সিরাজগঞ্জে লোডশেডিং, সুতা-রঙের দাম বাড়ায় বিপাকে তাঁতিরা
সিরাজগঞ্জে বিদ্যুতের লোডশেডিং, কাপড় উৎপাদনে ব্যবহৃত সুতা, রঙ ও যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধির কারণে বিপাকে পড়েছেন তাঁতিরা। তাঁতিদের উৎপাদন খরচ ক্রমাগত ভাবে বৃদ্ধি হচ্ছে। সে তুলনায় কাপড় বেশি দামে বিক্রি করতে পারছেন না তারা। তাঁতিরা বলছেন, গত দেড় থেকে দুমাস ধরে ক্রমশই এমন অবস্থা অব্যাহত রয়েছে। যে কারণে জেলার অধিকাংশ তাঁত কারখানাগুলো বন্ধের উপক্রম হয়েছে। এর পর শ্রমিক সংকট তো রয়েছেই।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ার লুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সুত্রে জানা যায়, সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কামারখন্দ, বেলকুচি, এনায়েতপুর, রায়গঞ্জ, চৌহালী ও কাজীপুরে তাঁত কারখানাগুলোতে ৩ লাখের তাঁত রয়েছে। এর সঙ্গে প্রায় ৫ লাখ তাঁতি পরিবার জড়িত আছেন।
.png)
এখানকার উৎপাদিত শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা দেশের বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি হয়। এছাড়াও সিরাজগঞ্জে উৎপন্ন তাঁত পণ্যের ইউরোপ আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চাহিদা রয়েছে। জেলার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির অন্যতম তাঁত শিল্প। এ কারণে জেলার ব্র্যান্ডিং ঘোষণা করা হয় তাঁতশিল্পকে। নাম দেয়া হয় তাঁতকুঞ্জ সিরাজগঞ্জ।
তাঁত মালিকদের অভিযোগ, বর্তমানে ৬০ কাউন্টের প্রতি পাউন্ড সুতা বাজারে ২৯৩ টাকা থেকে ২৯৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ দুই মাস আগে দাম ছিল ২৭৫ থেকে ২৮০ টাকা। এমনই ভাবে সবধরনের সুতার দাম প্রতি পাউন্ডে ১০-১৫ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।
অপরদিকে বর্তমানে কোরিয়ান স্যামসুং একটি মাকুর দাম ১ হাজার ৩০০ টাকা। অথচ দেড় মাস আগে এর দাম ছিল ১ হাজার ২০ টাকা। এভাবে তাঁতে ব্যবহৃত চায়নাসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা প্রতিটি যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমানে বিদ্যুতের ক্রমাগত লোডশেডিং চলছে। জেনারেটর দিয়ে তাঁত চালাতে গেলে দেখা যায় ১ লিটার তেলের দাম ১০৬ টাকা। জেনারেটর দিয়ে কাপড় উৎপাদন করতে গেলে খরচ অত্যন্ত বেশি হচ্ছে।
জেলার বেলকুচি উপজেলার তামাই গ্রামের তাঁতি আমিরুল ইসলাম বলেন, বর্তমান সুতার বাজারমূল্য বৃদ্ধি হয়েছে একই সঙ্গে বিদ্যুতের অব্যাহত লোডশেডিং ও যন্ত্রাংশের দাম বৃদ্ধির ফলে তাঁতে কাপড় উৎপাদনে খরচ অনেক বেড়েছে। অথচ উৎপাদিত কাপড় হাটে বেশি দামে বিক্রি করা যাচ্ছে না। এতে করে এই ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলার খুকনি গ্রামের তাঁতি সোহরাব আলী বলেন, বর্তমানে তাঁতিরা চরম লোকসানে রয়েছে। এর পরেও শ্রমিকের অভাবে কাপড় উৎপাদন করা যাচ্ছে না। শ্রমিকেরা এই কাজে আসে না তাঁর মূল কারণ হচ্ছে মজুরি বাড়াতে বলছেন।
কিন্তু বাজারে সুতা, রঙ, ক্যামিক্যাল ও যন্ত্রাংশের যে দাম তাতে উৎপাদন খরচ উঠছে না। চাহিদার সাথে উৎপাদিত কাপড় হাটে নিয়ে বিক্রি করতে পারছি না। শ্রমিকদের মজুরি কীভাবে বাড়াব।
উল্লাপাড়া উপজেলার বালসা বাড়ি গ্রামের আমির হোসেন বলেন, এই শিল্পের ওপর সরকারের কোন নজর নেই। যে কারনে বর্তমানে তাঁতিদের দুর্দিন চলছে। সরকারের কাছে দাবি এই তাঁত শিল্পকে বাঁচাতে হলে সুতা, রং সহ তাঁতে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশের দাম কমাতে ব্যবস্থা নিতে হবে । অব্যাহত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ার লুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিরাজগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি মো. বদিউজ্জামান বলেন, বর্তমানে নানা অজুহাতে সুতার দাম বাড়ছে। কয়েক দিন পরপরই ব্যবসায়ীরা পাউন্ডপ্রতি সাত থেকে আট টাকা করে দাম বাড়ায়। যন্ত্রাংশের দামও চরম ভাবে বেড়ছে। এছাড়া বিদ্যুতের লোডশেডিং ক্রমাগত চলছে। ইতোমধ্যে জেলার অনেক তাঁত বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট সাইদুর রহমান বাচ্চু বলেন, আমাদের সিরাজগঞ্জ তাঁত শিল্প প্রধান এলাকা এবং এই তাঁতের উপরে অর্থনীতিটা অনেক নির্ভর করে। এখানে যেহেতু গ্রামভিত্তিক তাঁত চলে গ্রামের অর্থনৈতি অবস্থাও সচল থাকবে। সেইজন্য সরকারেরও দৃষ্টি থাকবে আমরা চেম্বার অব কমার্সের পক্ষে থেকে সকল সময় দৃষ্টি রাখছি। যাতে এই গ্রামীণ অবকাঠামো তাঁতের মাধ্যমে সংঘঠিত হয়।
বেলকুচি তাঁত উন্নয়ন বোর্ডের লেয়াজো অফিসার তম্বি বলেন, তাঁতে ব্যবহৃত রং সুতা সহ বিভিন্ন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি ও পাশাপাশি বিদ্যুৎ লোডশেডিং এর কারণে তাঁত শিল্প আজ ঝিমিয়ে পড়েছে।
এই শিল্পকে বাঁচাতে বিদ্যুতের লোডশেডিং, সুতা ও যন্ত্রাংশের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে দ্রুত সরকারের হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন এলাকার সচেতন মহল।