সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জেলার সঙ্গে ফরিদপুরের চরাঞ্চলে এই সাপের বিচরণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বেশ কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে এতে। ফরিদপুরের চরাঞ্চলে রাসেল ভাইপার সাপের ভয়ে কৃষি শ্রমিক মিলছে না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এবার শহরেও এই সাপ মেরে ফেলার খবরে নতুন আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
শহরের উত্তর-পূর্বাংশে চাঁদমারি এলাকাটি শহরের প্রাণকেন্দ্রের পাশেই অবস্থিত। সেখানে আগে জনবসতি কম থাকলেও গত কয়েকবছরে ব্যাপকহারে জায়গাজমি বিক্রি ও জনবসতি গড়ে উঠেছে। এমন একটি ব্যস্ততম বসতি এলাকায় রাসেল ভাইপার সাপের মতো ভয়ংকর বিষধর সাপের উপস্থিতির খবরে শহরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝেও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষত যখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই বিষধর সাপের খবর পাওয়া যাচ্ছে।
.png)
জানা গেছে, শহরের কমলাপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের পাশে থেকে বৃহস্পতিবার দুপুরে একটি রাসেল ভাইপার সাপ দেখতে পেয়ে সেটি মেরে ফেলা হয়েছে, ফেসবুকে ওই মৃত সাপটির একটি ছবি আপলোড করে এমন একটি পোস্ট দেন মশিউর রহমান নামে জনৈক এক ব্যক্তি। সেখানে শাওন ভুঁইয়া নামে এক ব্যক্তি রাসেল ভাইপার সাপককে এখন জাতীয় দুর্যোগের অন্তর্ভুক্ত করে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেয়া অতীব জরুরি বলে মন্তব্য করেন।
তবে এ বিষয়ে মশিউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, ইসহাক নামে একজনের ফেসবুক ওয়ালে ছবিটি পেয়ে তিনি পোস্ট করেন। এরপর ইসহাকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও তার পরিচিত এক ছোট ভাইয়ের ফেসবুক ওয়ালে দেখে ছবিটি পোস্ট করেন। এরপর তার ওই পরিচিত ছোট ভাইয়ের মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সেও আরেকজনের ফেসবুকে দেখে ছবিটি পোস্ট করেছিলেন।
খবরের সত্যতা জানতে কমলাপুরের বায়তুলআমান নিবাসী মাসুম মোল্লা (৪৩) নামে এক যুবকের যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, বৃহস্পতিবার সকালে চাঁদমারির বিলুপ্ত ফায়ারিং স্কোয়াডের পাশে পরিত্যক্ত মাঠের মধ্যে সাপটি দেখতে পান স্থানীয় একজন মহিলা। তার চিৎকার শুনে স্থানীয়রা এসে সাপটি পিটিয়ে মেরে ফেলে। তবে কে বা কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন সেটি তিনি নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না।
এ বিষয়ে জানতে ফরিদপুর পৌরসভার ২২ নম্বর ওয়ার্ডভুক্ত ওই এলাকার কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম মৃধা এবং সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর তানিয়া আক্তার ইভা ফরিদপুরের বাইরে থাকায় তারা কিছু জানেন না বলে জানান।
ফরিদপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র মনিরুল ইসলাম বলেন, শহর এলাকায় এই সাপের বিচরণের খবর পাওয়া যায়নি। যদি এমন কোন খবর পাওয়া যায়, সেটি নতুন উদ্বেগের বিষয়। এ ব্যাপারে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
স্থানীয়রা জানান, এর আগে সাপটি ফরিদপুরের সদর, চরভদ্রাসন, সদরপুর ও ভাঙ্গা উপজেলার চরাঞ্চলেই দেখা গেছে। যদিও শহরের উপকণ্ঠে পদ্মাবতী ধলারমোড় এলাকায় রুবেল হোসেন নামে এক যুবক চার বছর আগে একটি রাসেল ভাইপার সাপ জীবিত অবস্থায় ধরেছিলেন। তবে শহরের কোনো এলাকায় এই রাসেল ভাইপারের দেখা মেলার খবর এবারই প্রথম পাওয়া গেল ফেসবুকে। এর সত্যতা পাওয়া গেলে সেটি শহরবাসীর জন্য নতুন উদ্বেগের বিষয়।
ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ মো. রফিকুল ইসলাম এ অবস্থায় রাসেল ভাইপারের উপদ্রব থেকে বাঁচতে কৃষকদের ক্ষেতে মশার কয়েল জ্বালিয়ে কাজ করতে পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ধোঁয়া সাপের চোখে গেলে সেখান থেকে দ্রুত তারা সরে যায়। কৃষকরা এ পদ্ধতি ব্যবহার করে সফলও হচ্ছে। তাছাড়া চাষিদের সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
যেসব জেলায় রাসের ভাইপার ছড়িয়েছে
রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, জয়পুরহাট, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ি ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, ঢাকা, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, ঝালকাঠি জেলায় ছড়িয়ে রাসেল ভাইপার।
রাসেল ভাইপার কেন আতঙ্কের কারণ
এটিই একমাত্র বিষধর সাপ, যে বাচ্চা দেয়। প্রতিবারে জন্ম নেয় ৪০ থেকে ৫০টি বাচ্চা। কোনো কোনো সাপ ৮০টি পর্যন্ত বাচ্চা দিতে পারে। এই সাপের কামড়ে দেড় বছরে শুধু রাজশাহী মেডিকেলেই মারা গেছেন অন্তত ১৮ জন। এ সময়ে ওই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬৮ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও অতিরিক্ত গরম অনুভূত হচ্ছে। আর নদীর পানির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এমন পরিবেশ রাসেল ভাইপারের বেঁচে থাকার ও বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত।’
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
স্বাস্থ্য অধিদফতরের এনসিডিসির লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক রোবেদ আমিন বলেন, ‘এরই মধ্যে ৫০টি রাসেল ভাইপার সংগ্রহ করা হয়েছে। এন্টি ভেনম তৈরির গবেষণা চলছে। বর্তমানে এই সাপে কাটলে ভারতে তৈরি এন্টি ভেনম দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, ‘নিজস্ব সাপের বিরুদ্ধে যখন নিজস্ব অ্যান্টি ভেনম তৈরি হবে, তখন আমরা বলতে পারব আমরা এই সাপে কাটা রোগীদের সঠিক সেবা দিতে পারছি। এর আগ পর্যন্ত আমাদের ভারতের অ্যান্টিভেনমের ওপর ভরসা করে থাকতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘অ্যান্টিভেনম উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত দেওয়া আছে। যেসব এলাকায় সাপের উপদ্রব বেশি, সেসব জায়গায় সংরক্ষিত আছে। এনসিডির (নন কমিউনিকেবল ডিজিজ) সঙ্গে যোগাযোগ করলে সেটি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।’