মারধরের শিকার সাংবাদিকেরা হলেন দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর প্রতিনিধি জাহিদ হাসান, নিউজটোয়েন্টিফোর ও জাগো নিউজের জেলা প্রতিনিধি বিধান মজুমদার এবং দৈনিক এদিন-এর জেলা প্রতিনিধি বরকত মোল্লা।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিএনপির একটি বিক্ষোভ কর্মসূচির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে আরিফুজ্জামান মোল্লার নেতৃত্বে কয়েকজন তাদের ওপর হামলা করেন।
.png)
জাহিদ হাসান বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ মিছিলের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন তিনি। এ সময় আরিফুজ্জামান মোল্লা তার সহযোগীদের নিয়ে তাকে মারধর করেন এবং ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। পরে স্থানীয় কয়েকজন আইনজীবী তাকে উদ্ধার করে তাদের কার্যালয়ে নিয়ে যান।
বিধান মজুমদার বলেন, তথ্য সংগ্রহের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যাওয়ার সময় ভবনের নিচতলা থেকে দোতলায় ওঠার পথে আরিফুজ্জামান মোল্লা ও তার সহযোগীরা তাঁকে চড়-থাপ্পড় ও লাথি মারেন। পরে তাকে ভবন থেকে বের করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানান।
অভিযোগের বিষয়ে আরিফুজ্জামান মোল্লা সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, ‘অনেকেই লিস্টে রয়েছে, সন্ধ্যার পরে রেডি থেকো। সাংবাদিকরা লিখবে, আমরা পিটাবো।’
তবে সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ অস্বীকার না করে এ বিষয়ে বিএনপির নেতারা বলেন, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নন।
মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে একটি বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এতে জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম, সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লাসহ দলটির স্থানীয় নেতারা বক্তব্য দেন।
বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, জেলা প্রশাসক সরকারের প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজন সাংবাদিক তার গাড়ি ঘিরে ‘মব’ সৃষ্টি করে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি, সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু ব্যক্তি বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টা করছেন। এ কারণেই তারা প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন।
জেলা বিএনপির সহসভাপতি শাহ মোহাম্মদ আবদুস সালাম বলেন, ‘সাংবাদিকেরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অন্যায় আচরণ করেছেন। তারা এভাবে তার প্রত্যাহার চাইতে পারেন না। সাংবাদিকতার আড়ালে কিছু সন্ত্রাসী ও ফ্যাসিবাদের দোসর বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টা করছেন। এ কারণে আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করেছি। সেখানে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত বা মারধরের শিকার হয়েছেন কি না, তা আমার জানা নেই।’
এর আগে শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সীমানা প্রাচীরের তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়াকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের বিরোধের সূত্রপাত হয়। সাংবাদিকদের অভিযোগ, গত শনিবার রাতে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে কোনো নোটিশ ছাড়াই প্রেসক্লাবের লিজ নেওয়া জায়গার সীমানাপ্রাচীরের তিনটি দেয়াল ভেঙে দেওয়া হয়।
ওই ঘটনার প্রতিবাদে সময় টিভির সাংবাদিক বিএম ইশ্রাফিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেসক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি দিয়ে পোস্ট করেন। পরে তার ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে তার ডান হাতের কবজি ভেঙে যায় বলে সাংবাদিকেরা জানান।
ইশ্রাফিলের ওপর হামলা এবং প্রেসক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার প্রতিবাদে গত রোববার বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন কর্মরত সাংবাদিকেরা। কর্মসূচির সময় জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম সেখানে গেলে সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে ধরেন এবং তাঁর প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপির একটি পক্ষ সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে পাল্টা কর্মসূচি দেয়। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মঙ্গলবারের বিক্ষোভে কয়েকশ মানুষ অংশ নেন। কর্মসূচিতে কয়েকজন সাংবাদিকের শাস্তির দাবিও জানানো হয়।
শরীয়তপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বলেন, ‘জেলা প্রশাসক কোনো নোটিশ ছাড়াই প্রেসক্লাবের লিজ নেওয়া সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দিয়েছেন। এ ঘটনায় সাংবাদিক বিএম ইশ্রাফিল ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর হামলার শিকার হন। এরপর সাংবাদিকেরা মানববন্ধন করে জেলা প্রশাসকের প্রত্যাহার দাবি করেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যে আজ তিন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনা অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমরা প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমকে ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিষয়ে শরীয়তপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর হোসেন বলেন, ‘গণমাধ্যমকর্মীদের মাধ্যমে বিষয়টি এরইমধ্যে জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’