প্রথমবার ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি, সুদহার অপরিবর্তিত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শ অনুযায়ী প্রথমবারের মতো ত্রৈমাসিকভিত্তিক মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের এ মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি ও দুর্বল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ নীতিকে ‘সংকোচনমূলক’ বা কঠোর অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করছে।
বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন ডেপুটি গভর্নর ড. হাবিবুর রহমান। এর আগে ছয় মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হলেও এখন থেকে প্রতি তিন মাস পরপর তা পর্যালোচনা করা হবে। পরিবর্তনশীল দেশীয় ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত সমন্বয় করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
.png)
ড. হাবিবুর রহমান জানান, জুনে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ থাকলেও আগস্টে তা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে, যা ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৩২ শতাংশের মতো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।
তবে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি, নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে সম্ভাব্য বিঘ্ন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও সারের উচ্চমূল্যসহ বিভিন্ন বিষয়কে মূল্যস্ফীতির জন্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এসব পরিস্থিতির প্রভাব আরও কিছুদিন পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বর্তমানে রেপো বা প্রধান নীতি সুদহার ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়ার সুদহার এসএলএফ ১১ শতাংশ এবং এসডিএফ ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে। গত জুলাইয়ে রেপো সুদহার ১০ শতাংশ থেকে ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল।
ডেপুটি গভর্নর বলেন, বাংলাদেশের নীতি সুদহার অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় এখনো তুলনামূলক বেশি। ফলে আপাতত সুদহারে নতুন কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
এদিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা প্যাকেজ বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ২০ হাজার কোটি টাকা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা কারখানা পুনরায় চালু করতে এবং বাকি অর্থ কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণে সহায়তা দেওয়ার জন্য ব্যবহারের কথা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে জুনে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এসব কারণে বিনিয়োগ ও ব্যাংকিং খাতে দুর্বলতা কাটাতে কাঠামোগত সংস্কার ও আর্থিক খাত শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ বেড়েছে। তবে দ্রুত নয়, ধীরগতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিশ্বব্যাংক ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিলেও আইএমএফ তাদের পূর্বাভাস ৪ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা দেওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ জন্য তথ্য-উপাত্তভিত্তিক নীতি গ্রহণ, লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা, আর্থিক খাতের সংস্কার ও শক্তিশালীকরণ এবং বিনিময় হার ব্যবস্থায় শৃঙ্খলাবদ্ধ নমনীয়তা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।