ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ অর্থনীতি ]

ব্যাংকের মার্জার নয়, খুঁজতে হবে বিকল্প

নিরঞ্জন রায়
প্রকাশিত: ০৯:৪৮, ১৫ মে ২০২৪
ব্যাংকের মার্জার নয়, খুঁজতে হবে বিকল্প
ফাইল ফটো

দেশের ব্যাংকিং খাতে একাধিক ব্যাংকের মার্জার নিয়ে যে মাত্রার আলোচনা চলছে, তা আগে কখনো সেভাবে দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের দুর্বল ও সবল ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এটি খুবই স্বাভাবিক। কেননা আমাদের দেশে একাধিক ব্যাংক মার্জারের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।

যে দু-একটি ঘটনাকে একাধিক ব্যাংকের মার্জার বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা মোটেই মার্জার নয়। এমনকি এখন মার্জারের নামে যা হচ্ছে, তাকেও মার্জার বলা যাবে না। বলে রাখা ভালো যে মার্জার বা অ্যাকুইজিশন হচ্ছে এক ধরনের ব্যাবসায়িক কৌশল, যার মাধ্যমে খুবই ভালো অবস্থানে থাকা দুটি ব্যাংক একীভূত হয় আরো বৃহত্তম ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য। যেমন—অতি সম্প্রতি কানাডায় আরবিসি (রয়াল ব্যাংক অব কানাডা) এবং এইচএসবিসি ব্যাংক অব কানাডার মধ্যে মার্জার হয়েছে।

পক্ষান্তরে যুক্তরাষ্ট্রে ফার্স্ট সিটিজেন ব্যাংকের সঙ্গে ধসে পড়া সিলিকন ভ্যালি ব্যাংকের এবং সুইজারল্যান্ডে ইউবিএস ব্যাংকের সঙ্গে ধসে পড়া ক্রেডিট সুইসের যে একীভূত হওয়ার ঘটনা, তা মোটেই মার্জার নয়। এভাবে একীভূত হওয়াকে বলা হয়ে থাকে সবল ব্যাংক কর্তৃক ধসে পড়া ব্যাংককে উদ্ধার বা স্যালভেজ করা। বাংলাদেশেও যাকে একাধিক ব্যাংকের মার্জার বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তা মূলত একটি সবল ব্যাংকের মাধ্যমে দুর্বল ব্যাংক রক্ষা করা বা স্যালভেজ করার নামান্তর। এখানে আরো একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন, তা হচ্ছে একটি সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে আরেকটি সরকারি ব্যাংকের একীভূত হওয়াকে কোনো অবস্থায়ই মার্জার বলা যাবে না।

Advertisement

কারণ এখানে মালিকানার পরিবর্তন হয় না। এমনকি একটি সরকারি ব্যাংকের সঙ্গে বেসরকারি ব্যাংকের একীভূত হওয়াকেও মার্জার বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকার বেসরকারি ব্যাংকের দায়িত্ব নেবে মাত্র। 

কিছুদিন আগে বাংলাদেশ ব্যাংক যে রোডম্যাপ ঘোষণা করেছিল, সেখানে দুর্বল ব্যাংকগুলো সবল ব্যাংকের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি ছাড়াও ব্যাংকে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং খেলাপি ঋণ সমস্যা সমাধানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু ব্যাংকের সুশাসন এবং খেলাপি ঋণ সমস্যার বিষয় নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য না হলেও একাধিক ব্যাংকের মার্জার নিয়ে রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

বলা চলে, বিষয়টি নিয়ে জনমনে এক ধরনের আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। এর যথেষ্ট কারণও আছে। প্রথম দুটি বিষয় অর্থাৎ সুশাসন এবং খেলাপি ঋণ সমস্যা জনগণের মাঝে সেভাবে সরাসরি প্রভাব ফেলে না। সুশাসনের বিষয়টি সাধারণ মানুষ সেভাবে জানার চেষ্টাই করে না। খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতের মারাত্মক সমস্যা এবং এমনকি দুর্বল ব্যাংকে পরিণত হওয়ার অন্যতম কারণ হলেও সমস্যাটি দীর্ঘদিনের এবং চলমান হওয়ায় মানুষের এর সঙ্গে এক ধরনের অভ্যস্ততা তৈরি হয়ে গেছে। ফলে এই দুটি বিষয়ে যত কঠিন সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা মানুষের মাঝে আস্থার সংকট তৈরি করে না। পক্ষান্তরে একাধিক ব্যাংকের মার্জারের বিষয়টি একেবারেই ভিন্ন। এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতে কিছু দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়। যেমন—একটি ব্যাংকের নাম হারিয়ে যাবে, অনেক ব্যাংকারের চাকরি যাবে ইত্যাদি। এসব দেখে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিতে বাধ্য, যা সমগ্র ব্যাংকিং খাতের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি দেশের অর্থনীতি এবং মুদ্রাবাজারের জন্যও বিপজ্জনক। এ কারণেই ব্যাংকিং খাতের জন্য প্রয়োজনীয় এবং গুরুত্বপূর্ণই হওয়া সত্ত্বেও অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না শুধু মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট হতে পারে এ জন্য। উল্লেখ্য সম্প্রতি আমেরিকা ও ইউরোপে যে ব্যাংকগুলো ধসে পড়েছিল বা ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল, তা যত না আর্থিক সমস্যার কারণে, তার চেয়ে অনেক বেশি আস্থার সংকটে।

একটি দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে একটি সবল ব্যাংক একীভূত করলে বেশ কিছু সমস্যা সৃষ্টি হতে বাধ্য। প্রথমত, ব্যাংকের গ্রাহকদের মধ্যে দুশ্চিন্তা শুরু হবে যে তাদের আমানতের কী হবে। যারা সচেতন গ্রাহক, তাদের তেমন কোনো সমস্যা না হলেও সাধারণ গ্রাহকরা আতঙ্কিত হবেন, এটিই স্বাভাবিক। কেননা একটি ব্যাংক কাগজে-কলমে নেই হয়ে যাবে, আর সেই ব্যাংকের সব গ্রাহক নিয়ন্ত্রক সংস্থার মুখের কথায় আস্থা রাখবেন—তেমনটি হয় না। এমনকি একীভূত করা সবল ব্যাংকের গ্রাহকরাও ভাবতে থাকবেন যে এই ব্যাংকও খুব শিগগির দুর্বল ব্যাংকে পরিণত হতে পারে। তাই সাবধানী গ্রাহকরা তাদের আমানত অন্যত্র সরিয়ে নিতে পারেন। গ্রাহকদের মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্ক যদি দূর করা না হয়, তাহলে সেই আতঙ্ক সংক্রমিত হয়ে সমগ্র ব্যাংকিং খাতে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি খুবই খারাপ হতে পারে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল ব্যাংকের যে সমস্যা, সেটি সবল ব্যাংকেও দেখা দেবে। যেমন—সবল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অত্যাধিক চাপে পড়ে অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং পরিণতিতে তারাও খারাপ পরিচালনা পর্ষদে পরিণত হবে। তৃতীয়ত, যে খেলাপি ঋণের কারণে একটি ব্যাংক দুর্বল হয়েছে, সেই খেলাপি ঋণ সমস্যা আরো বৃদ্ধি পাবে এবং জটিল হতে পারে। যেমন ধরা যাক, যে সবল ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা হবে, সেই সবল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দুই হাজার কোটি টাকা আর দুর্বল ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা। স্বাভাবিকভাবেই একীভূত হওয়া ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে সাত হাজার কোটি টাকা, যা সেই ব্যাংক খুব সহজে আদায় করতে পারবে না। কেননা সেই ব্যাংকের হাতে কোনো ম্যাজিক নেই, যা দিয়ে তারা পাহাড় সমান খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারবে। ফলে কয়েক বছরের মধ্যে এই সবল ব্যাংকটিও বিশাল খেলাপি ঋণের ভারে দুর্বল হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা দোষারোপ করবে যে এই সমস্যা তাদের নিজের নয় এবং তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, একীভূত হওয়া ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার চাকরি তো যাবেই, সেই সঙ্গে যাঁদের চাকরি থাকবে, তাঁরাও স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারবেন না। একীভূত হওয়া ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি, হিংসা, বিদ্বেষ এবং একে অপরকে ঘৃণা করার মতো পরিবেশ সৃষ্টি হবে, যা কাজের পরিবেশ নষ্ট করার পাশাপাশি গ্রাহক সেবার মানকেও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ রকম আরো অনেক সমস্যা দেখা দেওয়া খুবই স্বাভাবিক।

বিগত দুই দশকে সমগ্র বিশ্বেই ব্যাংকিং খাত অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী আর্থিক খাত, জার্মানির মতো শক্ত অর্থনীতির দেশ, সুইজারল্যান্ডের মতো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক সংস্থার দেশ এবং এমনকি ভারতের মতো বিশাল দেশের ব্যাংকিং খাতও সমস্যায় পড়েছে। কিন্তু কোথাও দুর্বল ব্যাংককে সবল ব্যাংকের মাধ্যমে রক্ষার চেষ্টা সেভাবে করা হয়নি। উপায়ান্তর না পেয়ে যে দু-একটি হয়েছে, তার ফল খুব ভালো হয়নি। যা হোক, আশার কথা এই যে বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের পূর্বঘোষিত একাধিক ব্যাংকের মার্জারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংক আর কোনো দুর্বল ব্যাংককে সবল ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ করানোর সিদ্ধান্ত অনুমোদন করবে না। একাধিক ব্যাংকের মার্জারকে কেন্দ্র করে এক বিশৃঙ্খল অবস্থার সৃষ্টি হওয়ার আগেই বাংলাদেশ ব্যাংক যে বিষয়টি বুঝতে পেরে এই পথ থেকে সরে এসেছে, এ জন্য তাদের সাধুবাদ। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তাদের অবস্থান এখনো সেভাবে পরিষ্কার করেনি। ফলে ব্যাংকের গ্রাহক এবং সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা এখনো রয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের উচিত মার্জারের বিষয়ে তাদের পরিবর্তিত অবস্থান সবার সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা। সেই সঙ্গে এটিও স্পষ্ট জানিয়ে দিতে হবে যে একাধিক ব্যাংকের মার্জারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলেও দেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে তারা শক্ত অবস্থানেই থাকবে এবং যেকোনো পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংক একাধিক ব্যাংকের মার্জারের সিদ্ধান্ত নিয়ে সেভাবে এগিয়ে যেতে না পারলেও এর মাধ্যমে তারা দেশের ব্যাংকিং খাতে এক ধরনের ভালো ঝাঁকুনি দিতে পেরেছে। ব্যাংকের মালিকপক্ষ, প্রধান নির্বাহী এবং সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের মধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কর্তৃত্বটা জানান দিতে পেরেছে। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে এটার খুব বেশি প্রয়োজন ছিল। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে। বিশেষ করে একাধিক ব্যাংকের মার্জারের বিকল্প কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে। অতি সম্প্রতি সুইস নিয়ন্ত্রক সংস্থা ধসে পড়া জুলিয়াস বায়ের ইন্টারন্যাশনাল ব্যাংককে উদ্ধার করার ক্ষেত্রে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। অর্থাৎ দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে সেখানে পেশাদার ব্যাংকারদের সমন্বয়ে নতুন পর্ষদ গঠন, রিকভারির জন্য বিশেষভাবে বিজনেস প্ল্যান তৈরি ও বাস্তবায়ন করা, সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদানসহ গ্রহণযোগ্য সময় দেওয়া এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর তাদের কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা। এর পাশাপাশি যেসব ব্যাংক কিছুটা ভালো অবস্থায় আছে বা অপেক্ষাকৃত কম দুর্বল, সেসব ব্যাংকের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে ব্যাংকিং খাতে ভবিষ্যতে বড় ধরনের কোনো ধাক্কা এলে ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকগুলো খুব সহজে তা সামলাতে পারে। যেমনটা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা করেছে। সেখানে এক ডজনেরও বেশি ছোট এবং আঞ্চলিক ব্যাংক সমস্যায় থাকলেও তারা সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে তাদের বৃহৎ ব্যাংকগুলোকে আরো সুসংহত এবং শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে বৃহৎ ব্যাংকগুলোর মূলধন সংরক্ষণের পরিমাণ পর্যাপ্ত বৃদ্ধি করেছে। মোটকথা, ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানে দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে সবল ব্যাংকের মার্জার কোনো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়, বরং বিকল্প অনেক ব্যবস্থা বেশ ভালো কাজ করে। বাংলাদেশ ব্যাংক সেই বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখক: সার্টিফায়েড অ্যান্টি মানি লন্ডারিং স্পেশালিস্ট ও ব্যাংকার, টরন্টো, কানাডা

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেডআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!