রফতানিতে রেকর্ড গড়া পণ্য যেভাবে আমদানির তালিকায়
বাংলাদেশের আলু একসময় দেশের মানুষের চাহিদা মিটিয়ে রফতানি হতো বিশ্বের ১৬টি দেশে। তিন বছর আগেও আলু রফতানিতে রেকর্ড হয়েছে। সেই বছর ২ লাখ টনের বেশি আলু রফতানি হয়। এরপরই কমতে শুরু করে রফতানির পরিমাণ। এক পর্যায়ে আলু রফতানির পরিবর্তে ঝুঁকতে হয় আমদানিতে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের চাহিদা মেটাতে প্রথমবারের মতো আলু আমদানি করা হয়েছে। ঐ বছর ৯৮ হাজার ৭৩১ টন আলু আমদানির বিপরীতে রফতানি হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৫২ টন।
শুধু আলু নয়, কাঁচা মরিচ, টমেটো, গাজরসহ বেশকিছু কৃষিপণ্য আমদানি করতে হচ্ছে। একদিকে এসব পণ্যের আমদানি বাড়ছে, বিপরীতে কমছে রফতানি।
আলু রফতানির সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। ঐ অর্থবছরে ২ লাখ ৮ হাজার টন আলু রফতানি হয়।
এনবিআরের হিসাবে, সদ্য বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রফতানির প্রায় ৮ গুণ আলু আমদানি হয়েছে। রফতানি বাদ দিয়ে এ সময়ে নিট আমদানির পরিমাণ ৮৫ হাজার ৯১৩ টন। আমদানি ব্যয় ও রফতানি আয়ের তুলনা করলে দেখা যায়, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে আলু রফতানি করে আয় হয়েছে প্রায় ৩৮ লাখ ডলার। তার বিপরীতে আমদানিতে খরচ হয়েছে ১ কোটি ৫৭ লাখ ডলার।
বাজার ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ও রফতানিকারকদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে আলুর মতো অনেক কৃষিপণ্য আমদানির দরকার হবে না। তাতে রফতানি যেমন করা যেত, তেমনি বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হতো।
যেভাবে রফতানি পণ্য থেকে আমদানি পণ্য হলো
আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে সপ্তম। স্বাধীনতার পর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ৫২ বছরে বাংলাদেশ কখনো চাহিদা মেটানোর জন্য আলু আমদানি করেনি। কারণ, এ সময়ে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ছিল বেশি। এ সময়ে মূলত আলু উৎপাদনের জন্য আলুবীজ আমদানি হয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের চাহিদা মেটাতে প্রথমবারের মতো আলু আমদানি করা হয়েছে। ঐ বছর ৯৮ হাজার ৭৩১ টন আলু আমদানির বিপরীতে রফতানি হয়েছে মাত্র ১২ হাজার ৩৫২ টন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
তবে আলুর দাম বাড়তে থাকায় বাজার স্থিতিশীল রাখতে ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর আলু আমদানির অনুমতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এরপর গত বছরের ২ নভেম্বর প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে আলু আমদানি শুরু হয়। হিলি, সোনামসজিদ, বুড়িমারী, বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আলু আমদানি করা হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বিদায়ী অর্থবছরে ৫ লাখ ৩০ হাজার টন আলু আমদানির অনুমতি দিয়েছে ব্যবসায়ীদের। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ৯৮ হাজার টন আলু আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। প্রতি কেজি আলু আমদানিতে শুল্ককরসহ খরচ পড়ছে প্রায় ৩০ টাকা। খুচরা বাজারে এই আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা।
এমন সময়ে আলু আমদানি হচ্ছে যখন উৎপাদন বৃদ্ধির কথা বলছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাবে, বিদায়ী অর্থবছরে আলু উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৯ লাখ টন। মাঠপর্যায় থেকে আলু বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রায় ১৫ শতাংশ অপচয় হয়। সেই হিসাবে আলু পাওয়া যাবে প্রায় ৯৩ লাখ টন, যা চাহিদার প্রায় সমান। যদিও হিমাগার ব্যবসায়ীরা বলছেন, বিদায়ী অর্থবছরে আলু উৎপাদন হয়েছে কম।
বিদায়ী অর্থবছরে প্রায় ৯৮ হাজার টন আলু আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫৭ লাখ ডলার। প্রতি কেজি আলু আমদানিতে শুল্ককরসহ খরচ পড়ছে প্রায় ৩০ টাকা। খুচরা বাজারে এই আলু বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫৫ টাকা।
আলুর মতো গাজর, টমেটো ও কাঁচা মরিচও আমদানি হচ্ছে। একসময় গাজর ও টমেটো সামান্য পরিমাণে আমদানি হতো, যখন দেশে মৌসুম থাকত না। এখন ধারাবাহিকভাবে আমদানি বাড়ছে। একই অবস্থা কাঁচা মরিচেও। দেশে দাম বেড়ে গেলে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমদানির পথ খুলে দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের তথ্যে দেখা যায়, বিদায়ী অর্থবছরে তিনটি পণ্য আমদানি হয়েছে প্রায় ৯০ হাজার টন।
কমছে রফতানি
এফএওর হিসাবে, আলু রফতানি ধারাবাহিকভাবে শুরু হয় ১৯৯৯ সাল থেকে। তখন খুবই সামান্য পরিমাণে আলু রফতানি হতো। ধীরে ধীরে রফতানি বাড়তে থাকে। আলু রফতানির সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছিল ২০২০-২১ অর্থবছরে। ঐ অর্থবছরে ২ লাখ ৮ হাজার টন আলু রফতানি হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে রফতানি প্রায় ৫০ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ১ লাখ টনে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা আরও কমে ৩৪ হাজার টনে নেমে আসে। এবার আরও কমে প্রায় ১২ হাজার টনে নেমেছে। রফতানির গন্তব্যও কমছে। একসময় বিশ্বের ১৬টি দেশে রফতানি হতো বাংলাদেশের আলু, এখন সেখানে রফতানি গন্তব্য কমে ১১টিতে নেমেছে। চলতি বছর আলু রফতানিতে নগদ সহায়তা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
রফতানি কেন কমছে, জানতে চাইলে আলু রফতানিকারক সমিতির সভাপতি ফেরদৌসী বেগম বলেন, গত বছর কৃষক পর্যায়ে মাঠ থেকে আলু সংগ্রহ করে জাহাজে তুলে দেওয়া পর্যন্ত প্রতি কেজি ৩০ টাকার নিচে খরচ পড়তো। এখন তা ৪০-৪৫ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু বিশ্ববাজারে রফতানিমূল্য বাড়ছে না। প্রণোদনা নিয়েও আলু রফতানিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে। এখন আলুর বাজারে যে অবস্থা, তাতে রফতানি সামনে আরো কমে আসবে।
শুধু আলু নয়, কাঁচা মরিচ, টমেটো, গাজরসহ বেশকিছু কৃষিপণ্য আমদানি করতে হচ্ছে।
আলু উৎপাদনে ঘাটতি নেই, দাবি করে তিনি বলেন, বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক করা গেলে বিদ্যমান উৎপাদন দিয়ে চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রফতানিও সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্ববাজারে ৪২৪ কোটি ডলারের আলু রফতানি হয়েছে। আলু রফতানিতে শীর্ষ দেশ ফ্রান্স। ২০২২ সালে আলু রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ২৬তম। রফতানি কমতে থাকায় সামনে ক্রমতালিকায় আরো পিছিয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ।
বাড়বে আমদানি নির্ভরতা
উৎপাদন-ঘাটতির কারণে পেঁয়াজ, ডাল, রসুনের মতো কৃষিপণ্য আমদানিও নিয়মিতভাবে বাড়ছে। তাতে উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ পণ্যও আমদানির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে। এসব কৃষিপণ্য আমদানিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একসময় বিশ্বের ১৬টি দেশে রফতানি হতো বাংলাদেশের আলু, এখন সেখানে রফতানি গন্তব্য কমে ১১টিতে নেমেছে। চলতি বছর আলু রফতানিতে নগদ সহায়তা ২০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৫ শতাংশ করা হয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গ্লোবাল ভিলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দুই বছর ধরে আলুর উৎপাদন খুব বাড়ছে না। আলুর ব্যবহার বাড়তে থাকায় উদ্বৃত্ত আলুর পরিমাণ কমছে। উদ্বৃত্ত কমলে ব্যবসায়ীরা কারসাজির সুযোগ পান। তাতে দামে অস্থিরতা হয়, যা এখন হচ্ছে। এ জন্য আলুর উদ্বৃত্ত বাড়াতে হলে উৎপাদন বাড়ানোর বিকল্প নেই। আলুসহ কৃষিপণ্য উৎপাদনের তথ্য ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে না দেখিয়ে প্রকৃত তথ্য নিশ্চিত করা উচিত, যেন সরকার উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করতে পারে।