ফরিদপুরে চোখ উপড়ে নেওয়ার ভিডিও ভাইরাল
ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নে মো. দেলোয়ার হোসেন পারভেজ খাঁ (৪১) নামে এক ব্যক্তির চোখ উপড়ে ফেলা ও হাত-পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় সাবেক এক ইউপি চেয়ারম্যানকে দায়ী করে নির্যাতনের শিকার ওই ব্যক্তি অভিযোগ তুললেও স্থানীয়দের দাবি, চুরির অভিযোগে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন তিনি। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে ঘটনাটি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
গত ১ নভেম্বর রাতে ফরিদপুর সদর উপজেলার কৃষ্ণনগর ইউনিয়নের বড় মাধবপুর ময়নার মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরদিন ২ নভেম্বর সকালে গুরুতর আহত অবস্থায় দেলোয়ারকে উদ্ধার করে প্রথমে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান চিকিৎসকরা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৫৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে শয্যাশায়ী দেলোয়ারকে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখা যায়। ভিডিওতে তিনি দাবি করেন, আদালতে দায়ের করা একটি মামলা তুলে নিতে দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। এতে রাজি না হওয়ায় রোববার রাতে ঘর থেকে বের হলে মুখ বাঁধা ১০ থেকে ১২ জন তাঁকে তুলে নিয়ে যায়।
ভিডিওতে দেলোয়ার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তফাকে এ ঘটনার নির্দেশদাতা হিসেবে অভিযুক্ত করেন। এ ছাড়া শাহিন মল্লিক, হাসিব মল্লিক, হাসিবুল মল্লিক, রিফাত, ছায়ফুল, আলমগীর, জাহাঙ্গীর ও বাজেদ ফকিরসহ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করে নির্যাতনে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য। তাঁদের দাবি, দেলোয়ারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গরু, মোবাইল ফোন, শ্যালো মেশিন, ইজিবাইকের ব্যাটারি, ছাগল ও মসজিদের মাইক চুরির অভিযোগ রয়েছে। এর আগে বিভিন্ন চুরির ঘটনায় তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তাঁরা। সম্প্রতি তাঁর বিরুদ্ধে এলাকায় মানববন্ধনও করা হয়।
স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রিয়াজুল ইসলাম আব্বাসের দাবি, চুরি করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে দেলোয়ার গণপিটুনির শিকার হয়ে থাকতে পারেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২ নভেম্বর ভোরে এক সবজি চাষি ধানখেতের দিক থেকে চিৎকার শুনতে পান। পরে স্থানীয়দের খবর দিলে অটোরিকশায় করে দেলোয়ারকে উদ্ধার করা হয়। এরপর তাঁকে কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান এ কে এম বাশারুল আলম বাদশা মিয়ার বাড়িতে নেওয়া হয়।
এদিকে নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কৃষ্ণনগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও কোতোয়ালি থানা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মোস্তফা।
তিনি ঘটনাটিকে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র দাবি করে বলেন, আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে একটি পক্ষ তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে এ ঘটনা সাজিয়েছে। উদ্ধারের পর প্রথমদিকে দেলোয়ার তাঁর নাম বলেননি। কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে দীর্ঘক্ষণ পর বের হয়ে ইন্টারনেটে তাঁর বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম বাশারুল আলম বাদশা মিয়া বলেন, ইউপি সদস্যের মাধ্যমে তিনি ঘটনার কথা শুনেছেন। তবে দেলোয়ারকে তাঁর বাড়িতে নেওয়া হয়েছিল কি না কিংবা তাঁর চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন।
ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চোখ উপড়ে ফেলা ও গুরুতর নির্যাতনের অভিযোগ, মামলার জেরে হামলার দাবি এবং চুরির অভিযোগে গণপিটুনির পাল্টা বক্তব্যে ঘটনাটি ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন ব্যক্তিরা।