দশ গ্রামের উদাহরণ নারী উদ্যোক্তা রুবি আফরোজ
দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত সংসার। স্বামী দিনমজুর, দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে কষ্ট হতো রুবি আফরোজের। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি স্বামী দীর্ঘদিন ধরে জটিল রোগে আক্রান্ত। যেখানে সংসারের চাকা ঘোরানোই কষ্টসাধ্য তখন নিজের অসুস্থতার কথা মনেই নেই। এমন সময় সংসারের হাল ধরতে হয়েছে রুবি আফরোজের। আর দশ জন নারীর চেয়ে তিনি একটু ভিন্ন। একসময় যে রুবি আফরোজকে প্রতিবেশীরাও চিনতেন না এখন দশ গ্রামের উদাহরণ তিনি। রুবি আফরোজ এখন শুধু যে কৃষি কাজ করেই সফল নারী উদ্যোক্তা হয়েছেন তা নয়, রুবি এখন সমাজের নেতৃত্ব দেন। সালিশ ব্যবস্থা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধেও তিনি সোচ্চার।
এছাড়াও প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য এবং জেন্ডার নেটওয়ার্ক কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবেও দেখা যায় তাকে।
রুবি আফরোজের বয়স ৩৫ বছর। বরগুনার পাথরঘাটা পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা তিনি। বিয়ের পিঁড়িতে বসায় নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর লেখাপড়া আর হয়ে ওঠেনি।
গতকাল বুধবার কথা হয় রুবি আফরোজের সঙ্গে। তিনি বলেন, অনেক ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া করে চাকরি করবো কিন্তু বাবা-মা বিয়ে দেওয়ায় সে আশা আর পূরণ হয়নি। তবে ছোটবেলা থেকেই নিজে উপার্জন করার আগ্রহ ছিল তীব্র। অসুস্থ স্বামীর অভাবের সংসার একার পক্ষে পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হওয়ায় নিজেই কৃষি কাজে মনযোগী হই। স্বামীর কৃষিজমি না থাকায় বাড়ির মধ্যেই শুরু করি পারিবারিক কৃষি কাজ। জলবায়ু সহনশীল বিভিন্ন পদ্ধতি দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে চাষাবাদ শুরু করি। যেমন- বস্তা পদ্ধতি, টাওয়ার পদ্ধতি, ঝুলন্ত ও সিঁড়ি পদ্ধতিতে বোম্বে মরিচ, লাউ, কুমড়া, শসা, করলাসহ রবি শস্য। এছাড়া গরু পালন করি। সবজি উৎপাদনে করে নিজের পারিবারিক চাহিদা মিটিয়ে বিক্রি করে বছরে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় করে থাকি। এছাড়াও গরুর গোবর দিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট সার উৎপাদন করে প্রতি মাসে ৩৫ থেকে ৫০ কেজি বিক্রি করি এবং কেচো উৎপাদন করে তাও বিক্রি করি। শুধু সিজনে বোম্বে মরিচ ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা বিক্রি করে লাভবান হই।
তিনি আরো বলেন, আমি সিসিডিবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের দক্ষতা অর্জন করেছি এবং বিভিন্ন সংস্থার মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মশালায় অংশগ্রহণ করি। আমি কোনো নারী নির্যাতনের ঘটনা দেখলে তার প্রতিবাদ করি। আইনি সহায়তাসহ অনেকেই আমার কাছে বিভিন্ন পরামর্শের জন্য আসলে চেষ্টা করি সহযোগিতা করার জন্য।
প্রোগ্রাম অফিসার অভিজিৎ মজুমদার রতন বলেন, একটা সময় রুবিকে কেউ চিনতো না, তিনি মানুষের সামনে কথাও বলতে পারতেন না। বিভিন্ন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করে কথা বলতে পারছেন এখন নিজেই প্রশিক্ষক। রুবি একজন সফল কৃষক এবং উদ্যোক্তা। একজন নারী হয়েও এতো পরিশ্রম করতে পারেন তা দেখিয়ে দিয়েছেন তিনি।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রোকনুজ্জামান খান বলেন, প্রতি ঘরে রুবির মতো নারী উদ্যোক্তা দরকার। তাহলে কোনো অভাব থাকবে না। এমন নারীদের আরো প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি করা দরকার। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা থাকবে।