তাদের গোল্ড মেডেলের গল্প (পর্ব-১)
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) অষ্টম সমাবর্তন। সবোর্চ্চ ফলাফলের ভিত্তিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে এবার গোল্ড মেডেল বা স্বর্ণপদকের জন্য মনোনীত হয়েছেন ২০১ গ্র্যাজুয়েট। গোল্ড মেডেল পাওয়া এসব শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এ অর্জনের গল্প শুনেছেন ডেইলি বাংলাদেশের বাকৃবি প্রতিনিধি আবুল বাশার মিরাজ।
শিক্ষকদের অবদানের কারণেই গোল্ড মেডেল পাচ্ছি
আমি মাস্টার্সে সিজিপিএ ৪ পাওয়ায় চ্যান্সেলর গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ডের জন্যে মনোনীত হয়েছি। শুরু থেকেই মাথায় একটা বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছিল, কিভাবে দ্রুত মাস্টার্স শেষ করতে পারি। কারণ, আমি দীর্ঘদিন বৈবাহিক জীবনে প্রবেশ করলেও পারিবারিকভাবে এখনো সংসার জীবনে প্রবেশ করতে পারিনি। প্রথম সেমিস্টার ভালোভাবেই পার করলাম। ক্লাস পরীক্ষা সবকিছুই ভালোভাবে এগোচ্ছিল। পাশাপাশি গবেষণার জন্যে বিভিন্ন রিভিও, জার্নাল, রিপোর্ট কালেকশান শুরু করি- যাতে আমি দ্বিতীয় সেমিস্টারের শুরু থেকেই আমার গবেষণা কাজ শুরু করতে পারি। দ্বিতীয় সেমিস্টারের আগেই সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে আমি এক্সপিরিয়েন্ট সেট করি। আমার গবেষণার বিষয় ছিল মাইকোরাইজা এবং ব্যাকটেরিয়া নিয়ে। ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করার কাজটা খুব সময় সাপেক্ষ এবং সতর্কতার সঙ্গে করতে হতো। যাতে করে কন্টামিনেশান না হয়। কাজটা আয়ত্ত করতে অনেক সময় লেগেছে। শেষ যেদিন থিসিস জমা দিব, সেদিনের আগের সন্ধ্যায় সমস্ত কাজ কমপ্লিট করে বাসায় ফিরছিলাম, এত ক্লান্ত ছিলাম ভুল করে আমার ছোট ট্রলিটা অটোতে রেখে চলে আসি। সমস্ত জিনিস হারিয়ে যায়, শুধু ল্যাপটপ এবং থিসিসটা আমার হাত ব্যাগে ছিল। সৃষ্টিকর্তার রহমত সেদিন আমি আমার থিসিস আর ল্যাপটপের ডিফেন্সের জন্যে প্রস্তুতকৃত প্রেজেন্টেশনটা হারায়নি। পরের দিন খুব সুন্দরভাবে ডিফেন্স সম্পন্ন হল। আমার গবেষণার বিষয়ে সবসময় আমি আমার গাইড স্যার এবং কো গাইড প্রফেসর ড. রশিদুল ইসলাম স্যারের সহযোগিতা পেয়েছি। এছাড়াও পাশে পেয়েছি এসিসট্যান্ট প্রফেসর ফারজানা হক টুম্পা ম্যামকে। সেই সঙ্গে ডিপার্টমেন্টের সব শিক্ষকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
.png)
সাদিয়া আফরিন সুপ্তা
কৃষি অনুষদ (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ)
সেশন: ২০১২-২০১৩
নিয়মমাফিক পড়ালেখা করেছি
মধ্যবিত্ত পরিবারের বাবা-মার একমাত্র মেয়ে হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই খুব আদরের ও আশার কেন্দ্রবিন্দু ছিলাম। মায়ের খুব ইচ্ছে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। কিন্তু মেয়ে হওয়ায় পারিপার্শ্বিক জটিলতায় তাকে দমে জেতে হয়। তার সেই অপূর্ণ ইচ্ছে তিনি আমার মাঝে খুঁজতেন। আজ তার ইচ্ছে পূরণ করতে পেরে আমি খুবই খুশি। আর সেই খুশির জোয়ারে নতুন মাত্রা যোগ করেছে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের অর্জন। অনেকের কাছেই গোল্ড ম্যাডেলিস্ট মানে ‘নাজানি সে কতো পড়াশোনা করে, সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকে’ টাইপ কিছু। কিন্তু আমি তাদের এই ভুল ভেঙ্গে দিতে চাই। ভালো ফলাফলের জন্য সারাদিন বই নিয়ে বসে থাকতে হয় না। একটু টেকনিক্যালি পড়তে হয়। তবে এক্ষেত্রে একটি বিষয় জরুরি, নিয়মিত ক্লাস করা এবং শিক্ষকদের নির্দেশনা মেনে চলা।
পরিশেষে, আমার সব সম্মানিত শিক্ষক বিশেষ করে আমার সুপারভাইজার স্যারের প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে চাই, যাদের ছাড়া আমার এ অর্জন পূর্ণতা পেত না।
রোমানা জাহান মুন
কৃষি অনুষদ (প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগ)
সেশন ২০১৪-১৫
জেদ ছিল ভালো ফলাফল করার
কৃষি অনুষদে অনার্স করে মাস্টার্সের জন্য ভর্তি হলাম কৃষি রসায়ন বিভাগে। মাস্টার্সের জীবন শুরু হলো ড. কাজি ফরহাদ কাদির স্যারের হাত ধরে। প্রথম থেকেই কিছু করার ইচ্ছাটা মাথায় ছিল, যেটা একেবারে গেঁথে গেল যখন প্রথম সেমিস্টারে জিপিএ ৪.০০ আউট অফ ৪.০০ পাওয়ার পর। পরের বাকি ২ সেমিস্টারে জিপিএ ৪ এর জন্য পরিশ্রম করা, শেষ ৬ মাস রিসার্চ এর জন্য ল্যাবে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করা, কেমন যেন একটা জিদ চেপে গিয়েছিল। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আসল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, রেজাল্ট শিটে নিজের নামের পাশে ৪, সেদিন কতোটা ভালো লেগেছিল তা কাউকে বোঝাতে পারব না। অষ্টম সমাবর্তনে আমি গোল্ড মেডেল পাচ্ছি, যেটা প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর জন্যই স্বপ্নের। আমি মনে করি, প্রতিটা মানুষের মধ্যেই সর্বোচ্চ সাফল্য আনার সক্ষমতা রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব সুপ্ত প্রতিভা, যেটি বিকশিত করতে প্রয়োজন তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি, বাবা-মার আশীর্বাদ, সৃষ্টিকর্তার কৃপা, ধৈর্য আর পরিশ্রম। এই সাফল্যের জন্য সবচেয়ে বড় অবদান আমার বাবা-মা, আমার অভিভাবকতুল্য সম্মানীয় শিক্ষকদের যাদের অনুপ্রেরণায় আমার এই অর্জন।
পাপন সরকার
কৃষি অনুষদ (কৃষি রসায়ন বিভাগ)
সেশন: ২০১৩-১৪
মাকে উপহার দিতে চাই এ গোল্ড মেডেল
প্রথমেই সৃষ্টিকর্তার প্রতি লাখো শুকরিয়া। কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই আমার বাবা-মা এবং সব শিক্ষকদের প্রতি, যাদের হাত ধরেই আমার লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়েছে। শিক্ষাজীবনের শেষ ধাপে অর্থাৎ মাস্টার্সে এসে এমন সফলতা আমার ভবিষ্যতের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। এই সফলতার জন্য আমার পিতামাতার মুখে যে তৃপ্তির হাসি ফুটেছে তা আমার সব পরিশ্রমকে সার্থক করে তুলেছে। এ এক অন্যরকম অনুভূতি, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দীর্ঘ ২০ বছরের পড়ালেখার জীবনযাত্রায় আমার সর্বোচ্চ প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি আমার এই গোল্ড মেডেল আমি আমার মাকে উপহার দিব। এই রকম একটি সম্মানের মুহূর্ত যেকোনো শিক্ষার্থীর জন্য লালিত স্বপ্ন। বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আইভি সুলতানার (সহপাঠী ও সহধর্মিণী) প্রতি যে আমাকে সব ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আরো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি, আমার এমএস এর শ্রদ্ধেয় সুপারভাইজার প্রফেসর ড. সাবিবুল হকের প্রতি, যে করোনাকালীন সময়েও আমার গবেষণার কাজ চলমান রাখতে উৎসাহ দিয়েছেন। পরিশেষে ভবিষ্যতে কর্মজীবনেও যেন এমন সফলতার ধারা অব্যাহত রাখতে পারি, সেজন্য সবার কাছে দোয়াপ্রার্থী।
মো. রাশেদুল আলম
কৃষি অনুষদ (ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ)
সেশন: ২০১৪-১৫