ঢাকা,  মঙ্গলবার   ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ অর্থনীতি ]

বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় হচ্ছে না 

অর্থনীতি প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:১৩, ১১ জুন ২০২৪
বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় হচ্ছে না 
ফাইল ফটো

বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কয়েক দফা কমেছে। মার্কিন বাজার আদর্শ ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) ছাড়াও বাজারের সব কয়েকটি আদর্শেই কমেছে তেলের দাম। তবে দাম কমলেও দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে না। আর জ্বালানি তেলের এই উচ্চ মূল্যকেই দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে না আসার অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন বিশ্লেষকরা।

বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত মাসে বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি গড় মূল্য ছিল ৮১ ডলার ৪০ সেন্ট। আর আন্তর্জাতিক বাজারে গতকাল ডব্লিউটিআই এ দাম ছিল ৭৬ ডলারের নিচে। মূল্যে পতন অব্যাহত রয়েছে অন্যান্য বাজার আদর্শেও।

এদিকে জ্বালানি বিভাগ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এ মূল্য নির্ধারণ হচ্ছে। তবে বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম কমতির দিকে থাকলেও চলতি মাসে জ্বালানি বিভাগ ডিজেল-কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়িয়েছে।

Advertisement

দেশে জ্বালানি তেলের ‘স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ’ পদ্ধতি গত মার্চ থেকে চালু রয়েছে। আর জ্বালানি তেলের স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয়ের এ পদ্ধতি ঠিকমতো বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের (বিপিসি) অতিমাত্রায় মুনাফার প্রবণতাকে দায়ী করছেন জ্বালানি খাত বিশেষজ্ঞরা। 

তারা বলছেন, এখানে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিপিসিকে অতিরিক্ত মুনাফা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অথচ বিপিসির মুনাফার অর্থ সমন্বয়ের মাধ্যমে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়িয়ে ভোক্তার ওপর খরচের বোঝা বাড়িয়ে তোলা হচ্ছে। ফলে মূল্যস্ফীতিও আরো বেড়ে যাচ্ছে। 

বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, জ্বালানি তেল বিক্রি করে গত নয় বছরে ৪৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বেশি মুনাফা করেছে সংস্থাটি। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় মুনাফায় ছিল সংস্থাটি। এর মধ্যে শুধু ২০২১-২২ অর্থবছরে ২ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা লোকসান দেয় বিপিসি। 

এদিকে চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরেও বিপিসির নিট মুনাফা হতে পারে ৩ হাজার ৮৪১ কোটি টাকা। যদিও শুরুতে বিপিসি ১০ হাজার ১৯ কোটি টাকা নিট লোকসানের প্রাক্কলন করেছিল। আর গত অর্থবছরে সংস্থাটির নিট মুনাফা হয়েছিল ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা।

যাবতীয় পরিচালন ও আর্থিক ব্যয় বাদ দিয়ে গত অর্থবছরে বিপিসি কর-পূর্ববর্তী মোট মুনাফা করেছে ৬ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। আর কর-পরবর্তী নিট মুনাফা হয়েছে ৪ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। এ সময় সরকারি কোষাগারে আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, লভ্যাংশ, আয়করসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১৫ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছে বিপিসি।

দেশের বাজারে প্রতি বছর বিপিসির জ্বালানি তেল বিক্রি হয় ৭২ থেকে ৭৫ লাখ টন, যার বেশির ভাগই ডিজেল। পরিবহন খাতে সিংহভাগ ডিজেল ব্যবহার হয়। বাকিটা বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও অন্যান্য খাতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যস্ফীতির হিট ম্যাপের তথ্য অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতিতে খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মধ্যে জ্বালানি খাতের প্রভাব অনেক বেশি। এর মধ্যে আবার জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন, খাদ্য ও সেবার ব্যয়ভারও বেড়ে যায়।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ব্যারেলপ্রতি গড় মূল্য ছিল ৮১ ডলার ৪০ সেন্ট। এর আগে এপ্রিলে ছিল ৮৮ ডলার। আর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত গড় মূল্য ছিল ৮০ ডলার ৬০ সেন্ট। ২০২৩ সালে গোটা বছরজুড়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের গড় মূল্য ছিল ৮০ ডলার ৮০ সেন্ট। এর আগে ২০২২ সালে ছিল ৯৭ ডলার ১০ সেন্ট।

বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয়ের অংশ হিসেবে স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি চালু করে সরকার। চলতি বছরের ৭ মার্চ থেকে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় শুরু হয়। মার্চ থেকে এ পর্যন্ত চার দফা মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে। এতে দেশের বাজারে ডিজেল, কেরোসিন, পেট্রল ও অকটেনের দাম দুই দফা কমেছে। আর দুই দফায় বেড়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের যে কথা বলা হচ্ছে সেটি আদতে সমন্বয় হচ্ছে না। সমন্বয় বলতে মূলত বিপিসির ৫ শতাংশ মুনাফা রেখে ভোক্তা পর্যায়ে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্যটি সরবরাহ করার কথা। কিন্তু এখানে সরকার তথা বিপিসি সেটার পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফা করছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটা তো তারা করতে পারে না। 

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের কথা বলে বিপিসির মুনাফা, সরকারের রাজস্ব, ডিভিডেন্ড, কর্পোরেট ট্যাক্স এগুলো তুলে নিচ্ছে। এগুলোর কোনো পর্যালোচনা হচ্ছে না। এটাকে কোনোভাবেই সমন্বয় বলা যায় না।

ডেইলি-বাংলাদেশ/জেডআর
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!