নারী দিবসকে যেভাবে দেখছেন চবি শিক্ষার্থীরা
‘জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী নারী,
সুষমা লক্ষ্মী, নারীই ফিরিছে রূপে রূপে সঞ্চারী’
প্রতিবছর ৮ মার্চ পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো এ দেশেও নানা আয়োজনের মাধ্যমে পালন করা হয় দিবসটি। এই দিবসটির মূল কথা হচ্ছে, ‘নারীমুক্তি’ তথা নারীর স্বাধীনতা অর্জন। ১৯১১ সালে ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৫ সালে ৮ মার্চকে জাতিসংঘও আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সাল প্রথম এ দিবস পালন করা হয়। এখন প্রশ্ন হলো, নারী অধিকার কি কেবল দিবস পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ?
নারী দিবস উপলক্ষে নারীর চাওয়া-পাওয়া ও স্বাধীনতা নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কয়েক নারী শিক্ষার্থীর ভাবনা তুলে ধরছেন- রুমান হাফিজ।
আইনের কঠোর প্রয়োগের বিকল্প নেই বলে মনে করেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তাহসিনা এনাম। তিনি বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতারোধে অনেক পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে, ভুক্তভোগী নারীর পরিবারের সদস্যদের সমর্থনের অভাব এজন্য দায়ী। কঠিন পরিস্থিতির শিকার নারীর প্রতি পরিবারের অসমর্থন নারীর আত্মবিশ্বাস হ্রাস করে। এতে নারীর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদে সে বারবার দ্বিধাবোধ করে। ফলে নারী সহিংসতার ঘৃন্যতম ঘটনাগুলো অনেক ক্ষেত্রেই গোপন করে এবং পরবর্তীতে সেগুলোর পুনরাবৃত্তিতে মাত্রাতিরিক্ত হারে সহিংসতা বৃদ্ধি পায়। তাই যেকোনো সহিংসতা রোধে পরিবারের অকুণ্ঠ সমর্থন অত্যাবশ্যক। এই সমর্থন নারীর বাক স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্যে করবে। পাশাপাশি সে বুঝতে পারবে- সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একা নয়। পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন করা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজকে আচ্ছন্ন রেখেছে যা খুবই দুঃখজনক। এর থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই।’
সমাজতত্ত্ব বিভাগের নাহিদ নেওয়াজ বলেন, ‘নির্যাতনের ঘটনা নির্বিকারভাবে না দেখে রুখে দাঁড়াতে হবে সবাইকে। যেকোনো নারী নির্যাতন ও হয়রানির জন্য দ্রুত বিচার আইন ও তা কার্যকর করা অতি আবশ্যক। আইনি প্রক্রিয়ার সুষ্ঠু বিচার যেমন অপরাধীকে দুর্বল করে তেমন ভিকটিমসহ সবাইকে সাহসী ও আশাবাদী করে। তাই এখন শুধু মানববন্ধন নয়, ব্যানার-ফেস্টুন নয় প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। দাঁড়িয়ে নির্বিকার তাকিয়ে না থেকে কিংবা ভিডিও না করে, হয়রানির স্বীকার একজনের পাশে তার চারপাশের সবাইকে তাৎক্ষণিক রুখে দাঁড়াতে হবে ও জরুরি সেবার জন্য নিজ উদ্যোগে কল করে জরুরী নিরাপত্তা কর্মীদের সহযোগিতায় অপরাধীকে আইনের বিচারাধীন করতে হবে। নারীদের লজ্জা ও ভয়কে জয় করে সবার সামনে যেকোনো হয়রানির বিরুদ্ধে মুখ খুলতে হবে। নিজের সচেতনতা ও নিরাপত্তার স্বার্থে সবার জন্য সহযোগিতার হাত প্রশস্ত করতে হবে। পরস্পর ভালোবাসা শ্রদ্ধাবোধ সহযোগিতা ও সচেতনতাই নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে বড় হাতিয়ার।’
বাংলা বিভাগের শারমিন আক্তারের মতে, সাম্প্রতিককালে যেই পৈশাচিক কর্মকাণ্ডের পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে বর্তমানে এটি একটি সামাজিক অবক্ষয়ের একটি ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরেছে। আমাদের দেশে আইনের শাসন থাকলেও এর যথার্থ প্রয়োগ শুধু নিম্নবিত্ত কিংবা খেটে খাওয়া মানুষের ওপরই প্রয়োগ করা হচ্ছে ফলে সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার ফলে অপরাধীরা খুব সহজেই আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে আসতে পারছে। স্বাধীনতার অর্ধশত বছরেও আশানুরূপ পরিবর্তন কেন যেন হয়নি। পরিপূর্ণ মানবতাবোধসম্পন্ন জাতি হয়ে উঠতে অন্তর্গত পরিবর্তনের যথেষ্ট ঘাটতি রয়ে গেছে।
একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষকে হত্যা করে কিংবা হত্যা করার জন্য প্রশ্রয় দেয়, তখন সমাজ আর সমাজ থাকে না। কোন সভ্য সমাজে এ অবস্থা চলতে পারে না। দিনে-দুপুরে হওয়া অপরাধগুলো যত মানুষ দাঁড়িয়ে নির্বিকারভাবে দেখে তাদের কিছুটা অংশও যদি প্রতিবাদের আওয়াজ তুলত, হয়তো বর্তমান বাংলাদেশের চিত্রটা অন্যরকম হতো।
হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের নওরীন আক্তার বলেন, নারীকে নারী নয়, মানুষ হিসেবে চিন্তা করা উচিত। অভিভাবকদের উচিত ছোটবেলা থেকে সন্তানদের ছেলেমেয়ে হিসেবে নয়, মানুষ হিসেবে চিন্তা করার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে। এছাড়া, নারীদের সহিংসতা প্রতিরোধে সবার আগে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে শুধু সরকার নয়, সরকারের পাশাপাশি সর্বশ্রেণির মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে প্রথমেই যে কথাটা মাথায় আসে তা হলো, আমাদের নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। শিক্ষা ও প্রযুক্তিখাতে দেশ অসামান্য সাফল্য অর্জন করলেও আমাদের মূল্যবোধ তলানিতে ঠেকেছে। প্রযুক্তির অবাধ অপব্যবহার এবং বিজাতীয় অপসংস্কৃতির অন্ধ অনুকরণ আজ আমাদের বিবেকহীন প্রাণীতে পরিণত করেছে। এই সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার একমাত্র উপায় হচ্ছে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো। পারিবারিক এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা। পড়ালেখার পাশাপাশি দেশীয় সংস্কৃতির চর্চা বৃদ্ধি করতে হবে এবং সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে কঠিন শাস্তি দিতে হবে এবং মাদকের সহজলভ্যতা কঠোর হাতে দমন করতে হবে।