নিয়মের বেড়াজালে গ্রন্থাগার বিমুখ চবি শিক্ষার্থীরা
সুসজ্জিত পাঠকক্ষ। সাজানো চেয়ার-টেবিল। পাঠের জন্য নীরব পরিবেশ। কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করে দেখা গেলো ভিন্ন চিত্র। এত আয়োজনের পরেও পাঠক নেই গ্রন্থাগারে। বলছিলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের কথা।
সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে চবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার। প্রশাসনিক জটিলতা, অব্যবস্থাপনা, অর্থাভাব, অদক্ষ কর্মচারীসহ নানা কারণে শিক্ষার্থীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে প্রাচীন এই গ্রন্থাগারটি। ফলে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পরিবেশ মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। শুধু তাই নয় ডিজিটালাইজড করার পরিকল্পনা থাকলেও এখনো তার কোনো ছোঁয়া লাগেনি গ্রন্থাগারটিতে।
গ্রন্থাগার সম্পর্কে:
১৯৬৬ সালের নভেম্বরে কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়ে ১২০০ বর্গ ফিটের একটি কক্ষে গ্রন্থাগারটির যাত্রা শুরু। বই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০০টি। পরবর্তীতে ১৯৬৮ সালে বর্তমান প্রশাসনিক ভবনের (মল্লিক ভবন) দক্ষিণ পার্শ্বে মানবিক ও সমাজ বিজ্ঞানের ওপর ১৪ হাজার বই নিয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিসরে গ্রন্থাগারটির প্রতিষ্ঠা হয়।

১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে কিছুদিনের জন্য গ্রন্থাগারটি বর্তমান প্রশাসনিক ভবনে স্থানান্তরিত করা হয়। বর্তমানে ৫৬ হাজার ৭০০ বর্গফুট পরিমিত গ্রন্থাগারের অবস্থান হলো কলা অনুষদের দক্ষিণ পার্শ্বে চাকসু ভবনের পূর্ব পার্শ্বে ও দৃষ্টিনন্দন আইটি ভবনের পশ্চিম পার্শ্বে। বর্তমান আধুনিক মোজাইক ফ্লোর বিশিষ্ট গ্রন্থাগারটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন ভিসি আলমগীর মো. সিরাজ উদ্দিন ১৯৯০ সালে।
যা আছে গ্রন্থাগারে:
গ্রন্থাগার ভবনে কলা ও মানববিদ্যা, বিজ্ঞান, ব্যবসায় প্রশাসন, সমাজবিজ্ঞান, আইন অনুষদের পৃথক পাঠকক্ষ রয়েছে, এই গ্রন্থাগারে দেশি-বিদেশি বই, জার্নালের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। ১২টি কম্পিউটার ও একটি সার্ভার ও স্থাপন করা হয়। গ্রন্থাগার ভবনে পাঠক-পাঠিকাদের ব্যবহারের সুবিধার্থে পাঠকদের জন্য রয়েছে আলাদা পাঠকক্ষ।
লাইব্রেরি থেকে পাওয়া তথ্য মতে, দিনে গড়ে লাইব্রেরি ব্যবহারকারী মোট ৩৪৭ জন। এর মধ্যে সকাল ভাগে গড়ে ২২৯ জন। বিকেলে মাত্র ১১৮ জন শিক্ষার্থী লাইব্রেরি ব্যবহার করেন। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে আবাসিক হলে অবস্থানকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার।

লাইব্রেরির এত আয়োজনের পরেও শিক্ষার্থীরা কেন লাইব্রেরি বিমুখ। সে প্রশ্নের নানা উত্তর মিলেছে।
রফিকুল ইসলাম নামের ইংরেজি বিভাগের এক শিক্ষার্থী বলেন, ক্লাস শেষে শাটল ট্রেন ধরার তাড়ার কারণে ইচ্ছা থাকলেও লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারি না। শাটল ট্রেন মিস করলে শহরের শিক্ষার্থীদের বাসায় ফেরার ভোগান্তি হয়ে পড়ে সীমাহীন।
ইয়াসিন নামের আরেকজন জানালেন, ক্লাস যখন শেষ হয়, লাইব্রেরির কম্পিউটার সেকশনটিও বন্ধ হয়ে যায় তখনই। ফলে ডিজিটাল কোড নিয়ে বই তোলা ও পাঠ সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, বিভাগের বইয়ের জন্য বই অনুসন্ধান কেন্দ্রে গিয়ে প্রায়ই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। পাওয়া যায় না প্রয়োজনীয় বই। কর্মচারীরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে বই নাই বলে ফিরিয়ে দেন।
অপ্রতুল রেফারেন্স বই:
জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে ইংরেজি ভাষায় রচিত বইয়ের অভাব নেই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু মাতৃভাষা বাংলায় এসব বই খুঁজেও পান না শিক্ষার্থীরা। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা ও ইংরেজি এই দুই মাধ্যমেই পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। তবে সুযোগ থাকলেও শিক্ষার্থীরা মূলত মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন ইংরেজিকেই। কারণ, বিজ্ঞান, মানবিক কিংবা ব্যবসা শিক্ষার মতো বিষয়গুলোতে বাংলা ভাষায় নেই মানসম্মত রেফারেন্স বই।

গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী হোসাইন আল মামুনের অভিযোগ, 'বাংলায় রেফারেন্স বই খুবই কম পাওয়া যায়। যেগুলো পাওয়া যায় তার মানও খুব একটা ভালো না।'
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর অভিযোগ, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিকায়ন না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত সেবা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মিলছে না লাইব্রেরিতে। একটা বই খুঁজতে গিয়ে অনেক সময় পার হয়ে যায়। তাই লাইব্রেরি তাদেরকে খুব একটা টানে না।
এ নিয়ে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক ড. মোহাম্মদ হেলালউদ্দিনের সঙ্গে। তার দাবি লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক শিক্ষার্থীই আসে। কম শিক্ষার্থী আসার অভিযোগ সত্য নয়। বাংলায় অনুবাদকৃত বইয়ের ব্যাপারে তিনি জানান, আমাদের লাইব্রেরি এদিক থেকে অনেকটাই সমৃদ্ধ। ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনীয় সব বই তারা এখানে পায়।
বাংলা বিভাগের অধ্যাপক আবু বকর সিদ্দিক মনে করেন, বাংলা ভাষায় উন্নত অনুবাদ বইয়ের জন্য বাংলা একাডেমি এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন।