বগুড়ায় চাদর-কম্বল তৈরিতে ব্যস্ত তাঁতিরা
বাংলাদেশের তাঁত শিল্পের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ভূমিকা বগুড়ার শাওইল গ্রাম ও তার আশপাশের তাঁত শিল্পীদের। উত্তরবঙ্গের এই তাঁতি গোষ্ঠী আজো ধরে রেখেছেন তাঁত সংস্কৃতি।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের ছোট একটি গ্রাম শাওইল। অনেক আগে থেকেই এই গ্রামে তাঁতি শ্রেণির বসবাস। তখন থেকেই এই গ্রামে এক ভিন্নধর্মী হাট গড়ে ওঠে। এখানে শীতের চাদর-কম্বলের সুতা কেনাবেচা হতো। পর্যায়ক্রমে এই হাটের জনপ্রিয়তার জন্য এবং চাদর-কম্বল বেচাকেনা হয় বলে এই হাটের নাম দেওয়া হয় ‘চাদর-কম্বল হাটের গ্রাম’। ভোররাত আনুমানিক ৪টা থেকে শুরু হওয়া এই হাট চলে সকাল ১০টা পর্যন্ত। আর হাটের বার হলো রোব ও বুধ। তাছাড়া এই হাট বসে প্রতিদিনই।
এই হাটকে ঘিরে প্রায় ৭৫টি গ্রামে গড়ে উঠেছে তাঁতি পল্লী। তারাই কম্বল কেন্দ্রিক এ শিল্পের এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যখন শাওইলের হাট বসে, তখন মনে হয় যেন মেলা বসেছে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীদের পদচারণায় সবসময় মুখরিত গ্রামের পথঘাট। এই হাটকে ঘিরে চলে ঢাকা- রাজশাহীসহ সারাদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের চাদর-কম্বল আর সুতা কেনার প্রতিযোগিতা।
.png)
হাটের চারপাশ ঘিরে শত শত ট্রাক, বেবিট্যাক্সি, রিকশা-ভ্যানের উপস্থিতি। শীত শুরুর আগেই শাওইলসহ আশেপাশের তাঁতিরা কম্বল, বিছানার চাদর থেকে শুরু করে লেডিস চাদর, লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালাসহ নানা ধরনের শীতবস্ত্র ও পোশাক তৈরি শুরু করেন। কারো রয়েছে নিজের তাঁত, আবার কেউ শ্রম দিচ্ছেন অন্যের তাঁতে। প্রযুক্তির দাপট সত্ত্বেও এই আদি শিল্প শাওইল গ্রামসহ আশেপাশের গ্রামের মানুষ আঁকড়ে ধরে আছেন।
একটানা তাঁতের খটখট শব্দে মুখরিত গ্রামের পরিবেশ আর নারী-পুরুষসহ নানা পেশার মানুষের কর্মব্যস্ততা। কেউ সুতা ছাড়াচ্ছেন, আবার কেউ বা চরকা নিয়ে বসে সুতা নলি বা সূচিতে উঠাচ্ছেন। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় ও ঘরে বসানো পরিপাটি তাঁত যন্ত্র দিনরাত চলছে। প্রতিটি বাড়িতেই কম করে হলেও একটি আর দুটি থেকে দশটি পর্যন্ত তাঁত রয়েছে। কোনোটা চাকাওয়ালা আবার কোনোটা একেবারেই বাঁশ-কাঠ দিয়ে হাতের তৈরি।

শাওইল ছাড়াও দত্তবাড়িয়া, মঙ্গলপুর, দেলুঞ্জসহ আশেপাশের প্রায় ৭৫ গ্রামের চিত্র একই রকম। শাওইল গ্রামের চারপাশে তাঁতিদের অধিকাংশ মানুষের মূল পেশা তাঁতশিল্পকে ঘিরে। আশেপাশের ৭৫ গ্রামে ১০ হাজারেরও বেশি তাঁতি পরিবার আছে আর এ শিল্পকে ঘিরে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম চলে। কেউ বংশ পরম্পরায় আবার কেউবা নতুন করে।
শাওইল হাট ও বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন জানান, শাওইল হাটে শুরুতে পাঁচটি দোকান থাকলেও এখন দোকান রয়েছে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০০ থেকে ১৫০০। আর তৈরি হয়েছে নতুন নতুন কারিগর। খুব উন্নত মানের হওয়ায় এই চাদরের চাহিদা বাংলাদেশে ব্যাপক আর এই চাদরগুলো পৃথিবীর নানা দেশেও যায়। বিভিন্ন গার্মেন্টসের সোয়েটারের সুতা প্রক্রিয়াজাত করে তাঁতে বুনিয়ে তৈরি হয় কম্বল, চাদরসহ আনুষঙ্গিক পণ্য।
কোনো ধরনের প্রচার ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা ছাড়াই এখানে গড়ে উঠেছে বিশাল এই কর্মক্ষেত্র। চাদর তৈরির পাশাপাশি এখানে গড়ে উঠেছে শীতবস্ত্র তৈরির মেশিন, সুতা, রঙ, তাঁতের চরকা, তাঁত মেশিনের সরঞ্জামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বাজারের আশেপাশে গড়ে উঠেছে ছোটবড় অনেক দোকান। দোকানগুলোতে বেচাকেনায় নিয়োজিত অন্তত আট হাজার শ্রমিক। তারা প্রতিদিন সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত লট থেকে সুতা বাছাই, ফেটি তৈরি কিংবা সুতা সাজিয়ে রাখেন।
দিনে ২০০-৩০০ টাকা মজুরিতে নিয়োজিত এসব কর্মচারীর অধিকাংশ আশেপাশের গ্রামের দরিদ্র মহিলা। শাওইলের চাদর আর কম্বলের গ্রামকে ঘিরে হাজারো সম্ভাবনা থাকলেও তা সম্ভাবনার খাত হিসাবে কেউ দেখছে না। তাঁতিদের মাঝে সরকারি সুবিধা বাড়াতে পারলে গ্রামটি হতো একটি দৃষ্টান্তমূলক রফতানির ক্ষেত্র। সবচেয়ে অসুবিধা ব্যবসায়ীদেরও।আদমদীঘি থেকে এই বাজারের দূরত্ব প্রায় ১১ কিলোমিটার। তাছাড়া শাওইল গ্রামে একটিও ব্যাংক নেই। টাকা লেনদেনের জন্য আসতে হয় আদমদীঘি অথবা সান্তাহারে। শাওইল হাটে আসার রাস্তাও খারাপ। রাস্তার কারণে ব্যবসায়ীদের খুব সমস্যা হয়।
শাওইল হাটের মতো ব্যবসা কেন্দ্রিক স্থানে ব্যাংক নেই, তা দুঃখজনক। কারণ, প্রতিদিনই দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন আর মোটা অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ দেশের তাঁত বস্ত্রের চাহিদা নানা কারণে কমে গেলেও কখনো একেবারেই হারিয়ে যায়নি। তাঁত শিল্পীদের পর্যাপ্ত মূলধনের জোগান, সুস্থভাবে বাজারজাতকরণের সুযোগ এবং ঠিকমতো কাঁচামাল সরবরাহ করলে এখনো আগের মতো জনপ্রিয় আর গৌরবময় করে তোলা যায় এ দেশের তাঁতশিল্পকে। প্রয়োজন কেবল একটু উদ্যোগ। আর তা পেলেই বেঁচে থাকে এ দেশের তাঁতশিল্প।