ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

বন্যায় বিলীন মাথা গোঁজার ঠাঁই

জাহিদুল হক মনির, ঝিনাইগাতী
প্রকাশিত: ১৭:০৩, ১৪ অক্টোবর ২০২৪
বন্যায় বিলীন মাথা গোঁজার ঠাঁই
শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে বন্যায় ৫ শতাধিক ঘর ভেঙে পড়ে গেছে- ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

‘রাত থেকেই মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। নদীর পানি বাড়ছে কিনা রাতে দুইবার ঘর থেকে বের হয়ে দেখেছি। হঠাৎ করেই ভোরে পানি বেড়ে গিয়ে প্রবল স্রোতে আমার বাড়ির সামনের নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। তাতে চোখের সামনেই আমার সাজানো বাড়িঘর এক নিমিষেই তছনছ হয়ে যায়। এখন আমার ও আমার দুই ছেলের পরিবার নিয়ে চোখে অন্ধকার দেখছি। এখানে ভিটা ছাড়া আর কিছুই নেই। কী করমু, ভেবে পাচ্ছি না।’

রোববার (১৩ অক্টোবর) বিকেল ৫টার দিকে এ প্রতিবেদককে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহারশি নদ সংলগ্ন রামেরকুড়া গ্রামের বাসিন্দা আবু হারেছ।

গত ৩ অক্টোবর রাতের ভারী বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যায় মহারশি নদীর বাঁধ ভাঙনের ফলে আবু হারেছের বাড়িটি ভেঙে যায়। ওই বাড়িতে তিনি, দুই ছেলে লোকমান-রিপন পরিবার নিয়ে বাস করতেন। চোখের সামনে বিলীন হয়ে যায় তিনটি টিনের দু’চালা বসতঘর, একটি রান্নাঘর, গোয়ালঘর, টিউবওয়েলসহ সব স্থাপনা। এরপর তারা প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের বাড়িতে উঠেন।

Advertisement

আবু হারেছ বলেন, ‘মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই বাড়িটি বন্যায় বিলীন হয়ে গেছে। নতুন করে বাড়িঘর তৈরি করব- সেই সামর্থ্য নেই। সরকারিভাবে খাদ্যের প্যাকেট ছাড়া আর সাহায্য পাচ্ছি না। দুই ছেলে ও তাদের পরিবারের সদস্যদের চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।’ সরকারের পাশাপাশি বিত্তবানশালীদেরও সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

এবারের বন্যায় আবু হারেছের ঘরের মতো ৫০টি ঘর বিলীনসহ ৫ শতাধিক ঘর ভেঙে পড়ে গেছে। পাশাপাশি আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২০০ ঘরবাড়ি।

লোকমান মিয়া নামে একজন জানান, শুক্রবার সকালে তার একমাত্র বসতঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় তার বসতঘরের আসবাবপত্রও ভেসে যায়। উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন অটোরিকশাটিও মাটির চাপায় পড়ে অকোজো হয়ে পড়েছে।

নলকুড়া ইউনিয়নের কুশাইপাগা এলাকার মালেক বলেন, ‘আমার একমাত্র বসতঘর মাটির দালানটি পড়ে গেছে। এখন অন্যের বাড়িতে রাত্রীযাপন করেছি। প্রশাসন ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে কয়েকবার খাদ্যসামগ্রী পেয়েছি।’

সদর ইউনিয়নের সদস্য মো. রকিব বাদশা বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডে একটি মাটির দালানঘরও নেই। পুকুরের মাছ ভেসে গেছে, আমন ও শাক-সবজির সব ফসল নষ্ট হয়ে গেছে।’

সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. শাহাদৎ হোসেন জানান, বন্যার পানির স্রোতে তার ইউনিয়নের ১, ২, ৩নং ওয়ার্ডের কমপক্ষে ১০০টি ঘর ভেঙে পড়ে গেছে। বিলীন হয়েছে অন্তত ২০টি বাড়ি। মহারশি নদীর বাঁধের দুই কিলোমিটার অংশের ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে কাঁচা-পাকা রাস্ত‍াঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুই শতাধিক পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। আমন ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ধানশাইল ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম জানান, তার ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ১৫-২০টি ঘর একেবারে পড়ে গেছে ও শতাধিক বাড়িঘরের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। উত্তর অঞ্চলের সব পুকুরের মাছ পানিতে ভেসে গেছে। সব কয়টি কাঁচা সড়কের কমবেশি ক্ষতি হয়েছে এবং দুই-তিনটি পাকা সড়কেরও ক্ষতি হয়েছে।

কাংশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান জানান, পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট দু’দফা বন্যায় তার ইউনিয়নের ১০০ থেকে ১৫০টি বাড়িঘরে ক্ষতি হয়েছে। কাঁচা-পাকা ৫-৬টি সড়কের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। পানিতে ভেসে গেছে দেড় শতাধিক পুকুরের মাছ।

মালিঝিকান্দা ইউপি চেয়ারম্যান মো. মোজাম্মেল জানান, বন্যায় ১ থেকে ১০টি বাড়িঘর, ২টি পাকা সড়ক ও ৯টি ওয়ার্ডেই কাঁচা সড়কের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে ভেসে গেছে ৩০ থেকে ৪০টি পুকুরের মাছ।

হাতিবান্দা ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, তার ইউনিয়নের সব কয়টি কাঁচা সড়কেই ক্ষতি হয়েছে। একই সঙ্গে সব পুকুরের মাছ ভেসে গেছে। আমন ধানের সিংহভাগ ক্ষতি হয়েছে।

ইউএনও মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, ‘পাহাড়ি ঢলে ক্ষয়-ক্ষতির তালিকা নিরুপণ শেষে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দফতরে প্রেরণ করা হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি পুনঃনির্মাণের জন্য সরকারিভাবে সাহায্যের জন্য ঢেউটিন চেয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে পত্র পাঠানো হয়েছে।’

ডেইলি-বাংলাদেশ/এএইচ
ট্যাগ: ঝিনাইগাতী
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!