ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

লবণাক্ততার কবলে দেড় হাজার হেক্টর কৃষিজমি

এম. পলাশ শরীফ, মোরেলগঞ্জ (বাগেরহাট)
প্রকাশিত: ১৫:০৮, ২৬ জুন ২০২৪
লবণাক্ততার কবলে দেড় হাজার হেক্টর কৃষিজমি
পানিতে ডুবে গেছে এলাকা। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

পানগুছি নদীর তীরবর্তী বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার ৪ লাখ মানুষ, দেড়লাখ গবাদিপশু ও আড়াই লাখ হাস-মুরগি জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে হুমকির মুখে পড়েছে। লবণাক্ততার কারণে ধান উৎপাদন বন্ধ রয়েছে প্রায় দেড় হাজার একর জমিতে। উৎপাদন কমেছে মৌসুমি শাক-সবজির।

জানা গেছে, মোরেলগঞ্জ সদর ইউনিয়ন ও পৌরসভাসহ নদীর তীরবর্তী সাতটি ইউনিয়নের কয়েক হাজার বসতবাড়ি, গাছপালা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান, বহু জনগুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট বিলীন হয়েছে পানগুছির ভাঙনে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদী ভাঙন ও লবণপানির প্রভাবে মোরেলগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৪ লাখ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসে ভোগান্তির শিকার ৯০ হাজার গরুসহ দেড়লাখ গবাদিপশু ও আড়াই লাখ হাস-মুরগি।

লবণাক্ততার কারণে প্রকৃতিক খাবার কমে গেছে এসব প্রাণীর। জলাবদ্ধতার কারণে গৃহপালিত পশুপাখি রোগবালাই ও অকাল মৃত্যুর শিকার হচ্ছে। দেশীয় জাতের গরু, মহিষ, হাস ও মুরগির সংখ্যা কমেছে আশঙ্কাজনক হারে। মাঠ ও খালবিল থেকে আত্মঘাতি ড্রিল ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন, নিয়ন্ত্রণহীন ইটভাটা, করাতকল, খাল ভরাট ও দখল করে মাছের ঘের করে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়ায় ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি এ উপজেলার সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।

Advertisement

এ উপজেলার বিভিন্ন খালের পানি নিয়ন্ত্রণের জন্য সাতটি স্লুইচগেট রয়েছে। তবে এর একটিও সচল নেই। এ উপজেলায় আবাদি জমি রয়েছে ৩৩ হাজার ১৫০ হেক্টর। তবে লবণাক্ততার কারণে মোরেলগঞ্জ সদর, বহরবুনিয়া, বারইখালী ও জিউধরা ইউনিয়নে ধান ফসল উৎপাদন কমে এসেছে। স্থায়ী বেড়িবাঁধ হলে কমপক্ষে ১ হাজার হেক্টর ফসলি জমিতে ধান আবাদ বৃদ্ধি পাবে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল জাবির বলেন, উপকূলীয় এ উপজেলায় দুর্যোগ সহনীয় ৮৩টি সাইক্লোন শেল্টার রয়েছে। এর সংখ্যা আরো বৃদ্ধির জন্য অধিদফতরে চাহিদা পাঠানো হয়েছে। বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া পরিবারগুলোকে খুঁজে বের করে তাদেরকে সরকারিভাবে পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বারইখালী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য মিজানুর রহমান বিপু বলেন, ঘূর্ণিঝড় রেমালে আটটি মিষ্টিপানির পুকুর ডবে গেছে। খাবার পানি ৫ কিলোমিটার দূর থেকে এনে খেতে হচ্ছে। শরীফবাড়ির পুকুরটিও লবণ পানি ঢুকে খাবার অনুপযোগী হয়েছে। বর্তমানে সেচ দেওয়া হয়েছে। গ্রামের প্রায় ১ হাজার মানুষ খাবার পানির জন্য হাহাকার করছে।

পানিতে ডুবে গেছে মোরেলগঞ্জের বিভিন্ন এলাকানিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আব্দুর রহিম মৃধা বলেন, আমাদের গ্রামে সুপেয় পানি পাওয়া এখন দুষ্কর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েকটি মিষ্টিপানির পুকুরের পানি ময়লা পড়ে নষ্ট হয়ে গেছে। ভাসছে বিভিন্ন প্রাণীর মরদেহ। পানি ক্রয় করে খেতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ সিডর আইলা, আমফান ও সর্বশেষ ঘূর্ণিঝর রেমালে মোরেলগঞ্জে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। অনাবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন ও লবণাক্ততা দিন দিন বাড়ছে। ফলে ফসলহানি, সুপেয় পানির সংকট ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। নদীভাঙনে বদলে যাচ্ছে উপজেলার মানচিত্র। অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে স্বাস্থ্যসেবাও রয়েছে ঝুঁকির মধ্যে। নদী ভাঙনের ফলে কর্মসংস্থানের তাগিদে শহরমুখী হয়েছে কয়েক হাজার পরিবার।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য অধিদফতরের উপসহকারী প্রকৌশলী কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের সুপেয় পানি ব্যবহারে ভূ-তলদেশ থেকে পানি উত্তোলন না করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পানির ট্যাংকি বিতরণ করা হচ্ছে। এই উপকূলীয় অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামে নিরাপদ পানি ব্যবহারের জন্য সরকারি বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি করে জলাধার স্থাপন করতে পারলে স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা পাবেন উপকূলীয় বাসিন্দারা।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব কাটিয়ে উঠতে হলে এলাকাভিত্তিক বন্যা, খরা ও লবণসহিষ্ণু জাত ব্যবহার করতে হবে। পলি পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়া খালগুলো পুনঃখনন পর্যাপ্ত স্লুইচগেট নির্মাণ, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, রবি ফসলের জন্য ক্ষুদ্র পুকুর খনন, বৃক্ষ রোপন ও নালা পদ্ধতিতে উঁচু জমিতে চাষাবাদ বৃদ্ধি করতে হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম তারেক সুলতান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে এরইমধ্যে উপজেলার ৪টি ইউনিয়নে লজিক প্রকল্পের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ কাজ করছে। ঘষিয়াখালী থেকে মোরেলগঞ্জ শহর হয়ে সন্ন্যাসী পর্যন্ত বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প একনেকে পাস হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, বেড়িবাঁধ হলে লবণাক্ততা দূর হবে এবং ফসল উৎপাদন বাড়বে। এতে এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে পরিবর্তন আসবে। আর বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে কাবিটা প্রকল্পের মাধ্যমে সরকারের ২৫ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নে লক্ষে ২০২৩ সালে উপজেলার ১৬ ইউনিয়নের রাস্তার দুই পাশে ১৫ হাজার তালের চারা রোপণ করা হয়েছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!