৮ মাসে ১৭ বাল্যবিবাহ বন্ধ করল প্রশাসন
সিরাজগঞ্জের যমুনার চরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাল্যবিবাহের প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পরিবার ও সামাজিক চাপ, অসচেতনতা, আর্থিক সংকট এবং কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্পর্কের কারণে অনেক ক্ষেত্রে অল্প বয়সেই বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
তবে প্রশাসন ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উদ্যোগে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে জেলার ১৭টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করা হয়েছে। একই সময়ে সচেতনতা বাড়াতে বিভিন্ন এলাকায় ১৩৬টি উঠান বৈঠক আয়োজন করা হয়েছে।
.png)
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ও মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের কাছে বাল্যবিবাহের ১৭টি অভিযোগ আসে। অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পরিবার ও ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ, বয়স যাচাই এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে এসব বিয়ে বন্ধ করা হয়।
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, ২১ বছর পূর্ণ হয়নি এমন পুরুষ এবং ১৮ বছর পূর্ণ হয়নি এমন নারীকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো এক পক্ষ বা উভয় পক্ষ অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে তা বাল্যবিবাহ হিসেবে গণ্য হয়।
বাল্যবিবাহ শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ায় এর প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ কঠিন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। জেলা পরিসংখ্যান অফিস বা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়েও এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। ফলে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রতিরোধ করা বিয়ের সংখ্যাই সরকারি উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক ক্ষেত্রে মেয়ের ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই পরিবার থেকে বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবার কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হলে তা জানাজানি হওয়ার পর দ্রুত বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কিছু পরিবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি সম্পর্কও এমন সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অল্প বয়সে বিয়ের কারণে অনেক কিশোরীর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং তাদের পারিবারিক দায়িত্ব নিতে হয়। বয়স ও মানসিক পরিপক্বতার অভাবে দাম্পত্য জীবনে নানা জটিলতাও তৈরি হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব বিয়ের পর বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটে।
বাল্যবিবাহের এমন একটি পরিণতির কথা জানান এক ছেলের বাবা শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, তারা নিজেরা সম্পর্ক করে বিয়ে করেছে। বর্তমানে তাদের মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদের প্রক্রিয়া চলছে।
সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি শাকিল মোহাম্মাদ শরিফুর হায়দার (রফিকুল সরকার) বলেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলে পরবর্তী সময়ে আইনি ও পারিবারিক নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক কানিজ ফাতেমা বলেন, বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও নারীদের সচেতন করা হচ্ছে। কোথাও বাল্যবিবাহের আয়োজনের খবর পাওয়া গেলে প্রশাসনের সহায়তায় দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পাশাপাশি নিয়মিত উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে আরও সম্পৃক্ত করা গেলে বাল্যবিবাহের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।