ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

কাসাভা চা‌ষে সর্বনাশ হচ্ছে পাহাড়ের

মো. এনামুল হক, খাগড়াছ‌ড়ি
প্রকাশিত: ১৭:৩৭, ২৮ জুলাই ২০২৪
কাসাভা চা‌ষে সর্বনাশ হচ্ছে পাহাড়ের
কাসাভা চা‌ষ। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

দিনদিন খাগড়াছ‌ড়ির সবুজ পাহা‌ড়ের বনভূ‌মি উজার ক‌রে সম্প্রসারিত হচ্ছে ভিনদেশি ফসল কাসাভা চাষ। এতে প্রাকৃ‌তিক ভারসাম‌্য নষ্ট হ‌চ্ছে, ধ্বংস হ‌চ্ছে জীববৈচিত্র, নি‌চে নাম‌ছে পানির স্তর। উর্বরতা হারা‌চ্ছে হাজার হাজার হেক্টর পাহাড়ের জমি, বাড়‌ছে মা‌টির ক্ষয় এবং ঘট‌ছে পাহাড় ধসের ঘটনা। কৃ‌ষি বিষেজ্ঞদের ম‌তে, পাহাড়ে জুম চাষের চেয়েও ভয়ংকর ক্ষতি বয়ে আনছে কাসাভা চাষ।

প্রাণ আরএফএল গ্রু‌পের প্রাণ এগ্রো বিস‌নেস লি‌মি‌টেড ও রহমান কেমিক্যালস লিমিটেড নামে দুটি প্রতিষ্ঠান সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার প্রলোভনে আং‌শিক সহায়তাদানের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক কাসাভা চাষে উৎসাহ জোগাচ্ছে গরিব লোকদের। অন্যদিকে, চু‌ক্তির শিকলপড়া‌নো ওই কোম্পানি দুটির কা‌ছে তা‌দের নির্ধারিত দামই কাসাভা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে চাষিরা। ফলে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকার রহমান কেমিক্যালস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান পার্বত্য এলাকায় সর্বপ্রথম কাসাভার চাষাবাদ শুরু করে। পরবর্তীকালে ২০১৬ সাল হতে প্রাণ আরএফএল গ্রু‌পের প্রাণ এগ্রো বিস‌নেস লি‌মি‌টেড কাসাভা চাষ শুরু করে। কাসাভা চাষে দুটি কোম্পানি চাষিদের একর প্রতি ১৬ থে‌কে ২০ হাজার টাকা সুদমুক্ত ঋণ দেয়। চা‌ষি‌দের একরপ্রতি খরচ হয় ৩৫ থে‌কে ৪০ হাজার টাকা। একজন ম‌হিলা শ্রমি‌কের ‌দৈ‌নিক মুজু‌রি ৩৫০ টাকা এবং পুরুষের মুজু‌রি ৫০০ টাকা। উৎপাদিত কাসাভা চু‌ক্তি মোতা‌বেক তাদের নির্ধারিত মূল্যে কে‌জি প্রতি ১০ টাকা হা‌রে চাষিদের নিজ দা‌য়ি‌ত্বে ‌সি‌লেট হ‌বিগঞ্জ (সংশ্লিষ্ট কোম্পানির কারখানায়) পৌঁছে দি‌তে হয়। গত বছর ৯ টাকা ৫০ পয়সা হ‌ারে ‌দেওয়া হ‌য়ে‌ছে কৃষক‌দের। কাসাভা গ্লুকোজ, বার্লি, সুজি, স্টার্স, চিপসসহ বেকারি সামগ্রী এবং ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

Advertisement

খাগড়াছ‌ড়ি‌তে ঠেংগা আলু বা শিমুল আলু নামে অধিক পরিচিত কাসাভা চাষাবাদ শুরু হয় প্রায় দেড় দশক আগে। প্রথমদিকে সীমিত আকারে চাষ হলেও দিন দিন ব্যাপকহারে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে এ কাসাভার চাষ। খাগড়াছড়ির রামগড়, মানিকছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি, মহালছ‌ড়ি, গুইমারা, মাটিরাঙ্গা, দী‌ঘিনালা, পানছ‌ড়ি ও খাগড়াছ‌ড়ি সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় হাজার হাজার একর বনভূমি উজার ক‌রে পাহাড়ি টিলা ভূমিতে কাসাভার চাষ হচ্ছে। এতে প্রকৃতি তার ভারসাম‌্য হারা‌চ্ছে, জীববৈ‌চিত্র ধ্বংস হ‌চ্ছে। এক সময় যেখা‌নে বন‌মোরগ, হ‌রিণ, শিয়াল, বন‌্যহাতি, বাঘ ও ভাল্লুকের মতো ভয়ংকর প্রা‌ণীসহ নানা প্রজাতির প্রা‌ণীর অবাধ বিচরণ ও পা‌খির কলকাক‌লি‌তে মু‌খো‌রিত ছিল পাহাড়। সেখা‌নে গত দেড় দশ‌কে কাসাভা চা‌ষ কর‌তে গি‌য়ে নি‌র্বিচা‌রে বনভূ‌মি উজাড় করার ফ‌লে হা‌রি‌য়ে গে‌ছে এসব প্রাণী। এভা‌বে চল‌তে থাক‌লে সবুজ পাহা‌ড়ে সবুজত্ব হা‌রিয়ে মরুভূ‌মি‌তে প‌রিণত হ‌বে।

জেলা কৃ‌ষি অফিসের তথ‌্যমতে, চল‌তি বছ‌রে ‌জেলায় ১০১১‌ হেক্টর জ‌মি‌তে কাসাভা চাষ করা হ‌য়ে‌ছে। খাগড়াছ‌ড়ি‌তে সব‌ চে‌য়ে বে‌শি কাসাভা চাষ করা হ‌য়ে‌ছে মা‌টিরাঙ্গায় ও মা‌নিকছ‌ড়ি‌তে। এরমধ্যে মা‌টিরাঙ্গায় ৩৫০ হেক্টর ও মা‌নিকছ‌ড়ি‌তে ৪৫২ হেক্টর। বাস্ত‌বে কাসাভা চা‌ষের প‌রিমাণ আরো বে‌শি।

পাহা‌ড়ের আবহাওয়া অনুকূ‌লে ও খরচ কম হওয়ায় কাসাভা চাষ দ্রুত প্রসা‌রিত হ‌চ্ছে। গাছের ছোটো ছোটো টুকরা করে রোপণ করা হয় এবং ১২ মাস পর মাটি খুঁড়ে আলু তোলা হয়। মাটি উপড়ে আলু তোলার ফ‌লে পাহা‌ড়ে গাছ পালা নাথাকায় বর্ষাকালে বৃষ্টির পানির স্রোতে পাহা‌ড়ে প্রচুর ক্ষয় এবং পাহাড় ধসের সৃষ্টি হয়। পাহা‌ড়ে কাসাভা চা‌ষে কোম্পালিগু‌লো লাভবান হ‌লেও প্রা‌ন্তিক কৃষকরা ন‌্যায‌্যদাম পা‌চ্ছেন না।

কাসাভা চা‌ষকাসাভাচাষি মাহবুবুর রহমান শরীফ জানান, কোম্পানির লোকজনদের কথায় উৎসাহিত হয়ে তিনি তার নিজস্ব ১০ একর এবং লিজ নি‌য়ে আরো ৫ একর মোট ১৫ একর টিলা ভূমিতে কাসাভার চাষ করেছেন। এতে একর প্রতি ১৫-২০ হাজার টাকা ক‌রে অগ্রিম দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। এযাবৎ একর প্রতি খরচ হ‌য়ে‌ছে ৩৫-৪০ হাজার টাকা।

উৎপা‌দিত কাসাভার ন‌্যায‌্যদাম দেওয়া হ‌চ্ছে না উল্লেখ ক‌রে শ‌রিফ আরো ব‌লেন, দে‌শে ৫০‌ থে‌কে ৬০ টাকার নি‌চে কোনো আলু জাতীয় প‌ণ্যের দাম নেই। অথচ নামমাত্র অগ্রিম টাকা দি‌য়ে চু‌ক্তির শিক‌লে ব‌ন্দি ক‌রে সি‌লেটের হ‌বিগঞ্জ কোম্পানির কারখানায় কে‌জিপ্রতি মাত্র ১০ টাকায় পৌঁছে দি‌তে হ‌চ্ছে। আলু উঠা‌নোর পর লাভক্ষ‌তি হিসাব ক‌রে আগামী‌তে কাসাভা চাষ কর‌বেন ব‌লে জানান তি‌নি।

নাম প্রকা‌শে অনিচ্ছুক আরেক চা‌ষি বলেন, কোম্পানির প্রলোভ‌নে কাসাভা চা‌ষে নেমে‌ছি। ৪০০ একর জ‌মিতে কাসাভা চাষ ক‌রে গত ২ বছ‌রে ৩৫ লাখ টাকা লস দিয়ে‌ছি। কোম্পানি ন‌্যায‌্যদাম দি‌লে আমা‌কে এতো লস গুন‌তে হ‌তো না। কোম্পানি মা‌লের দাম না বাড়া‌লে আগামী‌তে আর চাষ করবো না।

প্রাণ এগ্রো বিস‌নেস লি‌মি‌টেডের ম‌্যা‌নেজার রেজাউল ক‌রিম কাসাভা সংক্রান্ত তথ‌্য দি‌তে অস্বীকৃ‌তি জা‌নি‌য়ে ব‌লেন, মি‌ডিয়া কর্মীর সঙ্গে কথা বলা নি‌ষেধ র‌য়ে‌ছে। ত‌থ্যের প্রয়োজনে ঢাকায় মি‌ডিয়া সে‌লের সঙ্গে যোগ‌যোগ কর‌তে ব‌লেন তি‌নি।

আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে পাহা‌ড়ের বনাঞ্চল বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ ক‌রে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠাতা মাহফুজ আহমেদ রাসেল বলেন, পাহা‌ড়ে কাসাভা চাষের দ্রুত বিস্তার উদ্বেগজনক। কাসাভ চাষ পাহা‌ড়ের পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও বন্যপ্রাণীদের জন্য ক্ষতিকারক এবং জলবায়ু সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। কাসাভা চা‌ষে বর্ষা মৌসুমে ভূমি ক্ষয় ও পাহাড় ধসের ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়াও বন ও ঝোপঝাড় পরিষ্কার করতে আগাছানাশক ব্যবহারে ঝোপঝাড় উজাড় করে। এতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হয়।

পাহাড়ে কাসাভা চাষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি উল্লেখ ক‌রে খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোহাম্মদ বাছিরুল আলম জানান, কাসাভা চাষ পাহাড়ের জন্য উপযোগী নয়। কিছু প্রাইভেট কোম্পানি নি‌জে‌দের লাভের জন্য কাসাভা চাষ পাহা‌ড়ে নিয়ে এসেছে।

কাসাভা চাষে মাটি ক্ষ‌য়ে‌র ভূ‌মিকাসহ অন‌্যান‌্য খারাপ দিক তুলে ধরে তি‌নি আরো ব‌লেন, কাসাভা চা‌ষে মা‌টির উপ‌রিভা‌গের পু‌ষ্টিগুণ বা টপস‌য়েল নষ্ট হয়। এতে পরবর্তী‌তে কোনো ফসল জন্মা‌বে না। তাই অচি‌রেই পাহা‌ড়ে কাসাভা চা‌ষের ব‌্যাপারে সরকারে সিদ্ধান্ত নেয়া দ‌রকার ব‌লে মন্তব‌্য ক‌রেন তি‌নি।

কৃ‌ষি বিভা‌গের পৃষ্ঠ‌পোষকতায় পাহা‌ড়ে কাসাভা চা‌ষে বিস্তার লাভের অভি‌যোগ ক‌রে খাগড়াছড়ি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ফরিদ মিয়া বলেন, জেলা প্রশাসককৃত বন্দোবস্তকৃত ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গায় চাষ হ‌চ্ছে কাসাভা। ব্যাপক এলাকাজুড়ে কাসাভার চাষের ফ‌লে শতশত একর জায়গার বনভূমি উজার হ‌চ্ছে প্রতিনিয়তই।

প্রাকৃতিক ভারসাম‌্য রক্ষায় বনায়নের বিকল্প নেই মন্তব্য করেন তি‌নি আরো ব‌লেন, বনে আগুন দেওয়ার কারণে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়, নষ্ট হয় প্রাকৃতিক ভারসাম‌্য। তাই পাহাড়ে কাসভা চাষে সিদ্ধান্ত নিতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি নজর দেওয়ার আহ্বান জানান তি‌নি।

এদিকে, কাসাভা চাষের বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয়েছে উল্লেখ ক‌রে জেলা প্রশাসক সহিদুজ্জামান বলেন, এরইম‌ধ্যে জেলা বন ও পরিবেশ কমিটির এক সভায় ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। পাহাড়ে কাসাভা চাষের প্রতিক্রিয়া ও প্রভাব খতিয়ে দেখার জন্য উপজেলা বন ও পরিবেশ কমিটিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ভালো-খারাপ দিক তদন্ত সা‌পে‌ক্ষে প্রাপ্ত ফলাফ‌লের ভি‌ত্তি‌তে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমআই
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!