ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

সেলাই মেশিনে বদলে গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমার সংসার

জুনাইদ কবির, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ১৪:২৭, ১৯ আগস্ট ২০২৬
সেলাই মেশিনে বদলে গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের সীমার সংসার
ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের একটি আদিবাসী গ্রামের ২৫ বছর বয়সী সীমা মিনজি। ছবি: ডেইলি বাংলাদেশ

একসময় সংসারের খরচ জোগাতে প্রতিদিন কাজের সন্ধানে বের হতে হতো সীমা মিনজিকে। কখনো ধানের জমিতে, কখনো ফসলের মাঠে রোদ-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে অন্যের জমিতে শ্রম দিতেন তিনি। দিন শেষে পাওয়া মজুরিই ছিল পাঁচ সদস্যের পরিবারের প্রধান ভরসা। কোনো দিন কাজ না পেলে সংসারের চুলায় হাঁড়ি ওঠানোও কঠিন হয়ে পড়ত।

সেই সীমার জীবন এখন বদলে গেছে। অন্যের জমিতে কাজের জন্য ছুটতে হয় না তাকে। নিজের ঘরেই তৈরি হয়েছে তার কর্মস্থল। সামনে সেলাই মেশিন, পাশে কাপড়ের স্তূপ। মাপ নেওয়া, কাপড় কাটা থেকে শুরু করে সেলাই করে পোশাক তৈরি—সবই করেন নিজ হাতে। এই কাজ করে মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন তিনি। কোনো কোনো মাসে আয় হয় আরও বেশি।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের একটি আদিবাসী গ্রামের ২৫ বছর বয়সী সীমা মিনজির এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে তার নিজের চেষ্টা ও পরিশ্রম। পাশাপাশি ইকো-সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) সহায়তায় রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণও তাঁর জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে।

Advertisement

২০২১ সালে একই এলাকার বাসিন্দা উজ্জ্বল ওরাওয়ের সঙ্গে সীমার বিয়ে হয়। পেশায় বিদ্যুৎ মেকানিক উজ্জ্বলের সঙ্গে তাদের এক সন্তান এবং বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়িকে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার। বিয়ের পর সীমা বুঝতে পারেন, শুধু স্বামীর আয় দিয়ে পরিবারের সব খরচ চালানো সহজ নয়। পরিবারের সদস্য বেশি হলেও আয় সীমিত। তাই স্বামীর পাশে দাঁড়াতে তিনিও কাজে নামেন।

মাঠের কাজই ছিল তার প্রধান ভরসা। ধান রোপণ, আগাছা পরিষ্কার, ফসল কাটা—যে কাজ মিলত, সেটিই করতেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্যের জমিতে শ্রম দিয়ে পাওয়া মজুরি তুলে দিতেন সংসারের হাতে। তবে এ কাজে আয় ছিল অনিয়মিত এবং শারীরিক পরিশ্রমও ছিল বেশি।

এমন সময় নতুন একটি সুযোগের কথা জানতে পারেন সীমা। একটি কমিউনিটি আউটরিচ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, কায়িক শ্রমের পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতা অর্জন করে ঘরে বসেও আয় করা সম্ভব। পরে ইএসডিওর সহায়তায় রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণে যুক্ত হন তিনি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ইএসডিওর সঙ্গে সহযোগী হিসেবে রয়েছে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।

রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অ্যাপ্রেন্টিসশিপ বা গুরু-শিষ্য পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে শুধু শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক শিক্ষা নয়, অভিজ্ঞ কারিগরের তত্ত্বাবধানে বাস্তব কর্মপরিবেশে হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পান প্রশিক্ষণার্থীরা।

নিজের আগ্রহ অনুযায়ী সীমা বেছে নেন ‘ফ্যাশন গার্মেন্টস ড্রেস মেকিং অ্যান্ড টেইলারিং’ ট্রেড। ছয় মাসের প্রশিক্ষণে তার ওস্তাদ ছিলেন মোছা. হাসনা বানু ময়না। প্রশিক্ষণের শুরুতে সেলাইয়ের অনেক কাজই তার কাছে কঠিন মনে হলেও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দক্ষতা অর্জন করেন তিনি।

প্রশিক্ষণ শেষে ইএসডিওর ঋণ সহায়তায় একটি সেলাই মেশিন কেনেন সীমা। এরপর বাড়িতেই শুরু করেন সেলাইয়ের কাজ। এখন আশপাশের মানুষ তাঁর কাছে পোশাক তৈরি ও সেলাইয়ের জন্য আসেন। কাজ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে তাঁর আয়ও।

সীমার এই পরিবর্তন শুধু পরিবারের সদস্যদেরই নয়, নজর কেড়েছে প্রতিবেশীদেরও।

এক প্রতিবেশী বলেন, ‘আমাদের মতো আদিবাসী নারীদের জন্য ঘরের কাজ সামলে বাইরে গিয়ে নিয়মিত কাজ করা কঠিন। সীমা সেলাই শেখার মাধ্যমে ঘরে বসে আয় করার পথ তৈরি করেছেন। এতে সংসার সামলানোর পাশাপাশি নিজের আয়ও হচ্ছে। তাঁর কাছ থেকে অন্য নারীরাও উৎসাহ পাচ্ছেন।’

সীমার পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশি খুশি তার স্বামী উজ্জ্বল ওরাও। তিনি বলেন, বিয়ের পর থেকেই দেখেছি, আমাদের সংসারে অভাব ছিল। আমার একার আয়ে সবকিছু সামলানো কঠিন হয়ে পড়ত। সীমাও তখন মাঠে কাজ করতে যেত। অনেক সময় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে বাড়ি ফিরত। শরীর ক্লান্ত থাকলেও সংসারের প্রয়োজনে পরদিন আবার কাজে যেতে হতো। এক দিন কাজ না হলে তার প্রভাব পড়ত সংসারে।

উজ্জ্বল আরও বলেন, সীমার সব সময়ই নিজের কিছু করার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু কী করবেন, কোথা থেকে শুরু করবেন তা বুঝতে পারতেন না। রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়ার পর ওর মধ্যে পরিবর্তন আসে। সেলাই শেখার প্রতি ওর খুব আগ্রহ ছিল। প্রশিক্ষণ থেকে ফিরে বাড়িতেও নিয়মিত অনুশীলন করত। ধীরে ধীরে কাজটি ভালোভাবে শিখে নেয়।

নিজের পরিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে সীমা মিনজি বলেন, এক দিন কমিউনিটি আউটরিচের একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে জানতে পারি, প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের কাজ করা যায়। তখন মনে হলো, আমি যদি একটি কাজ ভালোভাবে শিখতে পারি, তাহলে হয়তো আর প্রতিদিন মাঠে কাজ করতে হবে না। সেই ইচ্ছা থেকেই রেইজ প্রকল্পের প্রশিক্ষণে ভর্তি হই। ইএসডিও আমাকে এই সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করেছে।

তিনি বলেন, ছয় মাসের প্রশিক্ষণে অনেক কিছু শিখেছি। শুরুতে সেলাইয়ের কাজ কঠিন মনে হলেও পরে ধীরে ধীরে সব আয়ত্ত করি। এখন নিজের হাতে কাজ করে মাসে ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারি। এই আয় দিয়ে সংসারে সহযোগিতা করতে পারছি, সন্তানের জন্য খরচ করতে পারছি।

সীমার স্বপ্ন এখন আরও বড়। সুযোগ পেলে অন্য নারীদেরও সেলাই শেখাতে চান তিনি। তার ভাষায়, ইএসডিও ও রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে যে সুযোগ পেয়েছি, তা আমার জীবনের জন্য অনেক বড় পাওয়া। আমি চাই, আমার মতো আরও যেসব নারী কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন, তাঁরাও যেন এমন সুযোগ পান।

রেইজ প্রকল্পের ফিল্ড কোঅর্ডিনেটর সামসুত তাবরিজ বলেন, সীমা মিনজির মতো নারীদের কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি করাই রেইজ প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। শুধু প্রশিক্ষণ দেওয়া নয়, প্রশিক্ষণ শেষে তারা যেন সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে আয় করতে পারেন, সেদিকেও আমরা গুরুত্ব দিই। সীমা প্রশিক্ষণ নিয়ে সেলাইয়ের কাজ শুরু করে এখন নিজের সংসারে অবদান রাখছেন—এটি আমাদের জন্যও আনন্দের বিষয়।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে গ্রামীণ ও আদিবাসী নারীরা ঘরে বসে আয় করার মতো দক্ষতা অর্জন করতে পারলে তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবারেও। আমরা চাই, সীমার মতো আরও নারীরা প্রশিক্ষণের সুযোগ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে উঠুন।

একসময় অন্যের জমিতে দিনমজুরি করে সংসারের চাকা সচল রাখতেন সীমা। এখন সেই হাতেই সেলাই মেশিনের চাকা ঘোরে। শ্রমের ধরন বদলেছে, বদলেছে আয়ের পথও। নিজের ঘরে বসেই আয় করে সংসারে অবদান রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতের স্বপ্নও দেখছেন এই তরুণী।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এমকে
ট্যাগ: ঠাকুরগাঁও
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!