ঢাকা,  সোমবার   ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ অর্থনীতি ]

খেলাপি ঋণের চাপে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি আরও বাড়ল

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১৩:১৮, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
খেলাপি ঋণের চাপে ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি আরও বাড়ল
ছবি: সংগৃহীত

ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ ও প্রভিশন সংরক্ষণের চাপের কারণে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি আরও বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ প্রান্তিক শেষে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার কোটি টাকা।

গত ডিসেম্বর প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ছিল ২ লাখ ৭৪ হাজার কোটি টাকা। কিছু ব্যাংকের মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় মোট ঘাটতির একটি অংশ সমন্বয় হয়েছে। এরপরও মার্চ শেষে দেশের ৬১টি ব্যাংকের সার্বিক নিট মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। ডিসেম্বরে এ ঘাটতি ছিল ২ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ তিন মাসে নিট মূলধন ঘাটতি বেড়েছে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা।

Advertisement

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, এ পরিস্থিতি ব্যাংক খাতের বড় একটি অংশের দুর্বল অবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ। খেলাপি ঋণের বিপরীতে বেশি হারে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হওয়ায় ব্যাংকের মুনাফা কমে যায় এবং মূলধন ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মূলধন ঘাটতিও বাড়ে। কারণ, খেলাপি ঋণের বিপরীতে উচ্চহারে প্রভিশন রাখতে হয়। এতে মুনাফা কমে যায় এবং লোকসান হলে মূলধন ঘাটতি আরও বেড়ে যায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়ায় ২ লাখ ৫ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর শেষে এ ঘাটতি ছিল ১ লাখ ৯৮ হাজার ২৬০ কোটি টাকা। জুন শেষে তা আরও বেড়ে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, আগ্রাসী ঋণ বিতরণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদনের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ব্যাংক খাতের মূলধন পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংক খাতের মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মূলধন ঘাটতির কারণে আমানতকারীদের মধ্যে ব্যাংকের প্রতি অনাস্থা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে একটি ব্যাংকের দুর্বলতার প্রভাব পুরো ব্যাংক খাতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে ২০ থেকে ২১টি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি থাকা ব্যাংক খাতের দুর্বলতারই ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ শেষে ব্যাংক খাতের ক্যাপিটাল-টু-রিস্ক-ওয়েটেড অ্যাসেটস রেশিও (সিআরএআর) আরও কমে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমেছে। গত ডিসেম্বরে এটি ছিল ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম ১২ দশমিক ৫ শতাংশ সিআরএআর বজায় রাখার কথা।

এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, প্রয়োজনীয় মূলধন ও সিআরএআর বজায় রাখতে ব্যর্থ হলে লভ্যাংশ ও প্রণোদনা বোনাসে নিষেধাজ্ঞা, আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়া, অর্থায়ন ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুনাফা সংকোচনের মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

মার্চ শেষে সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতিতে রয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটির ঘাটতি ৬৬ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক—৩১ হাজার ৬৮৭ কোটি ১৭ লাখ টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক—৩০ হাজার ৯৩৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, ইউনিয়ন ব্যাংক—৩০ হাজার ৫৯৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা এবং এক্সিম ব্যাংক—৩০ হাজার ৩০২ কোটি ২৩ লাখ টাকা।

এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি ১৮ হাজার ৩৫৪ কোটি ৯০ লাখ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ১৬ হাজার ২৯৭ কোটি ৬১ লাখ, ন্যাশনাল ব্যাংকের ১১ হাজার ৯৮৪ কোটি ৯৮ লাখ, এবি ব্যাংকের ৮ হাজার ৪৮৭ কোটি ৫৯ লাখ এবং অগ্রণী ব্যাংকের ৮ হাজার ২৩৪ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

ডেইলি-বাংলাদেশ/এম ইউ
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!