ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

টাকা পেলেই রোহিঙ্গাদের জন্ম সনদ বানিয়ে দিতেন ইউপি সচিব

হুমায়ুন কবির রনি, কুমিল্লা
প্রকাশিত: ১৫:০৫, ২২ জুন ২০২৪
টাকা পেলেই রোহিঙ্গাদের জন্ম সনদ বানিয়ে দিতেন ইউপি সচিব
গ্রেফতারকৃত ইউপি সচিব ইসমাইল হোসেন ও নছরুল্লাহ

কুমিল্লার মুরাদনগরে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে রোহিঙ্গা যুবকের জন্য জন্ম সনদ তৈরির অভিযোগে উপজেলার ১৩ নম্বর সদর ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ইসমাইল হোসেনসহ দুইজনকে গ্রেফতার করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। অভিযোগ রয়েছে- মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে ভুয়া ঠিকানায় রোহিঙ্গাদের জন্ম সনদ তৈরি করে দিতেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (২০ জুন) সন্ধ্যায় কোম্পানীগঞ্জ-মুরাদনগর সড়কের নিমাইকান্দি এলাকা থেকে ইসমাইলকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতারকৃত ইসমাইল কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার গুনাইনন্দী গ্রামের বাচ্চু মিয়ার ছেলে। এর আগে, বুধবার (১৯ জুন) সন্ধ্যায় মুরাদনগর থানার বাখরগঞ্জ বাজার থেকে নছরুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। 

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রাজেশ বড়ুয়া। 

Advertisement

জানা যায়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লা আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে মুরাদনগর উপজেলার পশ্চিম ঘোড়াশাল ৪ নম্বর ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা জাকির হোসেন ও হাসিনা বেগমের ছেলে হিসেবে ভুয়া জন্ম সনদ দিয়ে পাসপোর্ট করতে আসেন ইয়াছির নামে এক রোহিঙ্গা যুবক। ঐ সময় রোহিঙ্গা হিসেবে সন্দেহ হলে পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তারা তার নাম-ঠিকানা জিজ্ঞেস করলে তা সঠিকভাবে বলতে পারেননি। পরে তাকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনায় কোতয়ালী থানায় একটি মামলা করে গোয়েন্দা পুলিশ। মামলার পর রোহিঙ্গা যুবক কীভাবে জন্ম সনদ সংগ্রহ করেছে, এ বিষয়ে তদন্তে নামে গোয়েন্দা পুলিশ। 

রোহিঙ্গা যুবক ইয়াছিরের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে ওঠে আসে ভুয়া জন্ম নিবন্ধনসহ পাসপোর্ট তৈরিতে সহযোগিতাকারী চক্রের সদস্যদের নাম। গ্রেফতার করা হয় রোহিঙ্গা যুবক ইয়াসির, শরিফ, মোশাররফ ও হাসান মাহমুদসহ চারজনকে।  

ঘটনার ২০ দিন আগে ঐ রোহিঙ্গা যুবক মিয়ানমার বলিবাজার নামক স্থান থেকে কক্সবাজার বালুখালি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আসেন। মিয়ানমারে বলিবাজারে থাকা তার চাচাতো ভাই ওসমান কুমিল্লা পাসপোর্ট অফিস সংলগ্ন মদিনা ট্রাভেলসের হাসান মাহমুদ ও মোশাররফ নামে ২ দালালের কাছে পাসপোর্ট করার চুক্তি করে। পরে চুক্তি অনুযায়ী হাসান মাহমুদ ও মোশাররফ কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার পশ্চিম ঘোড়াশাল গ্রামের ভুয়া ঠিকানায় রোহিঙ্গা যুবক ইয়াছিনের সব কাগজপত্র তৈরি করে দেন।

এরই মধ্যে গত বুধবার (১৯ জুন) সন্ধ্যায় এ কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে নছরুল্লাহকে গ্রেফতার করা হয়। বৃহস্পতিবার (২০ জুন) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি। তার দেওয়া জবানবন্দিতে বের হয়ে আসে আরো চাঞ্চল্যকর তথ্য। মদিনা ট্রাভেলসের মালিক হাসান মাহমুদ রোহিঙ্গার ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরি করে দেওয়ার জন্য নাছরুল্লাহকে জানান। এরপর হাসান মাহমুদ ও নাছরুল্লাহ মিলে ইউপি সচিব ইসমাইলের সঙ্গে কথা বললে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে জন্ম নিবন্ধন করে দেন। 

নাছরুল্লাহ আরো জানান, এর আগেও পাঁচ রোহিঙ্গার ভুয়া জন্ম নিবন্ধন করেছেন ইউপি চেয়ারম্যান কাজী মো. তুফরীজ ও ইউপি সচিব ইসমাইল হোসেনের মাধ্যমে। রোহিঙ্গাদের ভুয়া জন্ম সনদ তৈরির কাজে মুরাদনগর উপজেলার ১৩ নম্বর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান কাজী মো. তুফরীজ জড়িত আছে বলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি।  

নছরুল্লাহ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (২০ জুন) রাতে ইউপি সচিব ইসমাইল হোসেনকে গ্রেফতার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের কাছে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে ভুয়া জন্ম সনদ দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন তিনি। এ ছাড়া আগেও ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বিনিময়ে ৫-৬টি ভুয়া জন্ম সনদ করে দিয়েছেন বলেও স্বীকার করেন। 

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান কাজী মো. তুফরীজ বলেন, গত ফেব্রুয়ারিতে আমাদের সার্ভার হ্যাক হয়েছিল। আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আর আমার ইউপি সচিব যদি জড়িত থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। 

কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের ওসি রাজেশ বড়ুয়া জানান, রোহিঙ্গা যুবককে জন্ম সনদ দেওয়ার মামলায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে ইউপি সচিব ইসমাইলকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুক্রবার (২১ জুন) দুপুরে তাকে আদালতে পাঠানো হয়।

মুরাদনগর ইউএনও সিফাত উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গা যুবকের জন্ম নিবন্ধন তৈরি সংক্রান্ত সরকারি মামলায় ইউপি সচিবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/এসআরএস
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!