একীভূতকরণ শিক্ষা বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ ছিল। ৮ মে প্রশিক্ষণে ১২টার দিকে নাস্তায় আপেল, ছানা ও স্যান্ডউইচের ব্যবস্থা ছিল। মূলত নাস্তা খেয়েই আমরা জ্বর, পেটে ব্যথা ও ডায়রিয়া নিয়ে বিকেলের পর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হই।
জেলা সদর হাসপাতালের চিকিৎসক শাহরিন জানান, অসুস্থ শিক্ষকরা পেট ব্যথা, বমির উপসর্গ ও জ্বর নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। ধারণা করা হচ্ছে, তাদের কোনো খাবার থেকেই এ সমস্যা হয়েছে।
এ ব্যাপারে বনফুল মানিকগঞ্জ আউটলেটের ব্যবস্থাপক মো. নুরুজ্জামান জানান, ওই দিন শিক্ষকরা ৩২ পিস স্যান্ডউইচ অর্ডার করেছিলেন। শিক্ষকদের অসুস্থতার বিষয়টি আমাদের কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আসলে কিভাবে কী হলো আমরা বুঝতে পারছি না।