ঢাকা,  রোববার   ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৪ আশ্বিন ১৪৩৩

Advertisement
[ অপরাধ ]

অপ্রতীম হত্যা: আইফোনের সূত্রে তুহিন, সামনে এলো পুরোনো অভিযোগও

নিজেস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৯:১০, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপ্রতীম হত্যা: আইফোনের সূত্রে তুহিন, সামনে এলো পুরোনো অভিযোগও
ফাইল ছবি

একটি আইফোন। সেই ফোনের সূত্র ধরেই শুরু হয় অনুসন্ধান। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, নিখোঁজ হওয়ার আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের ১৩ বছর বয়সী ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীমের সঙ্গে ছিলেন তুহিন নামে এক তরুণ। এরপর তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদ, তার বাড়িতে অভিযান এবং সেখান থেকে অপ্রতীমের মায়ের আইফোন উদ্ধার। তদন্তের পর পুলিশ দাবি করছে, ওই ফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করেই অপ্রতীমকে লালমাই পাহাড়ের নির্জন এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। অপ্রতীম হত্যার তদন্তে তুহিনকে ঘিরে আরও একটি পুরোনো অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৫ সালে তার বিরুদ্ধে বন্ধুর মোটরসাইকেল নিয়ে ফেরত না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছিল। সেই অভিযোগে মামলা না নিয়ে শুধু সাধারণ ডায়েরি নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারী। তবে ওই পুরোনো অভিযোগের সঙ্গে অপ্রতীম হত্যার সরাসরি কোনো যোগসূত্র এখনো পাওয়া যায়নি।

Advertisement

জানা গেছে, শুক্রবার বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ি এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে মায়ের আইফোন নিয়ে বের হয় অপ্রতীম। এরপর সে আর বাসায় ফেরেনি। পরে তার বাবা কুমিল্লা সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরদিন শনিবার দুপুরে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল।

পুলিশের ভাষ্যমতে, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেল পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে সানন্দা এলাকার পাহাড়ঘেরা নির্জন বনে অপ্রতীমের ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতে অপ্রতীম বাধা দিলে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। প্রথমে সাইফুল এবং পরে ওই দুই কিশোর লাঠি দিয়ে অপ্রতীমের মাথায় আঘাত করে। একপর্যায়ে মারা যায় অপ্রতীম। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর তার আইফোন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে চলে যায় অভিযুক্তরা।

এদিকে অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকসহ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে অপ্রতীমের সঙ্গে তুহিনকে দেখা যায়। আরও একটি বাড়ির সিসিটিভি ফুটেজেও অপ্রতীমকে নিয়ে যেতে দেখা যায় ওই তরুণকে।

পুলিশের বাইরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন কর্মকর্তা জানান, ওই ফুটেজের সূত্র ধরে তুহিনকে শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেও তার পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। তারপর তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে আসে তুহিন।

এরপর প্রথমে তুহিনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। পরে শনিবার রাতে সালমানপুর এলাকায় তুহিনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতীমের মায়ের আইফোন উদ্ধার করা হয়। আইফোন উদ্ধারের বিষয়টি প্রথম দিকে তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে সামনে আসে। কারণ, অপ্রতীম ওই ফোনটি সঙ্গে নিয়েই বাসা থেকে বের হয়েছিল এবং পরে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় সদর দক্ষিণের সানন্দা এলাকার নূরে আলমের ছেলে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯), সালমানপুর এলাকার মমিন হোসেনের ছেলে মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ (১৫), সদর উপজেলার হাতিগাড়া এলাকার মো. আব্দুল কুদ্দুসের ছেলে কামরুল হাসান (১৫) ও সদর দক্ষিণের এলাহিপুর এলাকার সেলিম মিয়ার ছেলে মো. সিয়ামকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান তার কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি) ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে পুলিশ দেখতে পায়, ১৮ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) বেলা আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে অপ্রতীমকে সঙ্গে নিয়ে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলের দিকে যান তুহিন (সাইফুল)। পরে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধারের পর সিসিটিভি ফুটেজে অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা সাইফুলকে হেফাজতে নেওয়া হয়।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে অপ্রতীমের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে পরিকল্পনা করে ওই স্থানে নিয়ে যাওয়ার কথা জানায় সাইফুল। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই দুই কিশোরের সম্পৃক্ততার তথ্য পায় পুলিশ। সে অনুযায়ী তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে অপ্রতীমের ব্যবহৃত আইফোনটি উদ্ধার করা হয়। মূলত আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যেই অপ্রতীমকে নির্জন এলাকায় নেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু শুধু আইফোনই কি কারণ? এই জায়গাতেই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে কিশোর গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততা নিয়ে।

পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, কুমিল্লায় এ পর্যন্ত ২৫০ জনের বেশি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপ্রতীম হত্যায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় মাদকসেবী, কিশোর গ্যাং এবং স্থানীয় মানুষের আধিপত্যের অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন করেন সাংবাদিকেরা। একই সঙ্গে লালমাই পাহাড়ে সাম্প্রতিক কয়েকটি অপরাধের ঘটনা এবং অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পুলিশ সুপার এসব বিষয়ে তদন্তের কথা জানান। তিনি বলেন, লালমাই পাহাড় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কাজ করছে।

এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, কুমিল্লার ঘটনাটি মর্মান্তিক। দেশের মানুষ এতে মর্মাহত। অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর ১২ ঘণ্টার মধ্যে সন্দেহভাজন আসামিদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সর্বশেষ হিসাব মতে, আগে তিনজন, আজকে একজন—মোট চারজন গ্রেপ্তার হয়েছে এবং তারা অপরাধ স্বীকার করেছে। তারা যে অপরাধী, সেটাও স্বীকার করেছে। এ ঘটনায় আইন অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলমান।

তিনি বলেন, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অনেকটা কিশোর অপরাধীর মতো। তারা অনেকটা কিশোর অপরাধ চক্রের মতো। তাদের সঙ্গে এই ছেলের সম্পর্ক ছিল, ওঠাবসা ছিল, বন্ধুত্ব ছিল। তাদের বয়স নিহত শিশুটির চেয়ে ৫ থেকে ১০ বছর বেশি। হত্যার সময় ছেলেটির হাতে থাকা মুঠোফোনটি উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু আলামতও পাওয়া গেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, এখানে আমরা পুলিশের প্রশংসা করতে পারি যে তারা ১২ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে। ফরেনসিক বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

এদিকে রোববার কোটবাড়ি গন্ধমতির বাসার পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এর আগে সকাল ১০টায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মাঠে তার প্রথম জানাজা এবং বেলা ১১টায় গন্ধমতিতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে তার দাফনকাজ সম্পন্ন করা হয়।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অপ্রতীমের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী মিছিল নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এতে মহাসড়কের দুই পাশে অন্তত ৫ কিলোমিটার যানজট সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন লেখা-সংবলিত ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড নিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন।

এ সময় তারা ‘আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই’, ‘জ্বালোরে জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘লেগেছে রে লেগেছে, রক্তে আগুন লেগেছে’, ‘দড়ি লাগলে দড়ি নে, খুনিরে ফাঁসি দে’, ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকেন। এরপর দুপুর ১টার দিকে মহাসড়ক ত্যাগ করেন বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা।

এদিকে একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতীমের লাশ উদ্ধারের পর থেকে নিজেকে সামলাতে পারছেন না কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম। কথা বলতে গেলেই কান্নায় ভেঙে পড়ছেন, মূর্ছা যাচ্ছেন। একই অবস্থা অপ্রতীমের ব্যবসায়ী বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারেরও।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদা বলেন, ‘আমার একটাই মাত্র ছেলে। এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব। তোরা আইফোন নিয়ে যেতি, কিন্তু আমার ছেলেকে খুন করলি কেন? আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দাও। অপ্রতীম আমার বুকের মানিক, তোকে ছাড়া কীভাবে বাঁচব, বাবা।’

ডেইলি-বাংলাদেশ//এসআই
অপরাধ জনপ্রিয় খবর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!