লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের নতুন বাণিজ্য সম্ভাবনা
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডার মতো প্রচলিত রপ্তানি বাজারে চাহিদা ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসছে। এমন বাস্তবতায় বিকল্প ও সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে লাতিন আমেরিকার দিকে নজর দিচ্ছে বাংলাদেশ। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, পাটজাত পণ্য ও চামড়াজাত সামগ্রী রপ্তানির মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে বাণিজ্য সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে ঢাকা।
লাতিন আমেরিকা-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ল্যাবসিআই) সভাপতি মো. আনোয়ার শওকত আফসার বলেন, সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। তবে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে ও প্যারাগুয়ের মতো দেশগুলোতে আগামী দিনে বাংলাদেশি পণ্যের বড় বাজার তৈরির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা)-র সঙ্গে ল্যাবসিআই একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর করেছে, যা এ অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও জোরদারে ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
.png)
বাণিজ্যিক তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের সংকট দেখা দিলে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা থেকে চিনি, সয়াবিন ও গম আমদানি বাড়ায় বাংলাদেশ। বিপরীতে এসব দেশে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্রাজিলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিভিন্ন সূত্রে এ আয়ের পরিমাণ ১৮৭ থেকে ২১৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের অর্থবছরের তুলনায় এতে ২৬ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য-উপাত্তে উঠে এসেছে।
লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম অর্থনীতি ব্রাজিলের বিশাল বাজারে প্রবেশের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার বাজারকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আর্জেন্টিনায় বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। বিপরীতে একই সময়ে আর্জেন্টিনা থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে। ফলে দুই দেশের বাণিজ্যে বড় ধরনের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে।
এই বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে আর্জেন্টিনার সঙ্গে সরাসরি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) করার উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পোশাক খাতের সংগঠন বিজিএমইএ ও বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) নেতারা। তাদের মতে, এ ধরনের চুক্তি হলে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য আর্জেন্টিনার বাজারে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
এদিকে, দক্ষিণ আমেরিকার চার দেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য জোট ‘মারকোসুর’-এর বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে উরুগুয়েকে সম্ভাবনাময় গেটওয়ে হিসেবে বিবেচনা করছেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। সম্প্রতি উরুগুয়ের রাষ্ট্রদূত আলবার্তো গুয়ানি বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানিতে আগ্রহের কথা জানান। একই সঙ্গে বাংলাদেশে উচ্চমানের ভেড়ার পশম বা উল রপ্তানির প্রস্তাবও দেন তিনি।
লাতিন আমেরিকার অন্যান্য দেশেও বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেল এবং প্যারাগুয়ের কাঠ ও মসলার বাজারকে বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। এসব খাতে পারস্পরিক বাণিজ্য বাড়ানো গেলে অঞ্চলটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও বহুমুখী হতে পারে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পর বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে প্রচলিত বাজারের পাশাপাশি নতুন ভৌগোলিক বাজারে প্রবেশকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। লাতিন আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি বাড়াতে কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ জোরদারের পাশাপাশি বুয়েনস আইরেসে নতুন দূতাবাস স্থাপন এবং নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সূত্র: দি বাংলাদেশ মেইল