ঢাকা,  বুধবার   ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

Advertisement
[ শিক্ষা ]

শেকৃবির থিসিস বন্ধু ‘রেজা ভাই’

শাহেদ মাহমুদ, শেকৃবি
প্রকাশিত: ১৩:৫১, ২ জানুয়ারি ২০২৩
শেকৃবির থিসিস বন্ধু ‘রেজা ভাই’
মো. রেজোয়ান গাজী। ছবি; ডেইলি বাংলাদেশ

রেজা ভাই। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের একটি পরিচিত নাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের থিসিসের জন্য একটি সেমিস্টার ফসল ফলানো, তা নিয়ে কোনো একটি বা একাধিক পরীক্ষা করতেই হয়। সেখানেই শিক্ষার্থীদের পরিচয় হয় ‘রেজা ভাই’ এর সঙ্গে। শেকৃবি শিক্ষার্থীরা তার নাম দিয়েছেন ‘থিসিস বন্ধু’।

পেশায় তিনি খামার শ্রমিক সর্দার। শ্রমিক বণ্টন থেকে শুরু করে অনেক দায়িত্বই তার ঘাড়ে। শিক্ষার্থীরা ভর্তি হন, থিসিস করেন, আবার বের হয়েও যান সনদ নিয়ে। কিন্তু রেজা ভায়ের দায়িত্ব থেমে থাকে না। 

তার প্রকৃত নাম মো. রেজোয়ান গাজী। বাড়ি খুলনা জেলার পাইকগাছায়। পরিবারে পাঁচ সদস্য। ২০১৩ সাল থেকে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের খামার বিভাগের শ্রমিক সর্দার হিসেবে কর্মরত আছেন রেজা ভাই।

Advertisement

রেজার ফোনে ঘুম ভাঙার এলার্ম বাজে রাত ৩টায়। ঘুম থেকে উঠে ইবাদত করেন কিছুসময়। এরপর আধার থাকতে থাকতেই তাকে বের হতে হয় খামার বিভাগের উদ্দেশ্যে। ভোর পাঁচটায় উপস্থিত হন তার কর্মস্থলে। হাতের কিছু কাজ, শ্রমিক বণ্টনের কাগজগুলো ঠিক করতে হবে শিক্ষার্থী আর শ্রমিক আসার আগেই। দ্রুত সব গুছিয়ে নেন তিনি। তারপর চলে আসেন খামার বণ্টনের আসনে।

৬টার একটু আগে থেকেই শ্রমিক আসতে শুরু করে খামার বিভাগে। সেই সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও। আগের দিন শিক্ষার্থীদের দেওয়া রিকুইজিশন ফর্ম অনুযায়ী কোন প্লটে কতজন করে শ্রমিক দেয়া হবে সেটাই বণ্টন করে দেন তিনি। ৭ টার মধ্যে বণ্টন কাজ শেষ হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা শ্রমিকসহ নিজ নিজ প্লটে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তবে ছুটি নেই রেজার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব গবেষণা মাঠের প্লটগুলো দেখতে হয় তাকে। কোথাও কোনো শ্রমিক প্রয়োজন আছে কি না। অথবা শিক্ষার্থীদের কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কি না। সবগুলো প্লট একে একে দেখা শেষে ফেরেন খামার বিভাগের নিজের রুমে। আবার শিক্ষার্থীরা রিকুইজিশন দেন পরের দিনের জন্য। রিকুইজিশন ফর্মগুলো জমা নেয়া ও নির্ধারিত জায়গায় রিকুইজিশনের তথ্য লিখতেও সাহায্য করেন তিনি। এরপর বিশ্রাম। সকালের নাস্তা করবার জন্য কিছু সময় পান রেজা। পুনরায় ১০টায় ফিরতে হয় তার কর্মস্থলে।

আবারো তিনি মগ্ন হন নিজ দায়িত্বে। শ্রমিকদের কার্যাবলী তদারকি। কোনো অতিরিক্ত কাজ থাকলে তার জন্য পুনরায় তার জন্য শ্রমিক বণ্টন। শ্রমিকদের বিভিন্ন সমস্যা হলে তার সমাধান। একের পর এক কাজ করতেই থাকেন রেজা ভাই। তবুও তার ক্লান্ত দেহের অক্লান্ত অভিব্যক্তি আর মুখের সদা উজ্জ্বল হাসি শিক্ষার্থীদের চোখকে ফাকি দিতে পারে না।

অক্টোবর মাসের ঘটনা। দীর্ঘদিন অসুস্থতাজনিত কারণে খুলনার দেশের বাড়িতে মারা যান রেজা বোন। বোনকে শেষবারের মত দেখতে বাড়িতে গেলেও ঠিকই পরের দিন পুনরায় সঠিক সময়ে কর্মস্থলে উপস্থিত হন রেজা। এতেও তার কোনো অভিযোগ নেই। তার আনন্দই যেন ছাত্রছাত্রী আর কৃষিতত্ত্ব খামারের শ্রমিকদের মধ্যে।

ঘড়িতে যখন দুপুর ২টা, খামার বিভাগ থেকে ছুটি মেলে রেজা ভাইয়ের। বাড়ি ফিরে গোসল-খাওয়া সেরে নেন। কিন্তু বহুল ব্যয়ের এই শহরে বিশ্রাম নেবার সময় নেই রেজাদের মতো মানুষের। ফের ছুটতে হয় জীবিকার তাগিদে আরেক জায়গায়। সেখানে থেকে বাড়ি ফেরেন রাত ১০ টায়। রাতের খাবার আর পরিবারকে এই সামান্যটুকু সময় দিয়ে রেজা নিজেকে দিতে পারেন একটুখানি বিশ্রাম। তবে ক্লান্ত শরীরের এই বিশ্রামের মধ্যেও তিনি জানেন, ভোরের পাখি জাগার আগেই জাগতে হবে তাকে।   

বিশ্ববিদ্যালয়ের এত মানুষের ভিড়ে রেজার মত অক্লান্ত পরিশ্রমের মানুষের অবদান পড়ে যায় গভীরে। তবুও তারা আনন্দের সঙ্গেই অতিবাহিত করেন ব্যস্ত জীবন। 

ডেইলি-বাংলাদেশ/কেবি
লিংক সফলভাবে কপি হয়েছে!