২০০২ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো বয়েই বেড়াচ্ছে জেলার ১২ উপজেলার যোগাযোগ সড়কসহ গ্রামীণ সড়কগুলো। এরইমধ্যেই এবার দুইদফা বন্যার চাপ গেছে সবকয়টি সড়কের ওপর দিয়ে। তাতে এই জেলার প্রায় ২৭ লাখ মানুষ চরম যোগাযোগ দুর্ভোগে পড়েছেন।
গ্রামীণ জনপদের অনেক এলাকাতেই এখন না চলছে সড়কযান, না নৌযান। পায়ে হেঁটে যাওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। অসুস্থ, বয়স্ক ও শিশুদের যাতায়াত ভোগান্তি অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
.png)
দুই বছর আগে ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বড় সড়কগুলোর মধ্যে দোয়ারাবাজার-বাউর কাপন, কালীপুর -পাগলা- জগন্নাথপুর, জামালগঞ্জ -জয়নগর, জামালগঞ্জ-সেলিমগঞ্জ, দোয়ারাবাজার-বাংলাবাজার, পাথারিয়া-বাংলাবাজার, দিরাই-কলকলিয়া, বিশ্বম্ভরপুর-আনোয়ারপুর, সুনামগঞ্জ-বেতগঞ্জ সড়কে এখনো কাজ করতে পারেনি এলজিইডি।
একইভাবে গোবিন্দগঞ্জ-ছাতক-দোয়ারাবাজার, নিয়ামত-তাহিরপুর, মদনপুর-দিরাই ও শাল্লা এবং পাগলা জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ আউশকান্দি সড়কসহ জনগুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়ক থেকে দুই বছর আগের বন্যার ক্ষত সারাতে পারেনি সড়ক বিভাগও। এর মধ্যেই এবারও দু’দফা বন্যায় এসব সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়া এলজিইডির প্রায় ৪০০ কোটি টাকার কাঁচা পাকা গ্রামীণ সড়ক এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগের ২৪৯ কোটি টাকার সড়ক পাহাড়ি ঢলে পানিতে নিমজ্জিত হয়ে চলাচল অনুপযোগী হয়েছে।
সুনামগঞ্জ-বেতগঞ্জ সড়কে সরেজমিন দেখা গেছে, বন্যার পানি নামলেও দুর্ভোগ কমেনি।
বেতগঞ্জের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট মোশাহিদ আলী বলেন, ২০২২’এর বন্যার ক্ষত এখনো রয়েছে সড়কজুড়ে, বয়স্ক মানুষ, সন্তান সম্ভবা নারী নিয়ে এই পথে চলা দায়। এরমধ্যে এবারের বন্যায় আরো ভেঙেছে। এখন কীভাবে চলবে মানুষ?
আলমপুরের সিএনজি চালক মনির মিয়া বলেন, গাড়ি নিয়ে এই সড়কে আসলে ভাড়া যা পাওয়া যায়, গাড়ির কাজ করাতে এর চেয়ে বেশি টাকা লাগে। এই সড়কে একদিন চালালে, পরদিন নানা ক্রুটি সারাতে ওয়ার্কশপ নিয়ে যেতে হয় গাড়ি, আমরা আসতে চাই না, লাইন ধরে রাখার জন্য এবং পরিচিত মানুষের চাপাচাপিতে আসা লাগে।
শহরের ধারারগাঁও-নতুন ব্রাহ্মণগাঁও সড়কে নয়টি ভাঙন দেখা দেওয়া ছাড়াও পুরো সড়কের ওপরে ঢালাই ওয়াস আউট হয়েছে এবার। এই সড়ক দিয়ে পায়ে হেঁটে চলার কোনো উপায় নেই। নৌকার পথও নেই। সড়কে চলাচলকারী লক্ষাধিক মানুষ বিপাকে পড়েছেন।
স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাও গ্রামীণ যোগাযোগ সড়ক নিয়ে পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।
কোরবাননগর ইউপি সদস্য আব্দুল কাইয়ুম বলেন, রঙ্গারচর, দোয়ারাবাজারের বাংলাবাজার ইউনিয়নের একাংশের মানুষসহ কোরবাননগর ইউপির একটি ওয়ার্ডের মানুষের যোগাযোগ পথ এই সড়ক। ২০২২ সালের বন্যায় সড়কটির মাটিসহ ঢলের পানিতে ভেসে গিয়েছিল। দুই মাস আগে কোটি টাকা ব্যয়ে মেরামত করে চলাচল উপযোগী করা হয়। ২০২৪ সালের বন্যায় পাহাড়ি ঢলের চাপ সুরমা নদী নিতে না পারায় এই সড়ক স্থানে স্থানে ভেঙে পানি ঢুকছে ছোট ছোট হাওরে। ভেসে গেছে অনেক কাঁচা সড়ক। আমন চাষাবাদ নিয়েও দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মানুষ।
সুনামগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, এবারের দুই দফা বন্যায় সড়কের, বিশেষ করে গ্রামীণ সড়কের যে ক্ষতি হয়েছে মেরামত করতে কমপক্ষে চারশ কোটি টাকা লাগবে। এর আগের ২০২২’এর বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কিছু সড়কের এরইমধ্যে কাজ হয়েছে। বাকী যেগুলো এখনো হয়নি, সেগুলো মেরামত বা পুনর্নির্মাণ করতে আরো চারশ কোটি টাকা প্রয়োজন।
একইভাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপজেলা সড়কসহ আঞ্চলিক মহাসড়কেরও ক্ষতি হয়েছে জানিয়ে এই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম জানান, ২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক মেরামত করার জন্য একটি প্রকল্পে ১৭শ’ কোটি টাকার কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এবার যে ক্ষতি হয়েছে, সেই সড়ক চালু রাখার জন্য ১৯ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করছেন, বন্যা মোকাবিলায় পরিকল্পিত উদ্যোগ, বিশেষ করে নদী থেকে হাওরে পানি নামার সংযোগ খাল আবার হাওর থেকে নদীতে পানি নামার সংযোগ খালগুলো সচল না করলে প্রকৃতির প্রতিশোধে প্রতি বছরই পড়বো আমরা। সড়ক বাঁধ ভেঙে প্রতিবছরই ক্ষয় ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে।