ঢাকা,  সোমবার   ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৯ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ দেশজুড়ে ]

চলনবিলে চলছে অবাধে পাখি শিকার

গাজী শাহাদত হোসেন ফিরোজী
প্রকাশিত: ১১:৫২, ৫ অক্টোবর ২০২৬
চলনবিলে চলছে অবাধে পাখি শিকার
চলনবিলে চলছে অবাধে পাখি শিকার

চলনবিল জুড়ে তৈরী হয়েছে পাখি শিকারের  মরন ফাঁদ। ধনের ক্ষেত, বিল ও জলাশয়গুলির আশ পাশে লতাপাতা দিয়ে তৈরী করা হচ্ছে বিশেষ ধরনের ফাঁদ। এই সব ফাঁদে টোপ হিসাবে বাধা পাখি ব্যবহার করে ধরা হচ্ছে দেশীয় ও পরিযায়ী পাখি। শুধু পাখি ধরাই না এই গুলি বিক্রী হচ্ছে স্থানীয় বিভিন্ন হাট বাজারে। 


অভিযোগ রয়েছে এই সব পাখির ক্রেতা সমাজের শিক্ষিত ও সচেতন মহল।  এলাকাবাসীর  অভিযোগ, দিনের পর দিন প্রকাশ্যে পাখি শিকার ও বেচাকেনা চললেও কার্যকর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় থামছে না অবাধে পাখি শিকার। এতে চলনবিলের পাখির নিরাপদ বিচরণ ও জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে।

Advertisement


প্রতিবছর শীত মৌসুমে চলনবিলে ঝাঁকে ঝাঁকে বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। বিল, জলাশয় ও গাছপালাকে ঘিরে এসব পাখির বিচরণ। তবে, শিকারিদের নানা কৌশলের কারণে পাখিগুলো নিরাপদে বিচরণ করতে পারছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।


চলনবিলের সিরাজগঞ্জের তাড়াশ ও উল্লাপাড়া, নাটোরের সিংড়া ও গুরুদাসপুর এবং পাবনার চাটমোহর ও ভাঙ্গুড়াসহ পুরো চলনবিল জুড়েই পাখি শিকার হচ্ছে। প্রতিটি পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়।


শিকারিরা ভিন্ন পদ্ধতি দিয়ে অভিনব কায়দায় পাখি শিকার করছে। প্রথমে লতাপাতা দিয়ে ঝোপের মতো কাঠামো তৈরি করা হয়। এর ওপর বসানো হয় জালের ফাঁদ। একটি পাখির পা চিকন সুতা দিয়ে বেঁধে বাঁশের লম্বা কঞ্চির উপর রাখা হয়।


বাঁধা পাখিটি ডাকাডাকি ও ডানা ঝাপটালে আশপাশের অন্য পাখিরা সেটির কাছে এসে বসার চেষ্টা করে। আর তখনই জালে আটকা পড়ে অন্য পাখি। পরে আটকে পড়া পাখি ধরে খাঁচায় রাখা হয় এবং সুযোগ বুঝে বিক্রি করা হয়।


পাখি শিকারি ময়নুল হক এই  পদ্ধতিতে পাখি ধরার কথা জানিয়েছেন। সে জানায় শখের বসে গত তিন-চার বছর ধরে এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে পাখি শিকার করছেন। এ সময় তাকে কেউ বাধা দেননি।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিকারি জানান, এভাবে পাখি শিকার করা অন্যায় বিষয়টি তিনি জানতেন না। তার দাবি, প্রতিদিন নিজের এলাকা ও আশপাশে ঘুরে ছয় থেকে সাতটি পাখি শিকার করেন তিনি। প্রতিটি পাখি ২০০ থেকে ২৫০ টাকা দরে বিক্রি করে দিনে প্রায় দেড় হাজার টাকা আয় করেন। 


পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীনজীবন-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক মোঃ আব্দুর রাজ্জাক নাছিম বলেন, পাখি শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং ক্ষতিকারক পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। নির্বিচারে পাখি শিকার চলতে থাকলে এর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে পুরো জীববৈচিত্র্েযর ওপর।


পাখি শিকার বন্ধে কাজ করছে ‘চলনবিল জীব ও বৈচিত্র্য রক্ষা কমিটি’। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০২০ সাল থেকে তারা চলনবিলে পাখি শিকার বন্ধে কাজ করছেন। গত পাঁচ বছরে অন্তত দুই হাজার শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করেছেন তারা।


এ ক্ষেত্রে প্রশাসনের আরও নজরদারি প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।


সমাজকর্মী ও ‘দি বার্ডস সেফটি হাউজ’ এর চেয়ারম্যান মামুন বিশ্বাস বলেন, চলনবিলে স্বেচ্ছাসেবীরা পাখি রক্ষায় কাজ করছেন। শিকার করা পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করা হলেও তৃণমূল পর্যায়ে জনসচেতনতার অভাব এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে স্থায়ীভাবে পাখি শিকার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। তার মতে, শুধু পাখি উদ্ধার করে অবমুক্ত করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শিকারিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা এবং নিয়মিত নজরদারি জরুরি।


তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নুসরাত জাহান বলেন, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা অপরাধ। এ অপরাধে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে। পাখি শিকারের তথ্য পেলে অভিযান পরিচালনা করে তা বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে।

ডেইলি-বাংলাদেশ/সিরাজগঞ্জ
ট্যাগ: সিরাজগঞ্জ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!